ঢাকা ১০:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

ভূমিকম্পে আতঙ্ক নয় সচেতন হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:২৯:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর ২০২৫
  • ১০ বার পড়া হয়েছে

সম্প্রতি বাংলাদেশে মাত্র ৩১ ঘণ্টার মধ্যে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পসহ মোট চারটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) ৪টা ১৫ মিনিট ২০ সেকেন্ডে আবারও ৩ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ফলে দেশব্যাপী সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভূমিকম্প আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে রাজধানীর মানুষ এখন ভূমিকম্পের প্যানিক থেকে কিছুতেই বের হতে পারছেন না। তাছাড়া গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভূমিকম্প নিয়ে নানান গুজব ছড়িয়ে পড়েছে।

তবে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভূমিকম্প নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হতে হবে। কারণ ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও ভালোভাবে পূর্ব প্রস্তুতির ফলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।

এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার হোসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া।

ভূমিকম্পে সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার বিষয়ে অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশে সম্প্রতি ৫.৭ মাত্রার যে ভূমিকম্প হয়েছে এরকম ভূমিকম্পে মানুষ আতঙ্কিত হবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ তীব্র যেই ঝাঁকুনি এমন কিছু মানুষ এর আগে কখনও অনুভব করেনি। এইজন্য মানুষ আতঙ্কিত হওয়াটা স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পের পর আফটারশক হয়, সে কারণে মানুষ আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তিপর্যায়ে বা পেইজ থেকে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। কেউ কেউ বলছে ৫ ডিসেম্বর নাকি একটা বড় ভূমিকম্প হবে, সামনে আরও বড় কিছু হবে- এরকম অনেক কথাবার্তা ছড়িয়ে মানুষের মাঝে ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছে। যার কারণে অনেকে দেখলাম ভয়ে ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যাচ্ছেন। অনেকে রাতে ঘুমাতে পারছেন না। অনেক জায়গায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে।’

পুরোনো ঢাকার তিনজন নিহত হওয়ার স্থান, ২১ নভেম্বর, ২০২৫ (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন বন্ধ ঘোষণা করা হলো, তখন কিন্তু দেশব্যাপী আরও বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তারা কাদের সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা আমার জানা নেই। তবে তাদের এটা করা উচিত হয়নি। এর ফলে সমাজে একটা বিরূপ প্রভাব পড়েছে। আমরা যারা ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা করি আমাদের সঙ্গে অন্তত কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতো।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের যদি ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতনতা থাকতো তাহলে কিন্তু আমরা এতো বেশি আতঙ্কিত হতাম না বা কারও প্যানিক অ্যাটাক হতো না। এমনকি সেদিন যে দশ জন মারা গেছে সে রকম ঘটনাও কিন্তু ঘটতো না, যদি তারা সচেতন থাকতো। সেদিন তারা আতঙ্কিত হয়ে সঠিক জায়গায় অবস্থান না নিয়ে ভুল জায়গায় অবস্থান নিয়েছে সেজন্য মারা গেছে। এজন্য আমাদের সবার ভূমিকম্প সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।’

একই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে, ‘ভূমিকম্প কখন হবে এটা আসলে নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না। তবে আমরা যদি ভূমিকম্পে আতঙ্কিত না হয়ে কী করা উচিত সেটা জেনে রাখি, তাহলে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি কমবে।’

উন্নত বিশ্বের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘জাপান বা নিউজিল্যান্ডে কিন্তু ৫-৬ মাত্রার ভূমিকম্প রেগুলার হয়। ওরা কিন্তু এটা নিয়ে প্যানিক নেয় না। কারণ ওদের বাড়িঘর সেভাবেই নির্মিত। তাছাড়া ওখানকার মানুষজন ভূমিকম্প নিয়ে খুব সচেতন। তারা জানে ভূমিকম্পের সময় কি করতে হবে। তাই আমাদের উচিত আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়া।’

