ঢাকা ০৯:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:০৯:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫
  • ২৯ বার পড়া হয়েছে

আফগান তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি বর্তমানে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আট দিনের সফরে আছেন। দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে এই সফরকে একটি ‘অবিশ্বাস্য ঘটনা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চার বছর আগেও যা ছিল অকল্পনীয়, আজ এটি এই অঞ্চলের নতুন বাস্তবতা। ২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর ভারতে এটিই তাদের প্রথম উচ্চপর্যায়ের সফর। দিল্লি ও কাবুল উভয় পক্ষই নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে দীর্ঘদিনের পুরোনো শত্রুতা ভুলে এখন সহযোগিতার পথে হাঁটছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

মুত্তাকি শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকের পরই নয়াদিল্লি ঘোষণা দেয় যে, তারা চার বছর পর পুনরায় কাবুলে পূর্ণাঙ্গ ভারতীয় দূতাবাস খুলছে। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগে ভারত তাদের দূতাবাস বন্ধ করে দিয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে ভারত তার আফগান নীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, এই আলোচনা বাণিজ্য, কূটনীতি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা—তিন ক্ষেত্রেই নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

মুত্তাকির এই ভারত সফরকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে পাকিস্তান। ঐতিহাসিকভাবে তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা ক্রমশ খারাপের দিকে গেছে। এই পরিস্থিতিতে তালেবান এখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘স্বাধীন ও বহুমাত্রিক’ করতে চাইছে।

জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে প্রত্যাহারের পর মুত্তাকি দিল্লি পৌঁছান। উল্লেখ্য, রাশিয়া এখন পর্যন্ত একমাত্র দেশ, যারা আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

বৈঠক শেষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর মন্তব্য করেন, ‘আমাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা আফগানিস্তানের জাতীয় উন্নয়ন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভারত আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ।’
অন্যদিকে মুত্তাকি বলেন, ‘ভারত আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এই সফরের মাধ্যমে আমরা নতুন যুগের সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করতে চাই।’ তিনি জানান, তাঁর সফরের অংশ হিসেবে তিনি ভারতীয় ব্যবসায়ী সমাজের সঙ্গেও বৈঠক করবেন।

২০২১ সালে তালেবান কাবুল দখল করার পর ভারত আতঙ্কে নিজেদের দূতাবাস ও চারটি কনস্যুলেট বন্ধ করে দেয় এবং আফগানদের জন্য সব ভিসা বাতিল করে দেয়। তবে এক বছরের মধ্যেই নয়াদিল্লি একটি ‘টেকনিক্যাল টিম’ পাঠিয়ে মানবিক সহায়তা তদারকির কাজ শুরু করে। ধীরে ধীরে ভারত তালেবান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে থাকে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিদেশে কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। গত বছর তালেবানকে দিল্লিতে নিজস্ব প্রতিনিধি নিয়োগের সুযোগ দেয় ভারত। এমনকি মুম্বাই ও হায়দরাবাদে তাদের কনস্যুলেট খোলার অনুমতিও দেওয়া হয়।

দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তান ছিল ভারত-পাকিস্তানের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, যেখানে পাকিস্তানপন্থি তালেবানকে ভারত সবসময় সন্দেহের চোখে দেখেছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। পাকিস্তান তালেবান সরকারকে ‘শত্রু রাষ্ট্র’ পর্যন্ত ঘোষণা দিয়েছে। ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানি তালেবান (টিটিপি) হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে তালেবান বলছে, পাকিস্তানের কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী আফগানিস্তানকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে। এই সুযোগে নয়াদিল্লি তালেবান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে আঞ্চলিক ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে চাইছে।

ভারতের কাছে আফগানিস্তান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামিক স্টেট (আইএস), আল-কায়েদা বা ভারতকেন্দ্রিক জঙ্গিগোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ে নয়াদিল্লি বরাবরই উদ্বিগ্ন। তালেবান ভারতকে আশ্বস্ত করেছে যে, আফগান মাটি ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হবে না। একই সঙ্গে ভারত মধ্য এশিয়া ও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে আফগানিস্তানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর হিসেবে দেখছে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান ও চীনের প্রভাবের পাল্টা ভারসাম্য তৈরি করতে পারে দিল্লি।

ভারতের পর্যবেক্ষণমূলক সংস্থা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন-এর দুই গবেষক হর্ষ ভি পন্ত ও শিবম শেখাওয়াত মনে করেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তালেবান এখন নিজের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পরিচয় দিতে চাইছে এবং ভারত সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। কৌশল বিশ্লেষক ব্রহ্ম চেলানেই বলেন, মুত্তাকির সফর পাকিস্তানের জন্য একটি ধাক্কা। তবে এটি দক্ষিণ এশিয়ায় বাস্তববাদী কূটনীতির এক নতুন অধ্যায় সূচিত করছে এবং ভারত-তালেবান সম্পর্কের কৌশলগত পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আরাকান আর্মির প্রধানের অভিনন্দন, নতুন বন্ধুত্বের বার্তা

তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর

আপডেট সময় : ০৮:০৯:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫

আফগান তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি বর্তমানে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আট দিনের সফরে আছেন। দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে এই সফরকে একটি ‘অবিশ্বাস্য ঘটনা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চার বছর আগেও যা ছিল অকল্পনীয়, আজ এটি এই অঞ্চলের নতুন বাস্তবতা। ২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর ভারতে এটিই তাদের প্রথম উচ্চপর্যায়ের সফর। দিল্লি ও কাবুল উভয় পক্ষই নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে দীর্ঘদিনের পুরোনো শত্রুতা ভুলে এখন সহযোগিতার পথে হাঁটছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

মুত্তাকি শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকের পরই নয়াদিল্লি ঘোষণা দেয় যে, তারা চার বছর পর পুনরায় কাবুলে পূর্ণাঙ্গ ভারতীয় দূতাবাস খুলছে। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগে ভারত তাদের দূতাবাস বন্ধ করে দিয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে ভারত তার আফগান নীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, এই আলোচনা বাণিজ্য, কূটনীতি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা—তিন ক্ষেত্রেই নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

মুত্তাকির এই ভারত সফরকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে পাকিস্তান। ঐতিহাসিকভাবে তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা ক্রমশ খারাপের দিকে গেছে। এই পরিস্থিতিতে তালেবান এখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘স্বাধীন ও বহুমাত্রিক’ করতে চাইছে।

জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে প্রত্যাহারের পর মুত্তাকি দিল্লি পৌঁছান। উল্লেখ্য, রাশিয়া এখন পর্যন্ত একমাত্র দেশ, যারা আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

বৈঠক শেষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর মন্তব্য করেন, ‘আমাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা আফগানিস্তানের জাতীয় উন্নয়ন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভারত আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ।’
অন্যদিকে মুত্তাকি বলেন, ‘ভারত আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এই সফরের মাধ্যমে আমরা নতুন যুগের সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করতে চাই।’ তিনি জানান, তাঁর সফরের অংশ হিসেবে তিনি ভারতীয় ব্যবসায়ী সমাজের সঙ্গেও বৈঠক করবেন।

২০২১ সালে তালেবান কাবুল দখল করার পর ভারত আতঙ্কে নিজেদের দূতাবাস ও চারটি কনস্যুলেট বন্ধ করে দেয় এবং আফগানদের জন্য সব ভিসা বাতিল করে দেয়। তবে এক বছরের মধ্যেই নয়াদিল্লি একটি ‘টেকনিক্যাল টিম’ পাঠিয়ে মানবিক সহায়তা তদারকির কাজ শুরু করে। ধীরে ধীরে ভারত তালেবান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে থাকে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিদেশে কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। গত বছর তালেবানকে দিল্লিতে নিজস্ব প্রতিনিধি নিয়োগের সুযোগ দেয় ভারত। এমনকি মুম্বাই ও হায়দরাবাদে তাদের কনস্যুলেট খোলার অনুমতিও দেওয়া হয়।

দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তান ছিল ভারত-পাকিস্তানের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, যেখানে পাকিস্তানপন্থি তালেবানকে ভারত সবসময় সন্দেহের চোখে দেখেছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। পাকিস্তান তালেবান সরকারকে ‘শত্রু রাষ্ট্র’ পর্যন্ত ঘোষণা দিয়েছে। ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানি তালেবান (টিটিপি) হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে তালেবান বলছে, পাকিস্তানের কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী আফগানিস্তানকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে। এই সুযোগে নয়াদিল্লি তালেবান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে আঞ্চলিক ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে চাইছে।

ভারতের কাছে আফগানিস্তান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামিক স্টেট (আইএস), আল-কায়েদা বা ভারতকেন্দ্রিক জঙ্গিগোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ে নয়াদিল্লি বরাবরই উদ্বিগ্ন। তালেবান ভারতকে আশ্বস্ত করেছে যে, আফগান মাটি ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হবে না। একই সঙ্গে ভারত মধ্য এশিয়া ও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে আফগানিস্তানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর হিসেবে দেখছে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান ও চীনের প্রভাবের পাল্টা ভারসাম্য তৈরি করতে পারে দিল্লি।

ভারতের পর্যবেক্ষণমূলক সংস্থা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন-এর দুই গবেষক হর্ষ ভি পন্ত ও শিবম শেখাওয়াত মনে করেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তালেবান এখন নিজের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পরিচয় দিতে চাইছে এবং ভারত সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। কৌশল বিশ্লেষক ব্রহ্ম চেলানেই বলেন, মুত্তাকির সফর পাকিস্তানের জন্য একটি ধাক্কা। তবে এটি দক্ষিণ এশিয়ায় বাস্তববাদী কূটনীতির এক নতুন অধ্যায় সূচিত করছে এবং ভারত-তালেবান সম্পর্কের কৌশলগত পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।