ঢাকা ০৬:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

এনসিটিবির মান যাচাই ছাড়াই শিক্ষার্থীদের হাতে ১,৭৮৫ কোটি টাকার পাঠ্যপুস্তক

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:৪৭:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

দেশের প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক স্তরের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য প্রস্তুতকৃত ও ছাপানো পাঠ্যপুস্তকের গুণগত শতভাগ মান নিশ্চিত করার মূল আইনি দায়িত্ব জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি)। চুক্তি ও নিয়ম অনুযায়ী এই মান নিশ্চিত করতে এনসিটিবির নির্ধারিত ইন্সপেকশন এজেন্টের পাশাপাশি সরকারি স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট’ (বিএসটিআই) এবং ‘বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ’ (বিসিএসআইআর)-এর আধুনিক ল্যাবে বইয়ে ব্যবহৃত কাগজের গুণগত মান পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে সেই অত্যাবশ্যকীয় কাজ সম্পন্ন না করেই সর্বমোট ১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার কোটি কোটি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বাঁধাই করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে তা শিক্ষার্থীদের হাতে পৌছে দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সরকারি আর্থিক বিধি ও চুক্তির কঠোর শর্তাবলি উপেক্ষা করে বইয়ের কাগজের যথাযথ মান যাচাই না করেই এই বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছে এনসিটিবি। অথচ সংশ্লিষ্ট পাঠ্যবইগুলোর মান নিশ্চিতকরণের জন্য বাধ্যতামূলক ল্যাব পরীক্ষার (টেস্ট) অফিশিয়াল রিপোর্ট সংগ্রহ করেনি সরকারি এই সংস্থাটি। সম্প্রতি এনসিটিবির ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের যাবতীয় কার্যাবলি নিয়ে বিশদ অডিট বা নিরীক্ষা পরিচালনা করেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের প্রস্তুতকৃত সেই চাঞ্চল্যকর অডিট প্রতিবেদন থেকেই এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।

অধিদপ্তরের অডিট প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের জন্য মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি, এসএসসি ভোকেশনাল, ইবতেদায়ী, দাখিল এবং দাখিল ভোকেশনাল স্তরের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও দেশের সর্বত্র সরবরাহে সর্বমোট ১ হাজার ৭৮৫ কোটি ৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭৭১ টাকা সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় করা হলেও—সেই বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে পাঠ্যপুস্তকের আসল গুণগত মান নিশ্চিত করতে উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কোনো সরকারি টেস্ট রিপোর্ট সংরক্ষণ করা হয়নি।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে নির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয় যে, চুক্তির পিসিসি ক্লজ ৩২.১ (PCC Clause 32.1) অনুযায়ী সরবরাহকৃত বইয়ের নমুনা ইন্সপেকশন এজেন্টের নিজস্ব ল্যাবের টেস্টের পাশাপাশি বিএসটিআই এবং বিসিএসআইআর-এর ল্যাবে পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু নথিপত্র ঘেঁটে শুধুমাত্র অননুমোদিত ইন্সপেকশন এজেন্টের ল্যাবের কিছু সাধারণ নমুনা টেস্ট রিপোর্ট নথিতে পাওয়া গেলেও, মূল সরকারি সংস্থা বিএসটিআই ও বিসিএসআইআরের কোনো টেস্ট রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া যেসব ইন্সপেকশন এজেন্টের ওপর ভিত্তি করে কোটি কোটি টাকার বই গ্রহণ করা হয়েছে, ওই এজেন্টের আদৌ মান যাচাইয়ের কোনো আইনগত এখতিয়ার বা রাষ্ট্রীয় অনুমোদন রয়েছে কিনা—এমন উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কোনো সনদ বা স্বীকৃতিপত্র অডিটের নথিপত্রে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের দেওয়া বইয়ের কাগজ ও মুদ্রণের মান আদৌ সরকারের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে পেরেছে কিনা, সে বিষয়ে অডিট অধিদপ্তর কোনোভাবেই নিশ্চিত হতে পারেনি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারি স্বীকৃত ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাগজ ও পাঠ্যপুস্তকের সঠিক মান যাচাইয়ের মূল আইনি দায়িত্ব বিএসটিআই ও বিসিএসআইআরের। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীদের থেকে এসব মানদণ্ডের কোনো পরীক্ষণ প্রতিবেদন সংগ্রহ না করে মান নিশ্চিত ছাড়াই বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, যা সরাসরি বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এই অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে অডিট প্রতিবেদনে পিসিসি ক্লজ ৩২.১ অনুযায়ী বিএসটিআই ও বিসিএসআইআরের টেস্ট রিপোর্ট সংগ্রহ না করে বই সরবরাহ করায় মানহীন বই সরবরাহের সম্ভাব্য দায়-দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করার জোর সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই গুরুতর বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণেরও জরুরি সুপারিশ পেশ করেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে এনসিটিবি সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘পাঠ্যপুস্তকের মান যাচাইয়ের জন্য ইন্সপেকশন এজেন্ট রয়েছে। তারাই এ কাজটি করে থাকে। বিসিএসআইআর কিংবা বিএসটির মাধ্যমে মাঝে মধ্যে মান যাচাই করা হয়। এটি নিয়মিত করা হয় না।’

