ঢাকা ০৪:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

যুদ্ধবিরতির শুরু: ধ্বংসস্তূপের মাঝেই গাজায় মানুষের ঘরে ফেরা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:২২:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫
  • ২৪ বার পড়া হয়েছে

দীর্ঘ দুই বছরের ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এর পরপরই শুক্রবার গাজার হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ তাদের বিধ্বস্ত বাড়ির দিকে ফিরতে শুরু করেছেন। ইসরায়েলি বাহিনী ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে যাওয়ায় গাজা নগরী ও তার আশেপাশে এখন মানুষের ঘরে ফেরার ঢল নেমেছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই খবরটি জানিয়েছে।

গাজা নগরীর শেখ রাদওয়ান এলাকার বাসিন্দা ইসমাইল যায়দা নিজের ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, “আল্লাহর কৃপায় আমার ঘরটা এখনও টিকে আছে। কিন্তু চারপাশের সবকিছু গুঁড়িয়ে গেছে, পুরো পাড়াটা যেন বিলীন হয়ে গেছে।”

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা (গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৯টা) থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এর আগে ভোরে ইসরায়েলি সরকার হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপটি অনুমোদন করে। এর মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আংশিক সেনা প্রত্যাহার এবং পূর্ণ যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পথ খুলে গেল।

এই চুক্তি অনুযায়ী, হামাস ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ২০ জন জীবিত ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেবে। এর বিনিময়ে ইসরায়েল ২৫০ জন দীর্ঘমেয়াদি ফিলিস্তিনি বন্দি এবং যুদ্ধের সময় আটক আরও প্রায় ১ হাজার ৭০০ জনকে মুক্তি দেবে।

চুক্তিটি কার্যকর হওয়ায় গাজায় খাদ্য ও চিকিৎসা সামগ্রী বহনকারী শত শত ট্রাক প্রবেশ করবে। জাতিসংঘ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লাখ লাখ মানুষ তাঁবুতে আশ্রয় নেওয়ার পর তাদের টিকে থাকার জন্য এই জরুরি সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপ অনুসারে, ইসরায়েলি বাহিনী গাজার কিছু প্রধান নগর এলাকা থেকে সরে যাবে। তবে পুরো ভূখণ্ডের প্রায় অর্ধেক অংশের নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতেই থাকবে।

টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, গাজাকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি সৈন্যরা সেখানে অবস্থান করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “যদি শান্তিপূর্ণভাবে তা হয়, ভালো; না হলে আমরা কঠিন পথেই এটা অর্জন করব।”

দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসে ইসরায়েলি সেনারা পূর্বাঞ্চল থেকে সরে যেতে শুরু করেছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য মতে, কিছু এলাকায় এখনও ট্যাংকের গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে।

মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরেও কিছু ইসরায়েলি সেনা তাদের অবস্থান গুটিয়ে সীমান্তের দিকে চলে গেছে। যদিও ভোরে সেখানে গুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল। একইসঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনী ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল ধরে গাজা নগরীর দিকে যাওয়া সড়ক থেকেও সরে গেছে।

গাজার বাসিন্দা মাহদি সাকলা জানান, “যখন যুদ্ধবিরতির খবর শুনলাম, সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। ঘরবাড়ি কিছুই নেই, সব ধ্বংস হয়ে গেছে। তবুও ফিরে আসা, এটাই আমাদের জন্য আনন্দের। আমরা দুই বছর ধরে ভাসমান জীবনের মধ্যে ছিলাম।”

হামাসের নির্বাসিত নেতা খলিল আল-হায়্যা নিশ্চিত করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে তারা জেনেছেন যুদ্ধ শেষ হয়েছে। ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিন—উভয়পক্ষেই এই চুক্তির ঘোষণাকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়েছে।

গত দুই বছরে ইসরায়েলের অভিযানে গাজায় ৬৭ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার শিশু। অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।

চুক্তি অনুসারে, হামাস ২০ জীবিত জিম্মিকে দ্রুত মুক্তি দেবে, তবে নিহত জিম্মিদের মরদেহ উদ্ধারে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে এখনো কিছু জটিলতা রয়েছে। বন্দি বিনিময়ের তালিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি। হামাস চায়, ইসরায়েলে আটক শীর্ষ ফিলিস্তিনি নেতাদের মুক্তি দেওয়া হোক।

