জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশের সময় মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, বৈষম্যহীন সমাজ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, গত দেড় বছরে দলটি নিয়মিত নেতিবাচক শিরোনাম হচ্ছে।
এনসিপিকে ঘিরে বিতর্ক ও সমালোচনার মূল কারণসমূহ
দলটির রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মকাণ্ড নিয়ে যে প্রধান প্রশ্নগুলো উঠছে, তা বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি স্পষ্ট দিক বেরিয়ে আসে:
- চাঁদাবাজি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড: এনসিপির বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দলের পক্ষ থেকে বহিষ্কার বা শোকজের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, বারবার এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি হওয়া কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ ও দায়বদ্ধতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
- আদর্শিক অবস্থান ও ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়া: শুরু থেকেই দলটিকে ‘মধ্যপন্থি’ হিসেবে দাবি করা হলেও, তাদের কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যের ঝোঁক স্পষ্টভাবে ডানপন্থার দিকে। অনেকের মতে, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা দলটির মধ্যে প্রবল।
- মুক্তিযুদ্ধ ও জামায়াত প্রসঙ্গ: এনসিপির শীর্ষ নেতাদের রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড এবং জামায়াত-ই-ইসলামী বা অন্যান্য উগ্রবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে তাদের কর্মকাণ্ডের মিল জনমনে গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের অনেকে দলটিকে ‘জামায়াতের বি-টিম’ হিসেবেও অভিহিত করার চেষ্টা করছেন।
- বিতর্কিত স্লোগান ও আচরণ: দলটির কর্মসূচিতে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-এর মতো স্লোগান এবং জাতীয় সংগীতের অবমাননা বা ‘গোলাম আযমের বাংলায়, আওয়ামী লীগের ঠাঁই নাই’-এর মতো বক্তব্য তাদের গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির প্রতিশ্রুতির সাথে সাংঘর্ষিক মনে হয়েছে।
এনসিপির সামনে চ্যালেঞ্জ
এনসিপি তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যে ইমেজ সংকটে পড়েছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য দলটিকে কিছু জরুরি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে:
১. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: দলের নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি ও অপরাধের অভিযোগগুলোর স্থায়ী সুরাহা করা এবং পরিচ্ছন্ন রাজনীতি নিশ্চিত করা। ২. আদর্শিক স্বচ্ছতা: তারা কি সত্যিই মধ্যপন্থি, নাকি ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করা একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম—তা পরিষ্কার করা। ৩. মুক্তিযুদ্ধের বয়ান: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের মীমাংসিত বিষয়গুলোকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের ‘বাংলাদেশপন্থি’ হিসেবে প্রমাণ করা। ৪. জোটগত রাজনীতি: জামায়াতের সাথে নির্বাচনী কৌশল বা আদর্শিক মিল—কোনটি তাদের সম্পর্ককে পরিচালিত করছে, তা জনসমক্ষে স্পষ্ট করা।
রাজনীতিতে মধ্যপন্থি হওয়া জরুরি কি না, তা বিতর্কের বিষয় হতে পারে। কিন্তু এনসিপি যদি সত্যিকার অর্থেই জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে নতুন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির ধারক হতে চায়, তবে তাদের চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও উগ্রবাদের সাথে কোনো আপস না করে এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। অন্যথায়, ‘জামায়াতের বি-টিম’ বা কট্টর ডানপন্থার এজেন্ডা বাস্তবায়নের বাহন হিসেবে তাদের যে সমালোচনা রয়েছে, তা দূর করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
রিপোর্টারের নাম 
























