ঢাকা ০৪:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে স্থবিরতায় বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার শঙ্কা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:২৮:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদী অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইরান। সেই প্রশাসনিক আদেশ অমান্য করে প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করা অন্তত পাঁচটি বাণিজ্যিক জাহাজে সরাসরি হামলা চালিয়েছে দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি)। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও কৃষি সার পরিবহনের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক নৌপথে সাধারণ জাহাজ চলাচল পুনরায় প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি তেল ও প্রয়োজনীয় সার আমদানির ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও এর তীব্র ও সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকভাবে আমদানি করা জ্বালানি ও রাসায়নিক সারের একটি বিশাল অংশ হরমুজ প্রণালির এই পথ ব্যবহার করেই দেশে পৌঁছায়। উদ্ভূত এই জটিল পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় (Supply Chain) নতুন করে সৃষ্ট দীর্ঘ অচলাবস্থার কারণে বাংলাদেশে সার্বিক কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)।

আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটির মতে, বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের আকাশচুম্বী দাম বৃদ্ধি এবং স্বাভাবিক সরবরাহ বহুলাংশে কমে যাওয়ার কারণে আগামীতে বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও চরম নাজুক রূপ ধারণ করতে পারে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (WFP) হালনাগাদ প্রকাশিত একটি নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে কৃষিকাজে ব্যবহৃত মোট ইউরিয়া সারের প্রায় ৮০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে আমদানি করা হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি অবরুদ্ধ ও বন্ধ থাকায় এসব সরবরাহকারী দেশ থেকে সারের চালান বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে চরম অনিশ্চয়তা ও ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অবশ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতে যে পরিমাণ ইউরিয়া সার গচ্ছিত রয়েছে, তা দিয়ে আগামী অক্টোবর মাস পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ কৃষি চাহিদা কোনোমতে মেটানো সম্ভব হবে।

প্রতিবেদনে গভীরভাবে উল্লেখ করা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক খোলা বাজারে ইতোমধ্যে ইউরিয়া সারের সার্বিক দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ঠিক একই সময়ে দেশে তীব্র জাতীয় গ্যাস-সংকটের মারাত্মক প্রভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি প্রধান ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে তিনটিরই উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বন্ধ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশের সার্বিক রাসায়নিক সার সরবরাহ পরিস্থিতি বর্তমানে চরম চাপের মুখে পড়েছে।

ডব্লিউএফপির চরম আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সারের স্বাভাবিক সরবরাহ দ্রুততম সময়ে স্বাভাবিক ও নিশ্চিত করা না গেলে দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনে তার বড় ধরনের নেতিবাচক বিপর্যয় ঘটতে পারে। যার সরাসরি প্রভাবে দেশে সকল প্রকার খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেতে পারে এবং সার্বিকভাবে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে ধাবিত হতে পারে।

জাতিসংঘের ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে আরও এক আশঙ্কাজনক তথ্য দিয়ে বলা হয়েছে, চলমান এই বৈশ্বিক ও জাতীয় সংকটের সরাসরি প্রভাবে বাংলাদেশে আনুমানিক প্রায় এক কোটি ৮১ লাখ সাধারণ মানুষ মারাত্মক বা তীব্র খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন।

সার্বিক এই সংকটজনক পরিস্থিতি দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করতে দ্রুততম সময়ে বিকল্প আন্তর্জাতিক উৎস থেকে প্রয়োজনীয় সার আমদানি করা, দেশীয় সার কারখানায় জ্বালানি সরবরাহ সুনিশ্চিত করা এবং জাতীয় কৃষি উৎপাদন সার্বক্ষণিক সচল রাখতে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে জাতিসংঘের সংস্থা ডব্লিউএফপি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

এনসিটিবির মান যাচাই ছাড়াই শিক্ষার্থীদের হাতে ১,৭৮৫ কোটি টাকার পাঠ্যপুস্তক

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে স্থবিরতায় বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার শঙ্কা

আপডেট সময় : ০৩:২৮:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদী অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইরান। সেই প্রশাসনিক আদেশ অমান্য করে প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করা অন্তত পাঁচটি বাণিজ্যিক জাহাজে সরাসরি হামলা চালিয়েছে দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি)। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও কৃষি সার পরিবহনের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক নৌপথে সাধারণ জাহাজ চলাচল পুনরায় প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি তেল ও প্রয়োজনীয় সার আমদানির ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও এর তীব্র ও সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকভাবে আমদানি করা জ্বালানি ও রাসায়নিক সারের একটি বিশাল অংশ হরমুজ প্রণালির এই পথ ব্যবহার করেই দেশে পৌঁছায়। উদ্ভূত এই জটিল পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় (Supply Chain) নতুন করে সৃষ্ট দীর্ঘ অচলাবস্থার কারণে বাংলাদেশে সার্বিক কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)।

আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটির মতে, বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের আকাশচুম্বী দাম বৃদ্ধি এবং স্বাভাবিক সরবরাহ বহুলাংশে কমে যাওয়ার কারণে আগামীতে বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও চরম নাজুক রূপ ধারণ করতে পারে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (WFP) হালনাগাদ প্রকাশিত একটি নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে কৃষিকাজে ব্যবহৃত মোট ইউরিয়া সারের প্রায় ৮০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে আমদানি করা হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি অবরুদ্ধ ও বন্ধ থাকায় এসব সরবরাহকারী দেশ থেকে সারের চালান বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে চরম অনিশ্চয়তা ও ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অবশ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতে যে পরিমাণ ইউরিয়া সার গচ্ছিত রয়েছে, তা দিয়ে আগামী অক্টোবর মাস পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ কৃষি চাহিদা কোনোমতে মেটানো সম্ভব হবে।

প্রতিবেদনে গভীরভাবে উল্লেখ করা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক খোলা বাজারে ইতোমধ্যে ইউরিয়া সারের সার্বিক দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ঠিক একই সময়ে দেশে তীব্র জাতীয় গ্যাস-সংকটের মারাত্মক প্রভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি প্রধান ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে তিনটিরই উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বন্ধ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশের সার্বিক রাসায়নিক সার সরবরাহ পরিস্থিতি বর্তমানে চরম চাপের মুখে পড়েছে।

ডব্লিউএফপির চরম আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সারের স্বাভাবিক সরবরাহ দ্রুততম সময়ে স্বাভাবিক ও নিশ্চিত করা না গেলে দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনে তার বড় ধরনের নেতিবাচক বিপর্যয় ঘটতে পারে। যার সরাসরি প্রভাবে দেশে সকল প্রকার খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেতে পারে এবং সার্বিকভাবে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে ধাবিত হতে পারে।

জাতিসংঘের ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে আরও এক আশঙ্কাজনক তথ্য দিয়ে বলা হয়েছে, চলমান এই বৈশ্বিক ও জাতীয় সংকটের সরাসরি প্রভাবে বাংলাদেশে আনুমানিক প্রায় এক কোটি ৮১ লাখ সাধারণ মানুষ মারাত্মক বা তীব্র খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন।

সার্বিক এই সংকটজনক পরিস্থিতি দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করতে দ্রুততম সময়ে বিকল্প আন্তর্জাতিক উৎস থেকে প্রয়োজনীয় সার আমদানি করা, দেশীয় সার কারখানায় জ্বালানি সরবরাহ সুনিশ্চিত করা এবং জাতীয় কৃষি উৎপাদন সার্বক্ষণিক সচল রাখতে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে জাতিসংঘের সংস্থা ডব্লিউএফপি।