ঢাকা ০২:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

অভিভাবকহীন দুদক: থমকে আছে ১১ হাজার কোটির দুর্নীতি মামলা

দেশের দুর্নীতিবিরোধী সর্বোচ্চ সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এখন কার্যত অভিভাবকহীন। গত ৩ মার্চ ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে সংস্থাটিতে কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিশন নেই। এই দীর্ঘ চার মাসের শূন্যতায় মামলার অনুসন্ধান শুরু, চার্জশিট অনুমোদন, সম্পদ জব্দ এবং বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো আইনি প্রক্রিয়াগুলো থমকে দাঁড়িয়েছে।

দুদকের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির প্রশাসনিক রুটিন কাজ চললেও, কমিশনের অনুমোদন ছাড়া আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নেই। এর ফলে দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে এক বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

আলোচিত মামলার ফাইলবন্দি অবস্থা

দুদকের তথ্যমতে, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দায়ের করা ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি দুর্নীতির মামলার ফাইলগুলো অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বর্তমান অবস্থা নিচে তুলে ধরা হলো:

ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানমামলার বর্তমান অবস্থা
পি কে হালদার১৩টি মামলা প্রক্রিয়াধীন, ৫-৬টি চার্জশিট অনুমোদনের অপেক্ষায়
সালমান এফ রহমান১১টি মামলা বিদ্যমান, ১৬টি নতুন মামলার প্রস্তুতি সম্পন্ন
শেখ হাসিনা২১টি মামলা, ৭টির চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে
সাইফুজ্জামান জাবেদ৩০টি মামলা, ২টির চার্জশিট প্রস্তুত, বিদেশ থেকে নথি প্রাপ্তির অপেক্ষা
জাহিদ মালেক (সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী)৬টি মামলা দায়েরের সুপারিশ অনুমোদনের অপেক্ষায়

(তথ্যসূত্র: দুদকের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা অনুযায়ী)

আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক স্থবিরতা

দুদক আইন অনুযায়ী, যেকোনো মামলা দায়ের, চার্জশিট দাখিল বা সম্পদ জব্দ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বডির অনুমোদন বাধ্যতামূলক। যেহেতু গত চার মাস ধরে চেয়ারম্যান এবং কমিশনারের পদগুলো ফাঁকা, তাই তদন্তকারীরা চাইলেও আইনি প্রক্রিয়ায় এগোতে পারছেন না।

দুদকের মুখপাত্র ও উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, “আইন ও বিধি অনুযায়ী কমিশনের রুটিন কার্যক্রম চলছে। তবে যেসব বিষয়ে কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।”

নতুন কমিশন গঠনের সম্ভাবনা

দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটানোর লক্ষ্যে সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গত ২২ জুন হাইকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বে একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। বর্তমান গুঞ্জনে রয়েছে, নতুন কমিশনার হিসেবে সাবেক আমলা, সেনা কর্মকর্তা ও বিচার বিভাগের পরিচিত কিছু মুখ দায়িত্ব পেতে পারেন। তবে কবে নাগাদ নতুন কমিশন দায়িত্ব নেবে, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি।

কী হবে পরবর্তী পদক্ষেপ?

আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দিচ্ছে। এছাড়া বিদেশ থেকে সংগৃহীত ফরেনসিক প্রমাণের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিতে পারে যদি মামলাগুলো যথাসময়ে আদালতে উপস্থাপন করা না হয়। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ব্যাকলগ বা জমে থাকা অভিযোগের পাহাড় সামলানোই হবে তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

গাজা যুদ্ধের প্রভাবে ইসরায়েলে মাদকাসক্তি উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি

অভিভাবকহীন দুদক: থমকে আছে ১১ হাজার কোটির দুর্নীতি মামলা

আপডেট সময় : ০১:০২:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

দেশের দুর্নীতিবিরোধী সর্বোচ্চ সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এখন কার্যত অভিভাবকহীন। গত ৩ মার্চ ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে সংস্থাটিতে কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিশন নেই। এই দীর্ঘ চার মাসের শূন্যতায় মামলার অনুসন্ধান শুরু, চার্জশিট অনুমোদন, সম্পদ জব্দ এবং বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো আইনি প্রক্রিয়াগুলো থমকে দাঁড়িয়েছে।

দুদকের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির প্রশাসনিক রুটিন কাজ চললেও, কমিশনের অনুমোদন ছাড়া আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নেই। এর ফলে দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে এক বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

আলোচিত মামলার ফাইলবন্দি অবস্থা

দুদকের তথ্যমতে, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দায়ের করা ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি দুর্নীতির মামলার ফাইলগুলো অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বর্তমান অবস্থা নিচে তুলে ধরা হলো:

ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানমামলার বর্তমান অবস্থা
পি কে হালদার১৩টি মামলা প্রক্রিয়াধীন, ৫-৬টি চার্জশিট অনুমোদনের অপেক্ষায়
সালমান এফ রহমান১১টি মামলা বিদ্যমান, ১৬টি নতুন মামলার প্রস্তুতি সম্পন্ন
শেখ হাসিনা২১টি মামলা, ৭টির চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে
সাইফুজ্জামান জাবেদ৩০টি মামলা, ২টির চার্জশিট প্রস্তুত, বিদেশ থেকে নথি প্রাপ্তির অপেক্ষা
জাহিদ মালেক (সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী)৬টি মামলা দায়েরের সুপারিশ অনুমোদনের অপেক্ষায়

(তথ্যসূত্র: দুদকের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা অনুযায়ী)

আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক স্থবিরতা

দুদক আইন অনুযায়ী, যেকোনো মামলা দায়ের, চার্জশিট দাখিল বা সম্পদ জব্দ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বডির অনুমোদন বাধ্যতামূলক। যেহেতু গত চার মাস ধরে চেয়ারম্যান এবং কমিশনারের পদগুলো ফাঁকা, তাই তদন্তকারীরা চাইলেও আইনি প্রক্রিয়ায় এগোতে পারছেন না।

দুদকের মুখপাত্র ও উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, “আইন ও বিধি অনুযায়ী কমিশনের রুটিন কার্যক্রম চলছে। তবে যেসব বিষয়ে কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।”

নতুন কমিশন গঠনের সম্ভাবনা

দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটানোর লক্ষ্যে সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গত ২২ জুন হাইকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বে একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। বর্তমান গুঞ্জনে রয়েছে, নতুন কমিশনার হিসেবে সাবেক আমলা, সেনা কর্মকর্তা ও বিচার বিভাগের পরিচিত কিছু মুখ দায়িত্ব পেতে পারেন। তবে কবে নাগাদ নতুন কমিশন দায়িত্ব নেবে, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি।

কী হবে পরবর্তী পদক্ষেপ?

আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দিচ্ছে। এছাড়া বিদেশ থেকে সংগৃহীত ফরেনসিক প্রমাণের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিতে পারে যদি মামলাগুলো যথাসময়ে আদালতে উপস্থাপন করা না হয়। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ব্যাকলগ বা জমে থাকা অভিযোগের পাহাড় সামলানোই হবে তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।