ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর প্রায় দুই দশকের পুরনো ‘শরৎ উৎসব’ প্রথমে বন্ধ এবং পরে ‘স্থগিত’ করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেখক জোবাইদা নাসরীন এক গভীর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ বা বাধা দেওয়ার পেছনে থাকা ‘আপত্তি’ উৎপাদনের কারখানাটি কোথায়?
ধারাবাহিক আপত্তির ঘটনাপ্রবাহ
লেখক বেশ কয়েকটি সাম্প্রতিক ঘটনা তুলে ধরে দেখিয়েছেন যে, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান বন্ধের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ:
শরৎ উৎসব স্থগিত: অনুষ্ঠানের আগের রাতে চারুকলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম ফোনে আসা ‘অনেক’-এর আপত্তির কারণে অনুষ্ঠানটি স্থগিত করেন। আপত্তিটি ছিল—আয়োজকদের একজন ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ এবং এর মাধ্যমে ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগকে’ পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হচ্ছে। পরে পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় অনুষ্ঠানটি সরিয়ে নিলে সেখানেও রাষ্ট্রীয় পুলিশের ‘অনুমতি নেই’ অজুহাতে বাধা আসে।
রনবীকে মঞ্চে বাধা: এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে চারুকলা অনুষদেরই অগ্রজ শিক্ষক ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুন নবীকে (রনবী) মঞ্চে উঠতে ‘কিছু লোক’-এর আপত্তির মুখে আয়োজকরা বাধা দেন।
রবীন্দ্র স্মরণ ও লালন উৎসব বাতিল: গত মাসে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে স্রোত আবৃত্তি সংসদের ‘রবীন্দ্র স্মরণ দ্রোহে, জাগরণে রবীন্দ্রনাথ’ অনুষ্ঠানটি ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক মৈত্রী’ ব্যানারে জড়ো হওয়া ‘একদল ব্যক্তি’র আপত্তিতে বাতিল হয়। এছাড়া হেফাজতে ইসলামের আপত্তিতে টাঙ্গাইলের মধুপুরে লালন স্মরণোৎসব বন্ধ হয় এবং নারায়ণগঞ্জে ‘তৌহিদী জনতা’র হুমকির কারণে ‘মহতি সাধুসঙ্গ ও লালন মেলা’ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
অন্যান্য উৎসব বন্ধ: গত ফেব্রুয়ারিতে নাট্য উৎসব, বাংলা বর্ষবরণ আয়োজন (ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, বগুড়ায়) এবং শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মাদারীপুরের কালকিনির কুন্ডুবাড়ির মেলাও ‘স্থানীয় জনগণ ও আলেম সমাজের’ আপত্তিতে বন্ধ হয়েছে।
লালবাগ কেল্লার ঘটনা: গত ৮ অক্টোবর সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে ‘উত্তেজিত জনতা’ ‘নাচ-গান’ হবে এই খবর পেয়ে আপত্তি জানালে পরে সরকারি মধ্যস্থতায় তা ‘ভুল-বোঝাবুঝি’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।
আপত্তিবাদীদের পরিচয় ও সরকারের নীরবতা
লেখক মনে করেন, এই আপত্তিবাদীরা পরিচিত, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক পরিচয় সুকৌশলে আড়াল করে রাখা হচ্ছে। তারা একেক সময় একেক পরিচয়ে হাজির হচ্ছে:
আগে ছিল: ‘তৌহিদী জনতা’, ‘প্রেশার গ্রুপ’, ‘জনরোষ’।
বর্তমানে হচ্ছে: ‘উত্তেজিত জনতা’, ‘একদল ব্যক্তি’, ‘কিছু লোক’ এবং ‘অনেকে’।
জোবাইদা নাসরীনের মতে, এসব বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো বক্তব্য নেই—এই নির্বাক অবস্থাই সরকারকে একটি বিশেষ রাজনীতির অংশভাগী করে তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও উপসংহার
রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ: লেখক জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বা অরাজনৈতিক বিষয় নয়; বরং ভীষণভাবে রাজনৈতিক এবং অপরিকল্পিতও নয়। বন্ধ হয়ে যাওয়া অনুষ্ঠানগুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার সংঘাত, যা তৈরি করছে ‘আপত্তির কারখানা’।
জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা: তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যে জুলাই অভ্যুত্থান এই ধরনের বাধার রাজনীতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য হয়েছিল, এখন কেন ইনিয়ে-বিনিয়ে সেই বাধার পক্ষেই কথা বলতে হচ্ছে? এই নীরবতা ও ‘ইনানো-বিনানো’ই ‘আপত্তি’র কারখানাটি মজবুত করছে।
সরকারের ভূমিকা: লেখক মনে করেন, যদিও অন্তর্বর্তী সরকার কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, তবুও এটি একটি রাজনৈতিক সরকার। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেও এটি জনগণের সবার নয়, বরং কতিপয় আপত্তিবাদীর সরকারে পরিণত হয়েছে। সরকার কোন বিষয়ে কথা বলবে এবং কোন বিষয়ে নীরব থাকবে—এই অবস্থান দিয়েই তার ‘আদর্শিক’ অবস্থান স্পষ্ট হচ্ছে এবং তাদের প্রশ্রয়েই ‘আপত্তি’ নামক ভয়ঙ্কর দানবের ‘কারখানা’ বাড়ছে।
জোবাইদা নাসরীন, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
রিপোর্টারের নাম 

