সম্প্রতি নরসিংদী মাদবধীতে হওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পরের দিন আবার ভূমিকম্প হয়েছে। সেই ভূমিকম্পে উৎপত্তিস্থল রাজধানীর বাড্ডায় বলে আবহাওয়া অধিদফতর জানালেও তা সরাসরি ‘ভুল এবং অপপ্রচার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার। তিনি বলেন, ‘বাড্ডায় ভূমিকম্পের যে তথ্য আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে সেটা সম্পূর্ণ ভুল। ওটা নরসিংদীর ওই ভূমিকম্পের আফটার শক।’

আবহাওয়া অফিসের সক্ষমতার প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া অধিদফতর এখনও নিজেদের দক্ষতা-সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি। ভূমিকম্প যখন হয় তখন কিন্তু কোথায় হয় বা কত মাত্রার হয় এটা ওরা বলতে পারে না। এদেরকে প্রশ্ন করলে বলে আমরা কাজ করছি। পরবর্তীতে যখন ইউএসডিএস-এর সাইটে ভূমিকম্পের আপডেট আসে বা ইন্ডিয়ান বা ইউরোপিয়ান অথবা আন্তর্জাতিক কোনও সংস্থার সাইটে যখন ভূমিকম্পের আপডেট দেয় তখন তারা ওই তথ্যটা দেখে হুবহু তুলে দেয়।’

ভূমিকম্পে আতঙ্ক নয় সচেতন হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

আবহাওয়া অধিদফতরের অসক্ষমতার বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়াও। এ বিষয়ে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নরসিংদীর মাদবধীতে যেই ভূমিকম্পটি হয়েছে তার আফটার শক হয়েছে বাকিগুলো। বাকিগুলোর উৎপত্তিস্থলও একইস্থানে। রাজধানীর বাড্ডায় ভূমিকম্পের যে তথ্য আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে তা সম্পূর্ণ ভুল তথ্য। সত্যি বলতে কোথায় কত মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে তা মেজরমেন্ট করার মতো সেই সক্ষমতা আবহাওয়া অধিদপ্তরের নেই। তারা সবসময় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভরশীল।’

ভবিষ্যতে বাংলাদেশে বড় কোনও ভূমিকম্পের সম্ভাবনা আছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘আমরা এটা নিয়ে কাজ করেছি। ভূমিকম্পের উৎস কোথায় আমরা সেটা বের করেছি। দুইটা বড় উৎসের একটা হচ্ছে মেঘালয়ের পাদদেশে। এটা ৮ মাত্রা হতে পারে। আরেকটা বড় উৎস সেটা এটার থেকে ভয়ঙ্কর, সেটা হচ্ছে “সাবডাকশন জোন”। পূর্বের যে পাহাড়গুলো আছে সিলেট থেকে কক্সবাজার ওটা। এই সাবডাকশন জোন শুরু হয়েছে সুনামগঞ্জ কিশোরগঞ্জ হাওর হয়ে মেঘনার পূর্বের অংশটা। এটা হবে ১২ মাত্রার ভূমিকম্প। এসব অনেকটা ইন্ডিয়ার দিকে ঝুঁকে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের গবেষণা বলছে, ওখানে এক হাজার বছর ধরে শক্তি সঞ্চয় হচ্ছে। ওখান থেকে এখনও শক্তি বের হয়নি। এই শক্তিটা এক সময় না এক সময় বের হবেই এবং হতেই হবে। এর কোনও বিকল্প নেই। যত সময় যাবে তত বেশি শক্তি সঞ্চয় হবে তত বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা।’

একই বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, ‘ভূমিকম্প বিষয়টা একেবারেই অনিশ্চিত। কখন হবে এটা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে ক্যালকুলেশন বলছে বাংলাদেশের সিলেট সীমান্ত ঘেঁষে একটা বড় ধরনের ভূমিকম্প হবে। সেটা ৮ মাত্রার অধিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’

ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার এমন প্রশ্নের জবাবে ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘ভূমিকম্প হলে কী করতে হবে এ বিষয়ে যখন সবাই জানবে যখন সচেতনতা সৃষ্টি হবে তখন আমরা কিছুটা হলেও ক্ষতি কমাতে সক্ষম হবো। এখন সরকার থেকে সচেতনতা ছাড়া আসলে কী উদ্যোগ নেয় সেটা আসলে তারা জানেন। কিন্তু বাস্তবতা তো ভিন্ন। এর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ভবন কমাতে হবে। এসব আমরা অনেকদিন ধরে বলেছি। কীভাবে কী করতে হবে, কিন্তু সরকার আমলে নেয়নি।’

চট্টগ্রামে ভূমিকম্পে ছয়তলা একটি ভবন পাশের ভবনের দিকে হেলে পড়েছে/ বাংলা ট্রিবিউন

তিনি আরও বলেন, ‘দুর্যোগ হবেই কিন্তু দুর্যোগ প্রতিরোধে প্রস্তুতি নিতে হবে। উন্নত দেশেও নিয়মিত ভূমিকম্প হয়। তারা কিন্তু সেটার পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে রাখে। উন্নত দেশে ভূমিকম্প হলে খুব শীঘ্রই পূর্বের অবস্থানে ফিরে আসার সেই সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তো আমরা যেন একটা দুর্যোগ হলে পূর্বের অবস্থানে ফিরে যেতে পারি সেই সক্ষমতা অর্জনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সেটার কোনও প্রস্তুতি বা পরিকল্পনায় আমি দেখতে পাচ্ছি না।’

ভূমিকম্পের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি বা স্বল্পমেয়াদে কী কী পরিকল্পনা সরকারের নেওয়া উচিত এমন প্রশ্নের জবাবে বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, ‘স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে ভূ-বিজ্ঞান বিষয়ক সাবজেক্ট চালু করা উচিত। শিক্ষার্থীরা যখন স্কুল কলেজ পর্যায়ে ভূ-বিজ্ঞান সম্পর্কে জানতে পারবে তখন কিন্তু সমাজে ভূমিকম্পের বিষয়ে যে সচেতনতা দরকার তা তৈরি হবে।’

একইসঙ্গে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের উচ্চতর গবেষণার জোর দেন তিনি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রপ্তানি আয়ে বড় ধাক্কা: আট মাসে আয় কমেছে ৩.১৫ শতাংশ, ফেব্রুয়ারিতে পরিস্থিতির অবনতি

ভূমিকম্পে আতঙ্ক নয় সচেতন হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

আপডেট সময় : ০৬:২৯:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর ২০২৫

সম্প্রতি বাংলাদেশে মাত্র ৩১ ঘণ্টার মধ্যে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পসহ মোট চারটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) ৪টা ১৫ মিনিট ২০ সেকেন্ডে আবারও ৩ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ফলে দেশব্যাপী সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভূমিকম্প আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে রাজধানীর মানুষ এখন ভূমিকম্পের প্যানিক থেকে কিছুতেই বের হতে পারছেন না। তাছাড়া গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভূমিকম্প নিয়ে নানান গুজব ছড়িয়ে পড়েছে।

তবে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভূমিকম্প নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হতে হবে। কারণ ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও ভালোভাবে পূর্ব প্রস্তুতির ফলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।

এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার হোসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া।

ভূমিকম্পে সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার বিষয়ে অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশে সম্প্রতি ৫.৭ মাত্রার যে ভূমিকম্প হয়েছে এরকম ভূমিকম্পে মানুষ আতঙ্কিত হবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ তীব্র যেই ঝাঁকুনি এমন কিছু মানুষ এর আগে কখনও অনুভব করেনি। এইজন্য মানুষ আতঙ্কিত হওয়াটা স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পের পর আফটারশক হয়, সে কারণে মানুষ আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তিপর্যায়ে বা পেইজ থেকে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। কেউ কেউ বলছে ৫ ডিসেম্বর নাকি একটা বড় ভূমিকম্প হবে, সামনে আরও বড় কিছু হবে- এরকম অনেক কথাবার্তা ছড়িয়ে মানুষের মাঝে ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছে। যার কারণে অনেকে দেখলাম ভয়ে ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যাচ্ছেন। অনেকে রাতে ঘুমাতে পারছেন না। অনেক জায়গায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে।’

