ঢাকা ০৩:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

দুবাইয়ে তেজস বিধ্বস্ত, ধাক্কা খেলো ভারতীয় যুদ্ধবিমান রফতানির সম্ভাবনা

দুবাই এয়ারশোতে ভারতের তেজস যুদ্ধবিমানের দুর্ঘটনা দেশটির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রকল্পের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ চার দশকের উন্নয়নপথ পেরিয়ে তৈরি হওয়া এই দেশীয় যুদ্ধবিমান এখন রফতানির বদলে আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে ভারতের নিজস্ব সামরিক অর্ডারের ওপর।

শুক্রবারের দুর্ঘটনার কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। এই ঘটনাকে ঘিরে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের উপস্থিতিতে হওয়া সপ্তাহব্যাপী কূটনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আড়ালেও চাপা পড়ে গেছে তেজসের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী।

ভারত উইং কমান্ডার নমনশ সিয়ালের মৃত্যুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে। এয়ারশোতে এমন দুর্ঘটনা বিরল হলেও এর প্রতীকী প্রভাব বড় বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মিচেল ইনস্টিটিউট ফর অ্যারোস্পেস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ডগলাস এ. বার্কি। তিনি বলেন, এই দৃশ্যটা নির্মম। এ ধরনের দুর্ঘটনা বড় সাফল্যের প্রদর্শনীতে সম্পূর্ণ উল্টো বার্তা দেয়, এ যেন এক নাটকীয় ব্যর্থতা।

তবে তিনি মনে করেন, তেজস নেতিবাচক প্রচারের মুখে পড়লেও শেষ পর্যন্ত আবার গতি ফিরে পেতে পারে।

দুবাই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এয়ারশো। প্যারিস এয়ারশোতে ১৯৯৯ সালে রুশ সুখই৩০ এবং এর এক দশক আগে সোভিয়েত মিগ২৯ বিধ্বস্ত হয়েছিল। তবে ওই দুর্ঘটনার সময় সব উড়োজাহাজচালকই নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পেরেছিলেন এবং পরবর্তীতে ভারত দুটি মডেলই কিনেছিল। বার্কির মতে, যুদ্ধবিমান কেনাবেচা মূলত উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল, তাই একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বদলে দেয় না।

১৯৮০এর দশকে সোভিয়েত নির্মিত পুরোনো মিগ২১ এর বিকল্প হিসেবে তেজস প্রকল্প শুরু হয়। দীর্ঘ বিলম্বের পর দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড (হ্যাল) উন্নত এমকে১এ সংস্করণের ১৮০টি বিমানের অর্ডার পেলেও জিই এয়ারোস্পেসের ইঞ্জিন সরবরাহ সমস্যা শুরু হওয়ায় এখনও সরবরাহ শুরু করতে পারেনি।

হ্যালএর এক সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, দুবাইয়ের দুর্ঘটনার পর এখনই রফতানি প্রায় অনিশ্চিত। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকাকে সম্ভাব্য বাজার ধরা হয়েছিল। ২০২৩ সালে মালয়েশিয়ায় অফিসও খুলেছিল হ্যাল। তিনি বলেন, এখন অগ্রাধিকার হবে দেশীয় চাহিদা পূরণে উৎপাদন বাড়ানো।

কিন্তু ভারতীয় বিমানবাহিনী (আইএএফ) সংকোচনের মুখে। অনুমোদিত ৪২ স্কোয়াড্রনের বিপরীতে বিদ্যমান সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ২৯টিতে। শিগগিরই অবসর নেবে মিগ২৯, অ্যাঙ্গলোফরাসি জ্যাগুয়ার এবং মিরাজ ২০০০এর প্রাথমিক সংস্করণ। এক আইএএফ কর্মকর্তা বলেন, তেজসই ছিল এদের বিকল্প। কিন্তু এটি উৎপাদন জটিলতায় পড়েছে।

তাৎক্ষণিক শূন্যতা পূরণে ভারত বেশি রাফাল কেনার দিকেই ঝুঁকছে বলে দেশটির দুই প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন। বর্তমানে আইএএফের বহরে তেজসের সংখ্যা প্রায় ৪০। পাশাপাশি দেশটি মার্কিন এফ৩৫ এবং রুশ সুখই৫৭ নিয়ে আলোচনাও করছে। দুবাই এয়ারশোতে এই দুই মডেলকে একই মঞ্চে দেখা গেছে।

বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেজসকে আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ২০২৩ সালের নভেম্বরে তেজসে উড্ডয়ন করেন। তেজসের উন্নয়ন ব্যাহত হয়েছিল ১৯৯৮ সালের পারমাণবিক পরীক্ষার পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও দেশীয় ইঞ্জিন নির্মাণের ব্যর্থতার কারণে।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সহযোগী ফেলো ওয়াল্টার ল্যাডউইগ বলেন, তেজসের প্রকৃত গুরুত্ব বিদেশি বিক্রিতে নয়, বরং ভবিষ্যৎ যুদ্ধবিমান প্রকল্পের প্রযুক্তিগত ভিত্তি গড়ে তোলায়।

এদিকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও স্পষ্ট ছিল এয়ারশোতে। তেজস একাধিক আকাশকৌশল দেখালেও প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের উপস্থিতি ছিল প্রবল। পাকিস্তান জানায়, একটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে জেএফ১৭ থান্ডার ব্লক৩ সরবরাহ নিয়ে প্রাথমিক চুক্তি হয়েছে। প্রদর্শনীতে দেখানো পাকিস্তানি জেএফ১৭এর পাশে রাখা ছিল পিএল১৫ই ক্ষেপণাস্ত্র, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতীয় কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী মে মাসে ভারতের ব্যবহৃত একটি ফরাসি রাফালকে ভূপাতিত করতে ব্যবহৃত হয়েছিল। পাকিস্তানের সরকারি প্রতিষ্ঠান পিএসি স্টলে এই যুদ্ধবিমানকে যুদ্ধে পরীক্ষিত বলে প্রচার করা হয়েছে।

ভারত অবশ্য তেজস ব্যবহারে সবসময়ই সতর্ক। কর্মকর্তারা জানান, মে মাসের চার দিনের সংঘর্ষে তেজস ব্যবহৃত হয়নি। যদিও কারণ জানানো হয়নি। এ বছর ২৬ জানুয়ারির প্রজাতন্ত্র দিবসের উড্ডয়ন প্রদর্শনীতেও অংশ নেয়নি তেজস। কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট যুদ্ধবিমানের নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

 

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় মধ্যস্থতায় পাকিস্তান, বৈঠক নিয়ে কাটছে না ধোঁয়াশা

দুবাইয়ে তেজস বিধ্বস্ত, ধাক্কা খেলো ভারতীয় যুদ্ধবিমান রফতানির সম্ভাবনা

আপডেট সময় : ০৫:১০:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫

দুবাই এয়ারশোতে ভারতের তেজস যুদ্ধবিমানের দুর্ঘটনা দেশটির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রকল্পের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ চার দশকের উন্নয়নপথ পেরিয়ে তৈরি হওয়া এই দেশীয় যুদ্ধবিমান এখন রফতানির বদলে আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে ভারতের নিজস্ব সামরিক অর্ডারের ওপর।

শুক্রবারের দুর্ঘটনার কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। এই ঘটনাকে ঘিরে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের উপস্থিতিতে হওয়া সপ্তাহব্যাপী কূটনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আড়ালেও চাপা পড়ে গেছে তেজসের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী।

ভারত উইং কমান্ডার নমনশ সিয়ালের মৃত্যুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে। এয়ারশোতে এমন দুর্ঘটনা বিরল হলেও এর প্রতীকী প্রভাব বড় বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মিচেল ইনস্টিটিউট ফর অ্যারোস্পেস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ডগলাস এ. বার্কি। তিনি বলেন, এই দৃশ্যটা নির্মম। এ ধরনের দুর্ঘটনা বড় সাফল্যের প্রদর্শনীতে সম্পূর্ণ উল্টো বার্তা দেয়, এ যেন এক নাটকীয় ব্যর্থতা।

তবে তিনি মনে করেন, তেজস নেতিবাচক প্রচারের মুখে পড়লেও শেষ পর্যন্ত আবার গতি ফিরে পেতে পারে।

দুবাই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এয়ারশো। প্যারিস এয়ারশোতে ১৯৯৯ সালে রুশ সুখই৩০ এবং এর এক দশক আগে সোভিয়েত মিগ২৯ বিধ্বস্ত হয়েছিল। তবে ওই দুর্ঘটনার সময় সব উড়োজাহাজচালকই নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পেরেছিলেন এবং পরবর্তীতে ভারত দুটি মডেলই কিনেছিল। বার্কির মতে, যুদ্ধবিমান কেনাবেচা মূলত উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল, তাই একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বদলে দেয় না।

১৯৮০এর দশকে সোভিয়েত নির্মিত পুরোনো মিগ২১ এর বিকল্প হিসেবে তেজস প্রকল্প শুরু হয়। দীর্ঘ বিলম্বের পর দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড (হ্যাল) উন্নত এমকে১এ সংস্করণের ১৮০টি বিমানের অর্ডার পেলেও জিই এয়ারোস্পেসের ইঞ্জিন সরবরাহ সমস্যা শুরু হওয়ায় এখনও সরবরাহ শুরু করতে পারেনি।

হ্যালএর এক সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, দুবাইয়ের দুর্ঘটনার পর এখনই রফতানি প্রায় অনিশ্চিত। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকাকে সম্ভাব্য বাজার ধরা হয়েছিল। ২০২৩ সালে মালয়েশিয়ায় অফিসও খুলেছিল হ্যাল। তিনি বলেন, এখন অগ্রাধিকার হবে দেশীয় চাহিদা পূরণে উৎপাদন বাড়ানো।

কিন্তু ভারতীয় বিমানবাহিনী (আইএএফ) সংকোচনের মুখে। অনুমোদিত ৪২ স্কোয়াড্রনের বিপরীতে বিদ্যমান সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ২৯টিতে। শিগগিরই অবসর নেবে মিগ২৯, অ্যাঙ্গলোফরাসি জ্যাগুয়ার এবং মিরাজ ২০০০এর প্রাথমিক সংস্করণ। এক আইএএফ কর্মকর্তা বলেন, তেজসই ছিল এদের বিকল্প। কিন্তু এটি উৎপাদন জটিলতায় পড়েছে।

তাৎক্ষণিক শূন্যতা পূরণে ভারত বেশি রাফাল কেনার দিকেই ঝুঁকছে বলে দেশটির দুই প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন। বর্তমানে আইএএফের বহরে তেজসের সংখ্যা প্রায় ৪০। পাশাপাশি দেশটি মার্কিন এফ৩৫ এবং রুশ সুখই৫৭ নিয়ে আলোচনাও করছে। দুবাই এয়ারশোতে এই দুই মডেলকে একই মঞ্চে দেখা গেছে।

বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেজসকে আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ২০২৩ সালের নভেম্বরে তেজসে উড্ডয়ন করেন। তেজসের উন্নয়ন ব্যাহত হয়েছিল ১৯৯৮ সালের পারমাণবিক পরীক্ষার পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও দেশীয় ইঞ্জিন নির্মাণের ব্যর্থতার কারণে।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সহযোগী ফেলো ওয়াল্টার ল্যাডউইগ বলেন, তেজসের প্রকৃত গুরুত্ব বিদেশি বিক্রিতে নয়, বরং ভবিষ্যৎ যুদ্ধবিমান প্রকল্পের প্রযুক্তিগত ভিত্তি গড়ে তোলায়।

এদিকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও স্পষ্ট ছিল এয়ারশোতে। তেজস একাধিক আকাশকৌশল দেখালেও প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের উপস্থিতি ছিল প্রবল। পাকিস্তান জানায়, একটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে জেএফ১৭ থান্ডার ব্লক৩ সরবরাহ নিয়ে প্রাথমিক চুক্তি হয়েছে। প্রদর্শনীতে দেখানো পাকিস্তানি জেএফ১৭এর পাশে রাখা ছিল পিএল১৫ই ক্ষেপণাস্ত্র, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতীয় কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী মে মাসে ভারতের ব্যবহৃত একটি ফরাসি রাফালকে ভূপাতিত করতে ব্যবহৃত হয়েছিল। পাকিস্তানের সরকারি প্রতিষ্ঠান পিএসি স্টলে এই যুদ্ধবিমানকে যুদ্ধে পরীক্ষিত বলে প্রচার করা হয়েছে।

ভারত অবশ্য তেজস ব্যবহারে সবসময়ই সতর্ক। কর্মকর্তারা জানান, মে মাসের চার দিনের সংঘর্ষে তেজস ব্যবহৃত হয়নি। যদিও কারণ জানানো হয়নি। এ বছর ২৬ জানুয়ারির প্রজাতন্ত্র দিবসের উড্ডয়ন প্রদর্শনীতেও অংশ নেয়নি তেজস। কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট যুদ্ধবিমানের নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।