ঢাকা ০২:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

বাবার দাফন শেষে এটিএম বুথে রাতভর ডিউটি, সকালে এইচএসসি পরীক্ষা: অদম্য ইকন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৩১:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

জেলা প্রতিনিধি, বাগেরহাট: বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করে রাতেই কর্মস্থলে ফিরেছেন বাগেরহাটের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ইকন। রাতভর এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন করে সকালে তাকে অংশ নিতে হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষায়। বাবা হারানোর শোক, পরিবারের অন্নসংস্থান এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার কঠিন লড়াই—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে এই অদম্য তরুণকে।

মঙ্গলবার ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়েন বাগেরহাট শহরের মুনিগঞ্জ মেডিকেল স্কুল রোড এলাকার বাসিন্দা ইসরাফিল দাড়িয়া (৪৫)। সকাল ৬টার দিকে তাকে বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ইসরাফিল স্ত্রী ও দুই ছেলে ইমন ও ইকনকে রেখে গেছেন। তিনি মোটরসাইকেল চালিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ করতেন। জোহরের নামাজের পর মুনিগঞ্জ দোতলা জামে মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মরদেহ গোপালগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, বড় ছেলে ইমন একসময় বাবার সঙ্গে মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসারে সহযোগিতা করতেন। তবে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। ফলে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হয়ে ওঠেন ছোট ছেলে ইকন।

ইকন বাগেরহাট খানজাহান আলী ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের খরচ জোগাতে বাগেরহাট শহরের রেলরোড এলাকায় কৃষি ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে রাতের শিফটে পার্টটাইম চাকরি করেন তিনি।

বাবার দাফন শেষে মঙ্গলবার রাতেই তিনি কর্মস্থলে যোগ দেন। রাত ১০টার দিকে তাকে এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। আগামী ২২ জুলাই ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে তার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

কৃষি ব্যাংকের নিয়মিত গ্রাহক রাহুল পারভেজ জানান, তিনি প্রায়ই রাতে টাকা তুলতে সেখানে যান। যতবারই তিনি সেখানে গেছেন, ছেলেটিকে একটি বই হাতে বসে থাকতে দেখেছেন। কেউ টাকা তুলতে এলে সে দরজা খুলে দেয় এবং দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করে।

স্থানীয় বাসিন্দা বিমল পাল ষষ্ঠ বলেন, রাতে প্রায়ই ছেলেটিকে এটিএম বুথে দেখা যায়। কোনো গ্রাহক এলে সে সহযোগিতা করে। গ্রাহক চলে গেলে আবার বই নিয়ে পড়তে বসে। তিনি আরও জানান, কৌতূহলবশত ইকনের সঙ্গে কথা বললে সে জানায়, পরিবারে উপার্জন করার মতো সে ছাড়া আর কেউ নেই। বড় ভাই মানসিক ভারসাম্যহীন এবং বাবা কয়েক ঘণ্টা আগে মারা গেছেন।

বাবাকে হারানোর গভীর শোক, মানসিক ভারসাম্যহীন বড় ভাই, পরিবারের দায়িত্ব এবং নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম—সব মিলিয়ে ইকন এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। তার এই অদম্য মানসিকতা এবং দৃঢ় সংকল্প অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ফাইনাল নিয়ে ষড়যন্ত্রের গুঞ্জন উড়িয়ে দিলেন মেদিনা: ‘গুজবে কান দেবেন না’

বাবার দাফন শেষে এটিএম বুথে রাতভর ডিউটি, সকালে এইচএসসি পরীক্ষা: অদম্য ইকন

আপডেট সময় : ১২:৩১:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

জেলা প্রতিনিধি, বাগেরহাট: বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করে রাতেই কর্মস্থলে ফিরেছেন বাগেরহাটের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ইকন। রাতভর এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন করে সকালে তাকে অংশ নিতে হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষায়। বাবা হারানোর শোক, পরিবারের অন্নসংস্থান এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার কঠিন লড়াই—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে এই অদম্য তরুণকে।

মঙ্গলবার ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়েন বাগেরহাট শহরের মুনিগঞ্জ মেডিকেল স্কুল রোড এলাকার বাসিন্দা ইসরাফিল দাড়িয়া (৪৫)। সকাল ৬টার দিকে তাকে বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ইসরাফিল স্ত্রী ও দুই ছেলে ইমন ও ইকনকে রেখে গেছেন। তিনি মোটরসাইকেল চালিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ করতেন। জোহরের নামাজের পর মুনিগঞ্জ দোতলা জামে মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মরদেহ গোপালগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, বড় ছেলে ইমন একসময় বাবার সঙ্গে মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসারে সহযোগিতা করতেন। তবে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। ফলে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হয়ে ওঠেন ছোট ছেলে ইকন।

ইকন বাগেরহাট খানজাহান আলী ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের খরচ জোগাতে বাগেরহাট শহরের রেলরোড এলাকায় কৃষি ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে রাতের শিফটে পার্টটাইম চাকরি করেন তিনি।

বাবার দাফন শেষে মঙ্গলবার রাতেই তিনি কর্মস্থলে যোগ দেন। রাত ১০টার দিকে তাকে এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। আগামী ২২ জুলাই ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে তার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

কৃষি ব্যাংকের নিয়মিত গ্রাহক রাহুল পারভেজ জানান, তিনি প্রায়ই রাতে টাকা তুলতে সেখানে যান। যতবারই তিনি সেখানে গেছেন, ছেলেটিকে একটি বই হাতে বসে থাকতে দেখেছেন। কেউ টাকা তুলতে এলে সে দরজা খুলে দেয় এবং দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করে।

স্থানীয় বাসিন্দা বিমল পাল ষষ্ঠ বলেন, রাতে প্রায়ই ছেলেটিকে এটিএম বুথে দেখা যায়। কোনো গ্রাহক এলে সে সহযোগিতা করে। গ্রাহক চলে গেলে আবার বই নিয়ে পড়তে বসে। তিনি আরও জানান, কৌতূহলবশত ইকনের সঙ্গে কথা বললে সে জানায়, পরিবারে উপার্জন করার মতো সে ছাড়া আর কেউ নেই। বড় ভাই মানসিক ভারসাম্যহীন এবং বাবা কয়েক ঘণ্টা আগে মারা গেছেন।

বাবাকে হারানোর গভীর শোক, মানসিক ভারসাম্যহীন বড় ভাই, পরিবারের দায়িত্ব এবং নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম—সব মিলিয়ে ইকন এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। তার এই অদম্য মানসিকতা এবং দৃঢ় সংকল্প অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।