পুরোনো ঢাকার তিনজন নিহত হওয়ার স্থান, ২১ নভেম্বর, ২০২৫ (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন বন্ধ ঘোষণা করা হলো, তখন কিন্তু দেশব্যাপী আরও বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তারা কাদের সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা আমার জানা নেই। তবে তাদের এটা করা উচিত হয়নি। এর ফলে সমাজে একটা বিরূপ প্রভাব পড়েছে। আমরা যারা ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা করি আমাদের সঙ্গে অন্তত কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতো।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের যদি ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতনতা থাকতো তাহলে কিন্তু আমরা এতো বেশি আতঙ্কিত হতাম না বা কারও প্যানিক অ্যাটাক হতো না। এমনকি সেদিন যে দশ জন মারা গেছে সে রকম ঘটনাও কিন্তু ঘটতো না, যদি তারা সচেতন থাকতো। সেদিন তারা আতঙ্কিত হয়ে সঠিক জায়গায় অবস্থান না নিয়ে ভুল জায়গায় অবস্থান নিয়েছে সেজন্য মারা গেছে। এজন্য আমাদের সবার ভূমিকম্প সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।’

একই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে, ‘ভূমিকম্প কখন হবে এটা আসলে নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না। তবে আমরা যদি ভূমিকম্পে আতঙ্কিত না হয়ে কী করা উচিত সেটা জেনে রাখি, তাহলে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি কমবে।’

উন্নত বিশ্বের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘জাপান বা নিউজিল্যান্ডে কিন্তু ৫-৬ মাত্রার ভূমিকম্প রেগুলার হয়। ওরা কিন্তু এটা নিয়ে প্যানিক নেয় না। কারণ ওদের বাড়িঘর সেভাবেই নির্মিত। তাছাড়া ওখানকার মানুষজন ভূমিকম্প নিয়ে খুব সচেতন। তারা জানে ভূমিকম্পের সময় কি করতে হবে। তাই আমাদের উচিত আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়া।’

সম্প্রতি নরসিংদী মাদবধীতে হওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পরের দিন আবার ভূমিকম্প হয়েছে। সেই ভূমিকম্পে উৎপত্তিস্থল রাজধানীর বাড্ডায় বলে আবহাওয়া অধিদফতর জানালেও তা সরাসরি ‘ভুল এবং অপপ্রচার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার। তিনি বলেন, ‘বাড্ডায় ভূমিকম্পের যে তথ্য আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে সেটা সম্পূর্ণ ভুল। ওটা নরসিংদীর ওই ভূমিকম্পের আফটার শক।’

আবহাওয়া অফিসের সক্ষমতার প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া অধিদফতর এখনও নিজেদের দক্ষতা-সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি। ভূমিকম্প যখন হয় তখন কিন্তু কোথায় হয় বা কত মাত্রার হয় এটা ওরা বলতে পারে না। এদেরকে প্রশ্ন করলে বলে আমরা কাজ করছি। পরবর্তীতে যখন ইউএসডিএস-এর সাইটে ভূমিকম্পের আপডেট আসে বা ইন্ডিয়ান বা ইউরোপিয়ান অথবা আন্তর্জাতিক কোনও সংস্থার সাইটে যখন ভূমিকম্পের আপডেট দেয় তখন তারা ওই তথ্যটা দেখে হুবহু তুলে দেয়।’

ভূমিকম্পে আতঙ্ক নয় সচেতন হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

আবহাওয়া অধিদফতরের অসক্ষমতার বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়াও। এ বিষয়ে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নরসিংদীর মাদবধীতে যেই ভূমিকম্পটি হয়েছে তার আফটার শক হয়েছে বাকিগুলো। বাকিগুলোর উৎপত্তিস্থলও একইস্থানে। রাজধানীর বাড্ডায় ভূমিকম্পের যে তথ্য আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে তা সম্পূর্ণ ভুল তথ্য। সত্যি বলতে কোথায় কত মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে তা মেজরমেন্ট করার মতো সেই সক্ষমতা আবহাওয়া অধিদপ্তরের নেই। তারা সবসময় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভরশীল।’

