ঢাকা ০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সেবার মান বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক মানের বন্দর নিশ্চিত করতেই চট্টগ্রাম বন্দরের শুল্ক বৃদ্ধি: অর্থ উপদেষ্টা

বিদেশি বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দিতে নয়, বরং দ্রুত সময়ে উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে এবং সামগ্রিক বন্দর ব্যবস্থাপনার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের শুল্ক বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে, মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর), সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। উল্লেখ্য, আজ (১৫ অক্টোবর) থেকেই দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরে নতুন শুল্ক হার কার্যকর হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে বন্দরের পরিষেবা খরচ এক লাফে গড়ে ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “আপনার খরচ হয়তো কম হতে পারে, কিন্তু পণ্য খালাসে এখন সময় অনেক বেশি লাগছে। পোর্টে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, ব্যবসায়ীদের ডেমারেজ দিতে হচ্ছে—যা ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে পোর্ট চার্জ কম না হলেও সেখানে কার্যক্রম খুব দ্রুত সম্পন্ন হয়। উদাহরণস্বরূপ, গার্মেন্টস শিল্পের উদ্যোক্তারা অভিযোগ করেন যে তাঁদের পণ্য দ্রুত পৌঁছায় না। আপনার উৎপাদিত পণ্য যদি দ্রুত পৌঁছাতে পারে এবং শিপিং খরচ বাঁচানো সম্ভব হয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে রেট বেশি দিলেও সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি লাভবান হয়।”

সালেহউদ্দিন আহমেদ নিশ্চিত করে জানান, “বন্দরে দ্রুতগতির উন্নত সেবা নিশ্চিত করতেই শুল্ক বাড়ানো হয়েছে।” তিনি মনে করেন, “ব্যবসায়ীদের এই পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে বুঝতে হবে। যারা দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য সার্ভিস চান, তাদের জন্য সার্ভিসের মান উন্নত করতে হবে। এজন্য আমরা নতুন একটি টার্মিনালও তৈরি করছি। তবে টার্মিনাল ও সার্ভিসের মান উন্নয়নে খরচ বিবেচনা করে সঠিক সার্ভিস চার্জ বা কস্ট প্রাইস নেওয়াই যুক্তিসঙ্গত। সুতরাং, ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় সঠিক চার্জ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।”

বর্তমানে এই পরিবর্তনের তীব্র সমালোচনা হচ্ছে যে সরকার বিদেশি অপারেটরদের সুবিধা দিতেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এই দাবি নাকচ করেছেন। অর্থ সচিব ড. মোহাম্মদ খায়েরুজ্জামান মজুমদার দাবি করেন, এটি শুল্ক বৃদ্ধি নয়, বরং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে দীর্ঘ দিন পর তা ‘সমন্বয়’ করা হয়েছে।

অর্থ সচিব বলেন, “বাস্তবতা হলো, চার্জ বর্তমান প্রয়োজন অনুযায়ী আপগ্রেড করা হয়েছে। ৩০ বছর আগের শুল্ক হারকে সমন্বয় করা হয়েছে এবং তা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেই করা হয়েছে। এটি অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনও কম রাখা হয়েছে। এই সমন্বয় ব্যবসায়ীদের কার্যক্রমে সময়োপযোগী সুবিধা নিশ্চিত করবে এবং সার্ভিসের মান উন্নত করবে। এছাড়া, ফি বাড়ানোর মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থও বিনিয়োগ করা যাবে, যা সেবার মান নিশ্চিত করবে।” এক প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, শুল্ক বাড়ানোয় পণ্য খালাসে হয়রানি কমবে এবং ব্যবসায়ীদের বাড়তি কোনো অর্থ দিতে হবে না।

তবে অর্থ উপদেষ্টার এমন বক্তব্যে ব্যবসায়ীরা একমত নন। তাঁদের শঙ্কা, শুল্ক বাড়ানোর পরও ঘুষ-অনিয়ম বন্ধ হবে না। এই বিষয়ে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “যেসব কন্ট্রাক্ট করা হয়েছে, সেগুলো মানা হচ্ছে। অতিরিক্ত পেমেন্ট বা বিনা খরচে অন্য কোনো সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।” তিনি আরও বলেন, “কম খরচে কেউ ভালো সেবা দিতে পারবে না। ভালো মানের সেবা পেতে হলে কিছুটা বেশি ফি নেওয়াই বাস্তব। এটি সমস্যা নয়, বরং সার্ভিসের মান নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন।”

শুল্ক বৃদ্ধি নিয়ে অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “উপদেষ্টা বলেছেন শুল্ক বাড়লে দ্রুত সেবা কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। কিন্তু সেটা তিনি কিভাবে নিশ্চিত করবেন? যদি নিশ্চিত করতে পারেন তাহলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।”

বিকেএমইএ সভাপতি আরও বলেন, “দুর্নীতিবাজ কাস্টম কর্মকর্তাদের কারণেই মূলত ধীরগতি হয়। তাদের যদি টাকা দেওয়া হয়, তাহলে দ্রুত খালাস হয়। আর তা না হলে তারা মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খুঁজে খুঁজে দীর্ঘ করার উপায় বের করে এবং অবৈধ অর্থ দাবি করেন। সুতরাং অর্থ উপদেষ্টাকে নিশ্চিত করতে হবে যে বর্ধিত হারে চার্জ দিলেও দুর্নীতি থাকবে না অথবা যথাসময়ে কাজ সম্পন্ন হবে।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, “গত ৪০ বছরে কেন শুল্কের হার বাড়ানো হলো না? এখন হঠাৎ করে কেন একবারে ৪০ শতাংশ বা তার বেশি বাড়ানো হলো? এটা শিল্পের জন্য একটা বোঝা। বছরে বছরে ক্রমান্বয়ে বাড়ালে এটা শিল্পের জন্য ভালো হতো এবং সরকারের জন্য ভালো হতো। আমাদের দাবি, যাতে শিল্পের ক্ষতি না হয় এবং এই বর্ধিত হারে শুল্ক দেওয়ার পরেও কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করা হয়।”

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

সেবার মান বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক মানের বন্দর নিশ্চিত করতেই চট্টগ্রাম বন্দরের শুল্ক বৃদ্ধি: অর্থ উপদেষ্টা

আপডেট সময় : ১২:৫১:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৫

বিদেশি বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দিতে নয়, বরং দ্রুত সময়ে উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে এবং সামগ্রিক বন্দর ব্যবস্থাপনার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের শুল্ক বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে, মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর), সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। উল্লেখ্য, আজ (১৫ অক্টোবর) থেকেই দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরে নতুন শুল্ক হার কার্যকর হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে বন্দরের পরিষেবা খরচ এক লাফে গড়ে ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “আপনার খরচ হয়তো কম হতে পারে, কিন্তু পণ্য খালাসে এখন সময় অনেক বেশি লাগছে। পোর্টে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, ব্যবসায়ীদের ডেমারেজ দিতে হচ্ছে—যা ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে পোর্ট চার্জ কম না হলেও সেখানে কার্যক্রম খুব দ্রুত সম্পন্ন হয়। উদাহরণস্বরূপ, গার্মেন্টস শিল্পের উদ্যোক্তারা অভিযোগ করেন যে তাঁদের পণ্য দ্রুত পৌঁছায় না। আপনার উৎপাদিত পণ্য যদি দ্রুত পৌঁছাতে পারে এবং শিপিং খরচ বাঁচানো সম্ভব হয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে রেট বেশি দিলেও সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি লাভবান হয়।”

সালেহউদ্দিন আহমেদ নিশ্চিত করে জানান, “বন্দরে দ্রুতগতির উন্নত সেবা নিশ্চিত করতেই শুল্ক বাড়ানো হয়েছে।” তিনি মনে করেন, “ব্যবসায়ীদের এই পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে বুঝতে হবে। যারা দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য সার্ভিস চান, তাদের জন্য সার্ভিসের মান উন্নত করতে হবে। এজন্য আমরা নতুন একটি টার্মিনালও তৈরি করছি। তবে টার্মিনাল ও সার্ভিসের মান উন্নয়নে খরচ বিবেচনা করে সঠিক সার্ভিস চার্জ বা কস্ট প্রাইস নেওয়াই যুক্তিসঙ্গত। সুতরাং, ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় সঠিক চার্জ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।”

বর্তমানে এই পরিবর্তনের তীব্র সমালোচনা হচ্ছে যে সরকার বিদেশি অপারেটরদের সুবিধা দিতেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এই দাবি নাকচ করেছেন। অর্থ সচিব ড. মোহাম্মদ খায়েরুজ্জামান মজুমদার দাবি করেন, এটি শুল্ক বৃদ্ধি নয়, বরং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে দীর্ঘ দিন পর তা ‘সমন্বয়’ করা হয়েছে।

অর্থ সচিব বলেন, “বাস্তবতা হলো, চার্জ বর্তমান প্রয়োজন অনুযায়ী আপগ্রেড করা হয়েছে। ৩০ বছর আগের শুল্ক হারকে সমন্বয় করা হয়েছে এবং তা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেই করা হয়েছে। এটি অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনও কম রাখা হয়েছে। এই সমন্বয় ব্যবসায়ীদের কার্যক্রমে সময়োপযোগী সুবিধা নিশ্চিত করবে এবং সার্ভিসের মান উন্নত করবে। এছাড়া, ফি বাড়ানোর মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থও বিনিয়োগ করা যাবে, যা সেবার মান নিশ্চিত করবে।” এক প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, শুল্ক বাড়ানোয় পণ্য খালাসে হয়রানি কমবে এবং ব্যবসায়ীদের বাড়তি কোনো অর্থ দিতে হবে না।

তবে অর্থ উপদেষ্টার এমন বক্তব্যে ব্যবসায়ীরা একমত নন। তাঁদের শঙ্কা, শুল্ক বাড়ানোর পরও ঘুষ-অনিয়ম বন্ধ হবে না। এই বিষয়ে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “যেসব কন্ট্রাক্ট করা হয়েছে, সেগুলো মানা হচ্ছে। অতিরিক্ত পেমেন্ট বা বিনা খরচে অন্য কোনো সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।” তিনি আরও বলেন, “কম খরচে কেউ ভালো সেবা দিতে পারবে না। ভালো মানের সেবা পেতে হলে কিছুটা বেশি ফি নেওয়াই বাস্তব। এটি সমস্যা নয়, বরং সার্ভিসের মান নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন।”

শুল্ক বৃদ্ধি নিয়ে অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “উপদেষ্টা বলেছেন শুল্ক বাড়লে দ্রুত সেবা কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। কিন্তু সেটা তিনি কিভাবে নিশ্চিত করবেন? যদি নিশ্চিত করতে পারেন তাহলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।”

বিকেএমইএ সভাপতি আরও বলেন, “দুর্নীতিবাজ কাস্টম কর্মকর্তাদের কারণেই মূলত ধীরগতি হয়। তাদের যদি টাকা দেওয়া হয়, তাহলে দ্রুত খালাস হয়। আর তা না হলে তারা মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খুঁজে খুঁজে দীর্ঘ করার উপায় বের করে এবং অবৈধ অর্থ দাবি করেন। সুতরাং অর্থ উপদেষ্টাকে নিশ্চিত করতে হবে যে বর্ধিত হারে চার্জ দিলেও দুর্নীতি থাকবে না অথবা যথাসময়ে কাজ সম্পন্ন হবে।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, “গত ৪০ বছরে কেন শুল্কের হার বাড়ানো হলো না? এখন হঠাৎ করে কেন একবারে ৪০ শতাংশ বা তার বেশি বাড়ানো হলো? এটা শিল্পের জন্য একটা বোঝা। বছরে বছরে ক্রমান্বয়ে বাড়ালে এটা শিল্পের জন্য ভালো হতো এবং সরকারের জন্য ভালো হতো। আমাদের দাবি, যাতে শিল্পের ক্ষতি না হয় এবং এই বর্ধিত হারে শুল্ক দেওয়ার পরেও কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করা হয়।”