ঢাকা ০৯:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি: ভারসাম্য না কি কৌশলগত দেউলিয়াত্ব?

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ এবং এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে বর্তমানে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির বিমান হামলা এবং পরবর্তী ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ যে বিবৃতি দিয়েছে, তা বিশ্লেষকদের মতে যথেষ্ট ‘পরিমিত’ কিন্তু ‘কাঠামোগত দুর্বলতায়’ জর্জরিত। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নূরুজ্জামান তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, বাংলাদেশ উপাসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানালেও ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অতি-সতর্ক অবস্থানকে অনেকেই ‘পররাষ্ট্রনীতির দেউলিয়াত্ব’ হিসেবে অভিহিত করছেন। বাংলাদেশ একদিকে জ্বালানি সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে কোনো বড় শক্তিকে অসন্তুষ্ট না করার যে ‘নির্ভরশীলতার নীতি’ গ্রহণ করেছে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

ভৌগোলিকভাবে ইরান অনেক দূরে হলেও বাংলাদেশের জন্য এই যুদ্ধের প্রভাব তাৎক্ষণিক ও ভয়াবহ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হওয়ায় এই অঞ্চলে অস্থিরতা মানেই বাংলাদেশে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই যুদ্ধ বাংলাদেশের ওপর ‘ভূমিকম্পের মতো’ আঘাত হানতে পারে, যার ফলে রপ্তানি আয় হ্রাস, রেমিট্যান্স প্রবাহে বিঘ্ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে তীব্র চাপ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে—জ্বালানি আমদানি, পশ্চিমা রপ্তানি বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী আয়। এই ত্রিমুখী নির্ভরশীলতার কারণেই বাংলাদেশ কোনো পক্ষকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করার সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু এই ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ অনেক সময় নীতিনিষ্ঠ অবস্থানের চেয়ে সুযোগসন্ধানী হিসেবে প্রতীয়মান হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট রাষ্ট্র হিসেবে সতর্কতা প্রয়োজন হলেও তা যেন নিষ্ক্রিয়তায় রূপ না নেয়। নিরপেক্ষতা মানে শুধু পক্ষ না নেওয়া নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন ও নীতির ভিত্তিতে ধারাবাহিক অবস্থান বজায় রাখা। বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বড় ভূমিকা রাখলেও বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতিতে তার প্রতিফলন এখনো ক্ষীণ। এই যুদ্ধ থেকে বাংলাদেশের বড় শিক্ষা হলো—জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং একটি সুসংহত ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলা। অন্যথায়, প্রতিটি বৈশ্বিক ধাক্কায় বাংলাদেশকে একইভাবে অগোছালো ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়তে হবে। বর্তমানের এই সংকট কি বাংলাদেশের পরিবর্তনের সূচনা করবে, নাকি এটি আরেকটি হারানো সুযোগ হয়ে থাকবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

খুলনায় ঘরে ঢুকে একই পরিবারের তিনজনকে কুপিয়ে জখম, আটক ১

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি: ভারসাম্য না কি কৌশলগত দেউলিয়াত্ব?

আপডেট সময় : ০৭:২৩:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ এবং এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে বর্তমানে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির বিমান হামলা এবং পরবর্তী ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ যে বিবৃতি দিয়েছে, তা বিশ্লেষকদের মতে যথেষ্ট ‘পরিমিত’ কিন্তু ‘কাঠামোগত দুর্বলতায়’ জর্জরিত। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নূরুজ্জামান তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, বাংলাদেশ উপাসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানালেও ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অতি-সতর্ক অবস্থানকে অনেকেই ‘পররাষ্ট্রনীতির দেউলিয়াত্ব’ হিসেবে অভিহিত করছেন। বাংলাদেশ একদিকে জ্বালানি সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে কোনো বড় শক্তিকে অসন্তুষ্ট না করার যে ‘নির্ভরশীলতার নীতি’ গ্রহণ করেছে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

ভৌগোলিকভাবে ইরান অনেক দূরে হলেও বাংলাদেশের জন্য এই যুদ্ধের প্রভাব তাৎক্ষণিক ও ভয়াবহ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হওয়ায় এই অঞ্চলে অস্থিরতা মানেই বাংলাদেশে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই যুদ্ধ বাংলাদেশের ওপর ‘ভূমিকম্পের মতো’ আঘাত হানতে পারে, যার ফলে রপ্তানি আয় হ্রাস, রেমিট্যান্স প্রবাহে বিঘ্ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে তীব্র চাপ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে—জ্বালানি আমদানি, পশ্চিমা রপ্তানি বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী আয়। এই ত্রিমুখী নির্ভরশীলতার কারণেই বাংলাদেশ কোনো পক্ষকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করার সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু এই ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ অনেক সময় নীতিনিষ্ঠ অবস্থানের চেয়ে সুযোগসন্ধানী হিসেবে প্রতীয়মান হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট রাষ্ট্র হিসেবে সতর্কতা প্রয়োজন হলেও তা যেন নিষ্ক্রিয়তায় রূপ না নেয়। নিরপেক্ষতা মানে শুধু পক্ষ না নেওয়া নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন ও নীতির ভিত্তিতে ধারাবাহিক অবস্থান বজায় রাখা। বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বড় ভূমিকা রাখলেও বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতিতে তার প্রতিফলন এখনো ক্ষীণ। এই যুদ্ধ থেকে বাংলাদেশের বড় শিক্ষা হলো—জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং একটি সুসংহত ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলা। অন্যথায়, প্রতিটি বৈশ্বিক ধাক্কায় বাংলাদেশকে একইভাবে অগোছালো ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়তে হবে। বর্তমানের এই সংকট কি বাংলাদেশের পরিবর্তনের সূচনা করবে, নাকি এটি আরেকটি হারানো সুযোগ হয়ে থাকবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।