আজকের এই দিনে টাঙ্গাইল শহর হানাদারমুক্ত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। মুক্তির আনন্দে এদিন হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল টাঙ্গাইল। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাকিস্তানি বাহিনী পালানোর মধ্য দিয়ে মুক্ত হয়েছিল টাঙ্গাইল।
মুক্তিযুদ্ধকালীন টাঙ্গাইলের অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতাপূর্ণ গেরিলা যুদ্ধের কাহিনি দেশের সীমানা পেড়িয়ে বহির্বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়েছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গঠিত ও পরিচালিত ‘কাদেরিয়া বাহিনীর’ বীরত্বের কথা স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্যমতে, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পরপরই দেশকে শত্রুমুক্ত করতে টাঙ্গাইলে স্বাধীন বাংলা গণমুক্তি পরিষদ গঠন করা হয়। চলতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ। ২৬ মার্চ গণমুক্তি পরিষদের উদ্যোগে টাঙ্গাইল সদর থানায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ২৭ মার্চ বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত সভায় টাঙ্গাইলকে স্বাধীন ঘোষণা করা হয়। ওই দিন রাতেই সার্কিট হাউজ আক্রমণ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। ওই আক্রমণে দুই জন পাকিস্তানি হানাদার নিহত হয় ও ১৫০ জন আত্মসমর্পণ করে। প্রথম আক্রমণে ব্যাপক সাফল্য পাওয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। এরপর থেকে গ্রামে গ্রামে যুবকরা সংগঠিত হতে থাকেন। টাঙ্গাইল মুক্তি বাহিনীর দখলে চলে যাওয়ায় ৩ এপ্রিল ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলে প্রবেশের চেষ্টা করে পাকিস্তানি বাহিনী। তখন মির্জাপুর উপজেলার গোড়ান-সাটিয়াচড়া নামক স্থানে ইপিআর ও মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
এরপর হানাদার বাহিনী টাঙ্গাইল শহরে প্রবেশ করলে নিরাপদ স্থানে চলে যান মুক্তিযোদ্ধারা এবং নতুন করে অস্ত্র সংগ্রহ ও সংগঠিত হতে থাকেন। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হন। সখীপুর উপজেলার পাহাড়িয়া এলাকা বহেড়াতৈলে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে কাদেরিয়া বাহিনী গঠন করা হয়। শুরু হয় হানাদার বাহিনীর সঙ্গে একের পর এক যুদ্ধ। চারদিকের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে হানাদার বাহিনী।
১০ ডিসেম্বর বিকালে টাঙ্গাইল শহরের উত্তরে কালিহাতী উপজেলার পৌঁছালে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর প্রায় দুই হাজার সেনা অবতরণ করায় হানাদারদের মনোবল একেবারে ভেঙে পড়ে। তারা ঢাকার দিকে ছুটতে থাকে। ১০ ডিসেম্বর রাতেই টাঙ্গাইল থানা দখল করে সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন মুক্তিযোদ্ধারা।
১১ ডিসেম্বর ভোর থেকে মুক্তিযোদ্ধারা বীর বেশে শহরে প্রবেশ করতে থাকেন এবং শহর নিজেদের দখলে নিয়ে হানাদারদের ধরতে থাকেন। এভাবেই টাঙ্গাইল শহর হানাদার মুক্ত হয়। মুক্তির আনন্দে উল্লাসিত মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে প্রকম্পিত করে তোলেন জেলা শহর।
টাঙ্গাইল হানাদারমুক্ত দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) বিকাল ৩টায় শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন কাদেরিয়া বাহিনীর সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে থাকবেন- বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ বীর বিক্রম, বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান তালুকদার বীর প্রতীক, বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন পাহাড়ি বীর প্রতীক, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গফুর বীর প্রতীক, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাকিম বীর প্রতীক, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক, বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী আফরাফ হুমায়ুন বাঙালি প্রমুখ।
রিপোর্টারের নাম 





















