ঢাকা ০১:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধে পেশাদার সৈনিকদের অকথিত বীরত্ব: কেন ফিল্ড মার্শাল পদবীর যোগ্য ছিলেন ওসমানী?

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতির বিজয় অর্জনের পেছনে রয়েছে এক সুদীর্ঘ সামরিক প্রস্তুতির ইতিহাস। কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছাই নয়, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের পাশাপাশি পেশাদার সৈনিকদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকাও ছিল অপরিহার্য। ২৫ মার্চের কালরাত্রির পর কালুরঘাট থেকে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহ ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপনকারী পেশাদার সৈনিকদের অবদান প্রায়শই ইতিহাসের মূলধারায় উপেক্ষিত থেকে যায়।

বাঙালির সামরিক সক্ষমতার ভিত্তি স্থাপন হয়েছিল ‘অ-যোদ্ধা জাতি’ তকমা মোচনের এক দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অন্যতম রূপকার মেজর আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী দিল্লিতে ব্রিটিশ ফিল্ড মার্শাল ক্লদ অকিনলেকের কাছে বাঙালিদের জন্য একটি পৃথক রেজিমেন্ট গঠনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তার এই দূরদর্শী উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কুর্মিটোলায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এই উদ্যোগে তার সহযোদ্ধা ছিলেন মেজর আবদুল গনি, যিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ঘুরে বাঙালি যুবকদের সেনাবাহিনীতে যোগদানে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। অথচ এই দুই অগ্রদূতের অবদান আজও প্রাপ্য সম্মান পায়নি।

১৯৪৯ সালে বক্সিং রিংয়ে পাঞ্জাব রেজিমেন্টকে পরাজিত করে বাঙালি সৈনিকরা তাদের সামরিক আত্মবিশ্বাস প্রমাণ করে। পরবর্তীতে তাদের সক্ষমতা প্রমাণের জন্য পঞ্চাশের দশকে ঝিলামের হিমশীতল পাহাড় ও মরুভূমিতে কঠোর ‘উইন্টার অ্যান্ড ডেজার্ট ট্রায়ালস’ চাপিয়ে দেওয়া হয়। তখন কোয়ার্টার মাস্টার মেজর আবদুল গনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাদের হাড় ভেঙে দিতে পার, কিন্তু আমাদের সংকল্প ভাঙতে পারবে না।’ শতভাগ সফলতায় সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বাঙালি সৈনিকেরা ‘সিনিয়র্স টাইগার্স’ উপাধি অর্জন করেন। এই দক্ষতার চূড়ান্ত স্বীকৃতি আসে ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে। এই সকল বীরত্বপূর্ণ অধ্যায় প্রমাণ করে যে, জেনারেল এম এ জি ওসমানীর মতো সামরিক নেতাদের কেবল যুদ্ধকালীন নেতৃত্বই নয়, বরং এই দীর্ঘ ও গৌরবময় সামরিক প্রস্তুতির ইতিহাসকেও বিবেচনায় নিয়ে তাঁর প্রাপ্য সম্মান নির্ধারণ করা উচিত।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জাতীয় প্রেসক্লাব সম্পাদক: সাংবাদিকতাকে দলীয়করণ নয়, সমাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরুন

মুক্তিযুদ্ধে পেশাদার সৈনিকদের অকথিত বীরত্ব: কেন ফিল্ড মার্শাল পদবীর যোগ্য ছিলেন ওসমানী?

আপডেট সময় : ১২:১৪:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতির বিজয় অর্জনের পেছনে রয়েছে এক সুদীর্ঘ সামরিক প্রস্তুতির ইতিহাস। কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছাই নয়, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের পাশাপাশি পেশাদার সৈনিকদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকাও ছিল অপরিহার্য। ২৫ মার্চের কালরাত্রির পর কালুরঘাট থেকে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহ ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপনকারী পেশাদার সৈনিকদের অবদান প্রায়শই ইতিহাসের মূলধারায় উপেক্ষিত থেকে যায়।

বাঙালির সামরিক সক্ষমতার ভিত্তি স্থাপন হয়েছিল ‘অ-যোদ্ধা জাতি’ তকমা মোচনের এক দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অন্যতম রূপকার মেজর আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী দিল্লিতে ব্রিটিশ ফিল্ড মার্শাল ক্লদ অকিনলেকের কাছে বাঙালিদের জন্য একটি পৃথক রেজিমেন্ট গঠনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তার এই দূরদর্শী উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কুর্মিটোলায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এই উদ্যোগে তার সহযোদ্ধা ছিলেন মেজর আবদুল গনি, যিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ঘুরে বাঙালি যুবকদের সেনাবাহিনীতে যোগদানে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। অথচ এই দুই অগ্রদূতের অবদান আজও প্রাপ্য সম্মান পায়নি।

১৯৪৯ সালে বক্সিং রিংয়ে পাঞ্জাব রেজিমেন্টকে পরাজিত করে বাঙালি সৈনিকরা তাদের সামরিক আত্মবিশ্বাস প্রমাণ করে। পরবর্তীতে তাদের সক্ষমতা প্রমাণের জন্য পঞ্চাশের দশকে ঝিলামের হিমশীতল পাহাড় ও মরুভূমিতে কঠোর ‘উইন্টার অ্যান্ড ডেজার্ট ট্রায়ালস’ চাপিয়ে দেওয়া হয়। তখন কোয়ার্টার মাস্টার মেজর আবদুল গনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাদের হাড় ভেঙে দিতে পার, কিন্তু আমাদের সংকল্প ভাঙতে পারবে না।’ শতভাগ সফলতায় সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বাঙালি সৈনিকেরা ‘সিনিয়র্স টাইগার্স’ উপাধি অর্জন করেন। এই দক্ষতার চূড়ান্ত স্বীকৃতি আসে ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে। এই সকল বীরত্বপূর্ণ অধ্যায় প্রমাণ করে যে, জেনারেল এম এ জি ওসমানীর মতো সামরিক নেতাদের কেবল যুদ্ধকালীন নেতৃত্বই নয়, বরং এই দীর্ঘ ও গৌরবময় সামরিক প্রস্তুতির ইতিহাসকেও বিবেচনায় নিয়ে তাঁর প্রাপ্য সম্মান নির্ধারণ করা উচিত।