ঢাকা ০৪:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

অশ্লীলতার মহামারী: আমাদের ভাষা কি হারিয়ে যাচ্ছে?

বাংলা ভাষা আমাদের গর্ব, আমাদের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে ডিজিটাল মাধ্যমের প্রসারের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্দোলনের রাজনৈতিক স্লোগান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাষার যে কদর্য রূপ আমরা দেখছি, তা এক গভীর সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়। আন্দোলনের নামে বা ভিন্নমতের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে গিয়ে যে ধরনের অশ্লীল, নারীদেহকেন্দ্রিক ও বিকৃত ভাষার ব্যবহার করা হচ্ছে, তা কেবল অশালীনই নয়, বরং এটি আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিপন্থী।

লেখক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ যথার্থই চিহ্নিত করেছেন যে, ভাষা কেবল কথা বলার মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মা। রোমান সভ্যতার পতনের ইতিহাসে নৈতিক অবক্ষয় ও ভাষার বিকৃতি যেমন ভূমিকা রেখেছিল, আজকের বাংলাদেশেও আমরা সেই অশনি সংকেত দেখতে পাচ্ছি। ফেইসবুক, টিকটক ও রিলসের মতো মাধ্যমগুলো সংক্ষেপণের নামে বাংলাকে যে বিকৃত করছে, তা কেবল বানান বা ব্যাকরণগত ভুল নয়, বরং এটি আমাদের রুচি ও বোধকে ক্রমাগত নিচে নামিয়ে আনছে। বিশেষ করে, নারীদের লক্ষ্য করে বা নারীদেহকে কেন্দ্র করে যে গালিগালাজ বা অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা নারীর প্রতি কাঠামোগত সহিংসতারই একটি ভাষাগত বহিঃপ্রকাশ।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সমাজের একটি সচেতন অংশ, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষাবিদ বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরাও একে ‘যুগের হাওয়া’ বা ‘তরুণ প্রজন্মের অভিব্যক্তি’ বলে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। এই নীরবতা বা সমর্থন পরোক্ষভাবে অশ্লীলতাকে বৈধতা দিচ্ছে। ভাষা যখন তার শালীনতা হারায়, তখন সমাজ থেকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও যুক্তিনির্ভর আলোচনার পরিসরটিও সংকুচিত হয়ে আসে। এটি আমাদের পরিবারের শিক্ষা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং নারী-পুরুষের সামাজিক মিথস্ক্রিয়াকে বিষিয়ে তুলছে।

সাংস্কৃতিক আত্মহত্যা রুখতে হলে আমাদের এখনই এই কর্দমাক্ত স্রোতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। অশ্লীলতাকে যারা ‘প্রতিবাদের সাহস’ বলে ভুল করছেন, তাদের বুঝতে হবে যে অন্ধকার কখনো অন্ধকার দিয়ে দূর করা যায় না। ভাষার শ্লীলতাহানি রোধ করা কেবল একটি সামাজিক আন্দোলন নয়, এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ভাষার প্রতি এই অবমাননা থামানোর দায়িত্ব এখন সকল নাগরিকের। আসুন, নিরপেক্ষতার ভণ্ডামিকে প্রশ্রয় না দিয়ে আমরা সম্মিলিতভাবে বাংলা ভাষাকে তার হারানো মার্জিত, সভ্য ও স্নিগ্ধ রূপে ফিরিয়ে আনি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

কওমি মাদরাসা ও হাফেজিয়া বোর্ড নিয়ে সরকারি উদ্যোগের প্রতিবাদে শিক্ষক পরিষদ

অশ্লীলতার মহামারী: আমাদের ভাষা কি হারিয়ে যাচ্ছে?

আপডেট সময় : ১২:০৬:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

বাংলা ভাষা আমাদের গর্ব, আমাদের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে ডিজিটাল মাধ্যমের প্রসারের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্দোলনের রাজনৈতিক স্লোগান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাষার যে কদর্য রূপ আমরা দেখছি, তা এক গভীর সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়। আন্দোলনের নামে বা ভিন্নমতের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে গিয়ে যে ধরনের অশ্লীল, নারীদেহকেন্দ্রিক ও বিকৃত ভাষার ব্যবহার করা হচ্ছে, তা কেবল অশালীনই নয়, বরং এটি আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিপন্থী।

লেখক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ যথার্থই চিহ্নিত করেছেন যে, ভাষা কেবল কথা বলার মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মা। রোমান সভ্যতার পতনের ইতিহাসে নৈতিক অবক্ষয় ও ভাষার বিকৃতি যেমন ভূমিকা রেখেছিল, আজকের বাংলাদেশেও আমরা সেই অশনি সংকেত দেখতে পাচ্ছি। ফেইসবুক, টিকটক ও রিলসের মতো মাধ্যমগুলো সংক্ষেপণের নামে বাংলাকে যে বিকৃত করছে, তা কেবল বানান বা ব্যাকরণগত ভুল নয়, বরং এটি আমাদের রুচি ও বোধকে ক্রমাগত নিচে নামিয়ে আনছে। বিশেষ করে, নারীদের লক্ষ্য করে বা নারীদেহকে কেন্দ্র করে যে গালিগালাজ বা অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা নারীর প্রতি কাঠামোগত সহিংসতারই একটি ভাষাগত বহিঃপ্রকাশ।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সমাজের একটি সচেতন অংশ, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষাবিদ বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরাও একে ‘যুগের হাওয়া’ বা ‘তরুণ প্রজন্মের অভিব্যক্তি’ বলে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। এই নীরবতা বা সমর্থন পরোক্ষভাবে অশ্লীলতাকে বৈধতা দিচ্ছে। ভাষা যখন তার শালীনতা হারায়, তখন সমাজ থেকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও যুক্তিনির্ভর আলোচনার পরিসরটিও সংকুচিত হয়ে আসে। এটি আমাদের পরিবারের শিক্ষা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং নারী-পুরুষের সামাজিক মিথস্ক্রিয়াকে বিষিয়ে তুলছে।

সাংস্কৃতিক আত্মহত্যা রুখতে হলে আমাদের এখনই এই কর্দমাক্ত স্রোতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। অশ্লীলতাকে যারা ‘প্রতিবাদের সাহস’ বলে ভুল করছেন, তাদের বুঝতে হবে যে অন্ধকার কখনো অন্ধকার দিয়ে দূর করা যায় না। ভাষার শ্লীলতাহানি রোধ করা কেবল একটি সামাজিক আন্দোলন নয়, এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ভাষার প্রতি এই অবমাননা থামানোর দায়িত্ব এখন সকল নাগরিকের। আসুন, নিরপেক্ষতার ভণ্ডামিকে প্রশ্রয় না দিয়ে আমরা সম্মিলিতভাবে বাংলা ভাষাকে তার হারানো মার্জিত, সভ্য ও স্নিগ্ধ রূপে ফিরিয়ে আনি।