ভবিষ্যতে বাংলাদেশে বড় কোনও ভূমিকম্পের সম্ভাবনা আছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘আমরা এটা নিয়ে কাজ করেছি। ভূমিকম্পের উৎস কোথায় আমরা সেটা বের করেছি। দুইটা বড় উৎসের একটা হচ্ছে মেঘালয়ের পাদদেশে। এটা ৮ মাত্রা হতে পারে। আরেকটা বড় উৎস সেটা এটার থেকে ভয়ঙ্কর, সেটা হচ্ছে “সাবডাকশন জোন”। পূর্বের যে পাহাড়গুলো আছে সিলেট থেকে কক্সবাজার ওটা। এই সাবডাকশন জোন শুরু হয়েছে সুনামগঞ্জ কিশোরগঞ্জ হাওর হয়ে মেঘনার পূর্বের অংশটা। এটা হবে ১২ মাত্রার ভূমিকম্প। এসব অনেকটা ইন্ডিয়ার দিকে ঝুঁকে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের গবেষণা বলছে, ওখানে এক হাজার বছর ধরে শক্তি সঞ্চয় হচ্ছে। ওখান থেকে এখনও শক্তি বের হয়নি। এই শক্তিটা এক সময় না এক সময় বের হবেই এবং হতেই হবে। এর কোনও বিকল্প নেই। যত সময় যাবে তত বেশি শক্তি সঞ্চয় হবে তত বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা।’

একই বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, ‘ভূমিকম্প বিষয়টা একেবারেই অনিশ্চিত। কখন হবে এটা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে ক্যালকুলেশন বলছে বাংলাদেশের সিলেট সীমান্ত ঘেঁষে একটা বড় ধরনের ভূমিকম্প হবে। সেটা ৮ মাত্রার অধিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’

ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার এমন প্রশ্নের জবাবে ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘ভূমিকম্প হলে কী করতে হবে এ বিষয়ে যখন সবাই জানবে যখন সচেতনতা সৃষ্টি হবে তখন আমরা কিছুটা হলেও ক্ষতি কমাতে সক্ষম হবো। এখন সরকার থেকে সচেতনতা ছাড়া আসলে কী উদ্যোগ নেয় সেটা আসলে তারা জানেন। কিন্তু বাস্তবতা তো ভিন্ন। এর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ভবন কমাতে হবে। এসব আমরা অনেকদিন ধরে বলেছি। কীভাবে কী করতে হবে, কিন্তু সরকার আমলে নেয়নি।’

চট্টগ্রামে ভূমিকম্পে ছয়তলা একটি ভবন পাশের ভবনের দিকে হেলে পড়েছে/ বাংলা ট্রিবিউন

তিনি আরও বলেন, ‘দুর্যোগ হবেই কিন্তু দুর্যোগ প্রতিরোধে প্রস্তুতি নিতে হবে। উন্নত দেশেও নিয়মিত ভূমিকম্প হয়। তারা কিন্তু সেটার পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে রাখে। উন্নত দেশে ভূমিকম্প হলে খুব শীঘ্রই পূর্বের অবস্থানে ফিরে আসার সেই সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তো আমরা যেন একটা দুর্যোগ হলে পূর্বের অবস্থানে ফিরে যেতে পারি সেই সক্ষমতা অর্জনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সেটার কোনও প্রস্তুতি বা পরিকল্পনায় আমি দেখতে পাচ্ছি না।’

ভূমিকম্পের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি বা স্বল্পমেয়াদে কী কী পরিকল্পনা সরকারের নেওয়া উচিত এমন প্রশ্নের জবাবে বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, ‘স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে ভূ-বিজ্ঞান বিষয়ক সাবজেক্ট চালু করা উচিত। শিক্ষার্থীরা যখন স্কুল কলেজ পর্যায়ে ভূ-বিজ্ঞান সম্পর্কে জানতে পারবে তখন কিন্তু সমাজে ভূমিকম্পের বিষয়ে যে সচেতনতা দরকার তা তৈরি হবে।’

একইসঙ্গে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের উচ্চতর গবেষণার জোর দেন তিনি।