ইন্সপেকশন এজেন্টের মান যাচাইয়ের আইনগত অনুমোদন বা উপযুক্ত সনদের ঘাটতি রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাদের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। সরকারই এ লাইসেন্স দিয়েছে।’ তখন ট্রেড লাইসেন্স কোনো মান যাচাইয়ের সার্টিফিকেট নয়—এমন প্রশ্ন করা হলে এনসিটিবির এই কর্মকর্তা যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘পিপিআরএ ইন্সপেকশন এজেন্ট দিয়েই মান যাচাইয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। আমাদের সন্দেহ হলে আমরা মাঝে মাঝে বিসিএসআইআর কিংবা বিএসটির মাধ্যমে মান যাচাই করি।’

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

সংসদ সদস্য গাজী নজরুলকে বহিষ্কার করলো জামায়াত, স্পিকার-ইসিকে চিঠি

এনসিটিবির মান যাচাই ছাড়াই শিক্ষার্থীদের হাতে ১,৭৮৫ কোটি টাকার পাঠ্যপুস্তক

আপডেট সময় : ০৪:৪৭:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

দেশের প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক স্তরের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য প্রস্তুতকৃত ও ছাপানো পাঠ্যপুস্তকের গুণগত শতভাগ মান নিশ্চিত করার মূল আইনি দায়িত্ব জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি)। চুক্তি ও নিয়ম অনুযায়ী এই মান নিশ্চিত করতে এনসিটিবির নির্ধারিত ইন্সপেকশন এজেন্টের পাশাপাশি সরকারি স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট’ (বিএসটিআই) এবং ‘বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ’ (বিসিএসআইআর)-এর আধুনিক ল্যাবে বইয়ে ব্যবহৃত কাগজের গুণগত মান পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে সেই অত্যাবশ্যকীয় কাজ সম্পন্ন না করেই সর্বমোট ১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার কোটি কোটি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বাঁধাই করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে তা শিক্ষার্থীদের হাতে পৌছে দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সরকারি আর্থিক বিধি ও চুক্তির কঠোর শর্তাবলি উপেক্ষা করে বইয়ের কাগজের যথাযথ মান যাচাই না করেই এই বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছে এনসিটিবি। অথচ সংশ্লিষ্ট পাঠ্যবইগুলোর মান নিশ্চিতকরণের জন্য বাধ্যতামূলক ল্যাব পরীক্ষার (টেস্ট) অফিশিয়াল রিপোর্ট সংগ্রহ করেনি সরকারি এই সংস্থাটি। সম্প্রতি এনসিটিবির ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের যাবতীয় কার্যাবলি নিয়ে বিশদ অডিট বা নিরীক্ষা পরিচালনা করেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের প্রস্তুতকৃত সেই চাঞ্চল্যকর অডিট প্রতিবেদন থেকেই এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।

