ঢাকা ০২:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

ডেঙ্গু সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি: সরকারের জন্য সতর্ক হওয়ার বার্তা

বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। মে মাসের তুলনায় জুন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ বছর এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। পাশাপাশি বর্ষাকালে থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা থাকায় এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি জরিপেও এডিস মশার লার্ভার উচ্চ উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ফলে আগামী কয়েক মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রাক্‌-বর্ষা জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টি ওয়ার্ড ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ড অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেও এডিস মশার উপস্থিতি উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে। একই ধরনের ঝুঁকি দেখা গেছে চট্টগ্রাম নগরীতেও। এছাড়া বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর ও কক্সবাজারসহ দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে বিবেচিত হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মোট ডেঙ্গু রোগীর প্রায় অর্ধেকই শনাক্ত হয়েছেন জুন মাসে। ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত যেখানে ডেঙ্গুতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছিল, সেখানে জুন মাসেই মারা গেছেন ১৩ জন। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, ডেঙ্গু সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ২০১৯, ২০২২ ও ২০২৩ সালে ভয়াবহ ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। বর্তমানে হামসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগের চাপও বিদ্যমান। একই সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পেলে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে, যা স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সংকটের মুখে ফেলবে।

বিশ্বের কয়েকটি দেশ, বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। বাংলাদেশেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা মূলত প্রচারণা ও সীমিত অভিযানেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ডেঙ্গুকে এখনও সারা দেশের এবং সারা বছরের জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও প্রধানত ঢাকাকেন্দ্রিক থেকে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মশা নিধন নয়; রোগী শনাক্তকরণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতা—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, কীটতত্ত্ববিদ এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

বর্তমান পরিস্থিতি সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এখনই সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে এডিস মশা নিধনে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, রক্তের উপাদান এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে প্রস্তুত রাখতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানি অপসারণ এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

সময়ের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অন্যথায় আগামী কয়েক মাসে এটি দেশের জন্য একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর নিয়ে আল্টিমেটাম: ৫ আগস্টের মধ্যে না খুললে জনগণই খুলে দেবে

ডেঙ্গু সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি: সরকারের জন্য সতর্ক হওয়ার বার্তা

আপডেট সময় : ১২:৪৭:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। মে মাসের তুলনায় জুন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ বছর এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। পাশাপাশি বর্ষাকালে থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা থাকায় এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি জরিপেও এডিস মশার লার্ভার উচ্চ উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ফলে আগামী কয়েক মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রাক্‌-বর্ষা জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টি ওয়ার্ড ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ড অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেও এডিস মশার উপস্থিতি উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে। একই ধরনের ঝুঁকি দেখা গেছে চট্টগ্রাম নগরীতেও। এছাড়া বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর ও কক্সবাজারসহ দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে বিবেচিত হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মোট ডেঙ্গু রোগীর প্রায় অর্ধেকই শনাক্ত হয়েছেন জুন মাসে। ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত যেখানে ডেঙ্গুতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছিল, সেখানে জুন মাসেই মারা গেছেন ১৩ জন। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, ডেঙ্গু সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ২০১৯, ২০২২ ও ২০২৩ সালে ভয়াবহ ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। বর্তমানে হামসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগের চাপও বিদ্যমান। একই সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পেলে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে, যা স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সংকটের মুখে ফেলবে।

বিশ্বের কয়েকটি দেশ, বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। বাংলাদেশেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা মূলত প্রচারণা ও সীমিত অভিযানেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ডেঙ্গুকে এখনও সারা দেশের এবং সারা বছরের জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও প্রধানত ঢাকাকেন্দ্রিক থেকে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মশা নিধন নয়; রোগী শনাক্তকরণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতা—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, কীটতত্ত্ববিদ এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

বর্তমান পরিস্থিতি সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এখনই সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে এডিস মশা নিধনে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, রক্তের উপাদান এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে প্রস্তুত রাখতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানি অপসারণ এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

সময়ের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অন্যথায় আগামী কয়েক মাসে এটি দেশের জন্য একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে।