বাংলাদেশের সামরিক ব্যবস্থার ইতিহাসে তথাকথিত ব্যারিস্টার তাপস হত্যাচেষ্টা মামলা একটি অত্যন্ত অন্ধকার ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত, যা আজও বহু প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি। পাঁচজন সেনা অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা, তাদের আটক ও নির্যাতন করা, তদন্ত প্রক্রিয়ায় অবমাননাকর অনিয়ম এবং আলামত ব্যবস্থাপনার ‘চেইন-অব-কাস্টডি’ ভঙ্গ—সবকিছুই এই ইঙ্গিত দেয় যে এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত সামরিক অপারেশন ছিল। এই অপারেশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকা দেশপ্রেমী, পেশাদার এবং বিডিআর বিদ্রোহ-বিষয়ক তথ্য-অধিকারী অফিসারদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া।
১. ঘটনা-পরবর্তী চিত্র: পুলিশের চূড়ান্ত রিপোর্টেই ভেঙে পড়ে পুরো গল্প
ঘটনার কয়েক মাস পর পাঁচজন সেনা অফিসারকে সামরিক আইনে অভিযুক্ত করে সিভিল জেলে পাঠানো হয়। কিন্তু তদন্ত কমিটির প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমামুল হুদা (অব:) কমিশনে স্পষ্টভাবে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন: ‘অফিসারদের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো প্রমাণ কমিটি পায়নি।’ তবুও ‘পারিপার্শ্বিক প্রমাণ’ দেখিয়ে অফিসারদের অভিযুক্ত করা হয়, যা সামরিক তদন্ত প্রক্রিয়ার জন্য এক ভয়াবহ নজির স্থাপন করে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ পুলিশ এই মামলাটিকে ভিত্তিহীন ঘোষণা করে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। পুলিশ রিপোর্টে বলা হয়: অফিসারদের উদ্দেশ্যমূলকভাবে ফাঁসানো হয়েছিল। এই একটি বাক্যই পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের জবাবদিহিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
২. প্রেক্ষাপট: সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প
কমিশন তার মূল্যায়নে বলেছে যে, ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারির বিডিআর হত্যাকাণ্ড ও এর পরবর্তী পদক্ষেপগুলো ছিল একটি বৃহত্তর আক্রমণের অংশ, যার উদ্দেশ্য ছিল:
- সেনাবাহিনীকে দুর্বল করা।
- যোগ্য অফিসারদের সরিয়ে মেরুদণ্ডহীন কমান্ড স্ট্রাকচার তৈরি করা।
- ভারতীয় এজেন্ডার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নেতৃত্ব পুনর্গঠন করা।
- সিনিয়র-জুনিয়রদের মনোবল ভেঙে তাদের মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি করা।
পরিকল্পিতভাবে ১৬ বছরে অসংখ্য সৎ অফিসারকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে; ২০১৯ সালে বিদেশী সম্পর্ক থাকার অভিযোগে ৫৭ জন অফিসারকে ছাঁটাই করা হয় এবং রাজনীতিমুখী ও আনুগত্যনির্ভর অফিসাররা শীর্ষ পদে পৌঁছান। এই পুরো প্রেক্ষাপটে তথাকথিত তাপস হত্যাচেষ্টা মামলা ছিল একটি ‘টার্গেটেড অপারেশন’।
৩. পাঁচ অফিসারের আটক: আইন অমান্য করে ছায়া-অপারেশন
অফিসারদের বিরুদ্ধে কোনো লিখিত অভিযোগ ছিল না, ছিল না কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা। ডিজিএফআই-এর কেবল মৌখিক নির্দেশেই তাদের আটক করা হয় এবং তাদের পরিবারকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। অফিসাররা বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে সক্রিয়ভাবে তথ্য অনুসন্ধান করছিলেন এবং কিছু অত্যন্ত স্পর্শকাতর তথ্যও জানতে পেরেছিলেন। ঠিক এই মুহূর্তেই তাদের বিরুদ্ধে একটি সন্দেহজনক ‘হত্যাচেষ্টা’ স্ক্রিপ্ট তৈরি করা হয়।
৪. তদন্ত ছিল না—ছিল নির্যাতন দিয়ে স্বীকারোক্তি বের করার অপারেশন
৪.১ জেআইসি: রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের কারখানা
জেআইসি-তে (জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল) অফিসারদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল—‘যেভাবেই হোক স্বীকারোক্তি বের করা।’ এই পর্যায়ে মেজর জেনারেল ইমরুল কায়েস ও মেজর জেনারেল সালেহ তদন্ত প্রক্রিয়াকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন।
৪.২ প্রথম তদন্ত আদালত: প্রমাণ না পেয়েও এআইসিতে পাঠানো
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমামুল হুদার নেতৃত্বে প্রথম তদন্ত আদালত কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। কিন্তু এর পরও অফিসারদের গোপনে এআইসি-তে (আর্মি ইন্টেলিজেন্স সেন্টার) পাঠানো হয়; সেখানে আবারও শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয় এবং জোর করে সাদা কাগজে সই নেওয়া হয়। সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে পরে তাতে টাইপ করা ‘স্বীকারোক্তি’ জুড়ে দেওয়া—এটি সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ। অফিসারদের বলা হয়েছিল: ‘জবানবন্দী না দিলে পরিবারের ক্ষতি হবে—প্রয়োজনে এখনই দেখানো হবে।’ পরিবারের লাইভ ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা—এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার ইতিহাসে এক ভয়াবহ নজির।
৫. দ্বিতীয় তদন্ত আদালত: সাদা কাগজে স্বাক্ষরকৃত জবানবন্দী ‘প্রমাণ’ হিসেবে ব্যবহার
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমামুল হুদা, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদ হাসান ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব সারোয়ার মিলে দ্বিতীয় তদন্ত আদালত পরিচালনা করেন। তদন্ত আদালত যা করেছে:
- সাদা কাগজে নেওয়া স্বাক্ষরের ওপর ভিত্তি করে ‘স্বীকারোক্তিমূলক’ জবানবন্দী তৈরি।
- অফিসারদের আবারও হুমকি দেওয়া—‘এআইসি গাড়ি বাইরে দাঁড়িয়ে আছে’।
এটি কোনো তদন্ত ছিল না—এটি ছিল একটি পূর্বনির্ধারিত রায়।
৬. আলামত ব্যবস্থাপনা: চেইন অব কাস্টডি ভেঙে দেওয়া
মামলাটি যাতে আদালতে গ্রহণযোগ্য না থাকে, সেজন্য আলামত ব্যবস্থাপনার চেইন অব কাস্টডি ভেঙে দেওয়া হয়।
৬.১ মোবাইল সিম
মোবাইল সিম অফিসারদের নামে ছিল না; এবং এর ক্রয় উৎস যাচাই করা হয়নি।
৬.২ প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ
ইউনিট অধিনায়ক জানিয়েছেন—এই ধরনের সরঞ্জাম এককভাবে কেউ নিতে বা লুকাতে পারে না। তাহলে এগুলো কারা ‘উদ্ধার’ করল? কীভাবে ‘আনা হলো’? কে কোথায় রাখল? এসবের কোনো জবাব নেই।
৬.৩ অস্ত্রভর্তি ট্রাঙ্ক
ইউনিটে কোনো ক্রাইম সিন প্রটোকল মানা হয়নি; ডিএনএ/ফিঙ্গারপ্রিন্ট/লগবুক কিছুই সংরক্ষণ করা হয়নি। ইউনিটের অধিনায়ক বলেছেন—‘আমাদের ইউনিটে এমন ঘটনা ঘটেনি।’ এটি কোনো অপরাধ ছিল না—এটি ছিল অপরাধ সাজানোর চেষ্টা।
৭. সংশ্লিষ্ট সিনিয়র অফিসারদের ভূমিকা: দায় এড়ানো অসম্ভব
যাদের বিরুদ্ধে কমিশনের সরাসরি পর্যবেক্ষণ রয়েছে: লে. জেনারেল মোল্লা ফজলে আকবর (সাবেক ডিজি, ডিজিএফআই); মেজর জেনারেল ইমরুল কায়েস; মেজর জেনারেল সালেহ; ব্রি. জেনারেল ইমামুল হুদা ও মেজর জেনারেল রেজানূর।
তাদের ভূমিকার মধ্যে ছিল—বেআইনি আটক; নির্যাতন; পরিবারের সদস্যদের ব্ল্যাকমেইল; সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া; ভুয়া/অনিয়মিত আলামত উদ্ধার; চেইন অব কাস্টডি ভঙ্গ এবং তদন্ত আদালতকে প্রভাবিত করা। এগুলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভয়াবহ অপব্যবহার ছাড়া আর কিছু নয়।
প্রাপ্ত তথ্য, সাক্ষ্য, পুলিশের চূড়ান্ত রিপোর্ট, তদন্ত প্রক্রিয়ার ভয়াবহ অনিয়ম এবং চেইন অব কাস্টডি ভঙ্গ—সবকিছু মিলে পরিষ্কার যে, তথাকথিত তাপস হত্যাচেষ্টা মামলা কোনো অপরাধের বিচার ছিল না। বরং এটি একটি টার্গেটেড অপারেশন ছিল, যার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর যোগ্য, বুদ্ধিমান, বিদ্রোহ সংক্রান্ত তথ্য-অধিকারী অফিসারদের সরিয়ে দেওয়া হয়। এটি শুধু সেনাবাহিনীর নয়—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিচার এবং প্রশাসনিক নৈতিকতার ওপর আঘাত।
রিপোর্টারের নাম 