অধিদপ্তরের অডিট প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের জন্য মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি, এসএসসি ভোকেশনাল, ইবতেদায়ী, দাখিল এবং দাখিল ভোকেশনাল স্তরের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও দেশের সর্বত্র সরবরাহে সর্বমোট ১ হাজার ৭৮৫ কোটি ৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭৭১ টাকা সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় করা হলেও—সেই বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে পাঠ্যপুস্তকের আসল গুণগত মান নিশ্চিত করতে উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কোনো সরকারি টেস্ট রিপোর্ট সংরক্ষণ করা হয়নি।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে নির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয় যে, চুক্তির পিসিসি ক্লজ ৩২.১ (PCC Clause 32.1) অনুযায়ী সরবরাহকৃত বইয়ের নমুনা ইন্সপেকশন এজেন্টের নিজস্ব ল্যাবের টেস্টের পাশাপাশি বিএসটিআই এবং বিসিএসআইআর-এর ল্যাবে পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু নথিপত্র ঘেঁটে শুধুমাত্র অননুমোদিত ইন্সপেকশন এজেন্টের ল্যাবের কিছু সাধারণ নমুনা টেস্ট রিপোর্ট নথিতে পাওয়া গেলেও, মূল সরকারি সংস্থা বিএসটিআই ও বিসিএসআইআরের কোনো টেস্ট রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া যেসব ইন্সপেকশন এজেন্টের ওপর ভিত্তি করে কোটি কোটি টাকার বই গ্রহণ করা হয়েছে, ওই এজেন্টের আদৌ মান যাচাইয়ের কোনো আইনগত এখতিয়ার বা রাষ্ট্রীয় অনুমোদন রয়েছে কিনা—এমন উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কোনো সনদ বা স্বীকৃতিপত্র অডিটের নথিপত্রে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের দেওয়া বইয়ের কাগজ ও মুদ্রণের মান আদৌ সরকারের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে পেরেছে কিনা, সে বিষয়ে অডিট অধিদপ্তর কোনোভাবেই নিশ্চিত হতে পারেনি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারি স্বীকৃত ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাগজ ও পাঠ্যপুস্তকের সঠিক মান যাচাইয়ের মূল আইনি দায়িত্ব বিএসটিআই ও বিসিএসআইআরের। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীদের থেকে এসব মানদণ্ডের কোনো পরীক্ষণ প্রতিবেদন সংগ্রহ না করে মান নিশ্চিত ছাড়াই বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, যা সরাসরি বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এই অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে অডিট প্রতিবেদনে পিসিসি ক্লজ ৩২.১ অনুযায়ী বিএসটিআই ও বিসিএসআইআরের টেস্ট রিপোর্ট সংগ্রহ না করে বই সরবরাহ করায় মানহীন বই সরবরাহের সম্ভাব্য দায়-দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করার জোর সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই গুরুতর বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণেরও জরুরি সুপারিশ পেশ করেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে এনসিটিবি সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘পাঠ্যপুস্তকের মান যাচাইয়ের জন্য ইন্সপেকশন এজেন্ট রয়েছে। তারাই এ কাজটি করে থাকে। বিসিএসআইআর কিংবা বিএসটির মাধ্যমে মাঝে মধ্যে মান যাচাই করা হয়। এটি নিয়মিত করা হয় না।’

ইন্সপেকশন এজেন্টের মান যাচাইয়ের আইনগত অনুমোদন বা উপযুক্ত সনদের ঘাটতি রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাদের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। সরকারই এ লাইসেন্স দিয়েছে।’ তখন ট্রেড লাইসেন্স কোনো মান যাচাইয়ের সার্টিফিকেট নয়—এমন প্রশ্ন করা হলে এনসিটিবির এই কর্মকর্তা যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘পিপিআরএ ইন্সপেকশন এজেন্ট দিয়েই মান যাচাইয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। আমাদের সন্দেহ হলে আমরা মাঝে মাঝে বিসিএসআইআর কিংবা বিএসটির মাধ্যমে মান যাচাই করি।’