দেশের একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) আকস্মিক কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ-এর সমস্যা দ্রুত সমাধান করে দেশজুড়ে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় স্বাভাবিক করতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। গতকাল বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সংশ্লিষ্ট এফএসআরইউ থেকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বর্তমানে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশনসহ বাসা-বাড়ির অন্যান্য গ্রাহকেরাও গ্যাসের স্বল্পচাপ অনুভব করছেন। বিশেষ করে দেশের বহু সিএনজি স্টেশন প্রয়োজনের তুলনায় উপযুক্ত পরিমাণ গ্যাস গ্রহণ করতে না পারায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে এবং সাময়িক চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এফএসআরইউটির বিদ্যমান কারিগরি ত্রুটি দ্রুত নিরসনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাসহ বিশেষজ্ঞ দল নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এর পাশাপাশি বর্তমানে পাওয়া সীমিত সরবরাহের সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের মাধ্যমে জরুরি ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোতে সার্বক্ষণিক গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখার জোর চেষ্টা চলছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক মূল কারণ এফএসআরইউটির এই প্রযুক্তিগত ত্রুটি হলেও, দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতার কারণেই মূলত এর ক্ষতিকর প্রভাব আরও তীব্র রূপ ধারণ করেছে। অতীতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নিজস্ব উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব না দেওয়ায় বাধ্য হয়ে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলশ্রুতিতে আমদানি সংক্রান্ত অবকাঠামোর যেকোনো একটি অংশে সমস্যা দেখা দিলেই পুরো জাতীয় গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মক চাপের মুখে পড়ে।
বর্তমান এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করতে সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বহুমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। জাতীয় পর্যায়ক্রমে সর্বমোট ১০০টি নতুন কূপ খননের একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ এলাকায় প্রায় ৭২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি নতুন গ্যাসকূপ খননের বিশেষ প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সরকারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করতে অনশোর ও অফশোর মডেল পিএসসি (PSC)-র আওতায় আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানসহ দেশি-বিদেশি বড় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার বহুমুখী কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। তবে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, কূপ খনন কার্য সম্পন্ন, প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং চূড়ান্ত উৎপাদন শুরু করতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়। তাই বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা এই পুঞ্জীভূত সংকটের স্থায়ী ও সম্পূর্ণ সমাধান তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব না হলেও, সরকার গোটা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দিনরাত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করাসহ জাতীয় সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সরকার আরও বেশ কিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে বলে জানানো হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—দেশের চতুর্থ এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান, মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে নিরাপদ এলএনজি আমদানির বাস্তব রূপরেখা যাচাই, ভোলার উৎপাদিত গ্যাস মূল ভূখণ্ডে সরাসরি নিয়ে আসার জন্য দীর্ঘ পাইপলাইনসহ বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা পর্যালোচনা, দেশীয় পুরোনো কূপগুলোর পুনর্খনন (ওয়ার্কওভার) এবং জ্বালানি আমদানির উৎস ও প্রযুক্তি অবকাঠামোর আধুনিকায়ন।
অবশেষে সরকার দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক ও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে আশ্বস্ত করেছে। এফএসআরইউটির চলমান কারিগরি ত্রুটি মিটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটবে বলে আশা ব্যক্ত করা হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 






