এ ছাড়া ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ, যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার প্রশাসন এবং হামাসের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।

হামাসের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী সরে যাওয়া এলাকায় তারা নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করবে। তবে হামাসের যোদ্ধারা রাস্তায় ফিরবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রবিবার মধ্যপ্রাচ্য সফরের কথা জানিয়েছেন। তিনি সম্ভবত মিসরে অনুষ্ঠেয় চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সেখানে যাবেন। ইসরায়েলি পার্লামেন্টের স্পিকার আমির ওহানা তাকে নেসেটে বক্তব্য দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় মেধার স্বাক্ষর, বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছে তাওসিফ সামি

যুদ্ধবিরতির শুরু: ধ্বংসস্তূপের মাঝেই গাজায় মানুষের ঘরে ফেরা

আপডেট সময় : ০৭:২২:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫

দীর্ঘ দুই বছরের ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এর পরপরই শুক্রবার গাজার হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ তাদের বিধ্বস্ত বাড়ির দিকে ফিরতে শুরু করেছেন। ইসরায়েলি বাহিনী ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে যাওয়ায় গাজা নগরী ও তার আশেপাশে এখন মানুষের ঘরে ফেরার ঢল নেমেছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই খবরটি জানিয়েছে।

গাজা নগরীর শেখ রাদওয়ান এলাকার বাসিন্দা ইসমাইল যায়দা নিজের ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, “আল্লাহর কৃপায় আমার ঘরটা এখনও টিকে আছে। কিন্তু চারপাশের সবকিছু গুঁড়িয়ে গেছে, পুরো পাড়াটা যেন বিলীন হয়ে গেছে।”

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা (গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৯টা) থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এর আগে ভোরে ইসরায়েলি সরকার হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপটি অনুমোদন করে। এর মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আংশিক সেনা প্রত্যাহার এবং পূর্ণ যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পথ খুলে গেল।

এই চুক্তি অনুযায়ী, হামাস ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ২০ জন জীবিত ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেবে। এর বিনিময়ে ইসরায়েল ২৫০ জন দীর্ঘমেয়াদি ফিলিস্তিনি বন্দি এবং যুদ্ধের সময় আটক আরও প্রায় ১ হাজার ৭০০ জনকে মুক্তি দেবে।

চুক্তিটি কার্যকর হওয়ায় গাজায় খাদ্য ও চিকিৎসা সামগ্রী বহনকারী শত শত ট্রাক প্রবেশ করবে। জাতিসংঘ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লাখ লাখ মানুষ তাঁবুতে আশ্রয় নেওয়ার পর তাদের টিকে থাকার জন্য এই জরুরি সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপ অনুসারে, ইসরায়েলি বাহিনী গাজার কিছু প্রধান নগর এলাকা থেকে সরে যাবে। তবে পুরো ভূখণ্ডের প্রায় অর্ধেক অংশের নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতেই থাকবে।

টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, গাজাকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি সৈন্যরা সেখানে অবস্থান করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “যদি শান্তিপূর্ণভাবে তা হয়, ভালো; না হলে আমরা কঠিন পথেই এটা অর্জন করব।”

দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসে ইসরায়েলি সেনারা পূর্বাঞ্চল থেকে সরে যেতে শুরু করেছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য মতে, কিছু এলাকায় এখনও ট্যাংকের গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে।

মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরেও কিছু ইসরায়েলি সেনা তাদের অবস্থান গুটিয়ে সীমান্তের দিকে চলে গেছে। যদিও ভোরে সেখানে গুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল। একইসঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনী ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল ধরে গাজা নগরীর দিকে যাওয়া সড়ক থেকেও সরে গেছে।

গাজার বাসিন্দা মাহদি সাকলা জানান, “যখন যুদ্ধবিরতির খবর শুনলাম, সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। ঘরবাড়ি কিছুই নেই, সব ধ্বংস হয়ে গেছে। তবুও ফিরে আসা, এটাই আমাদের জন্য আনন্দের। আমরা দুই বছর ধরে ভাসমান জীবনের মধ্যে ছিলাম।”

হামাসের নির্বাসিত নেতা খলিল আল-হায়্যা নিশ্চিত করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে তারা জেনেছেন যুদ্ধ শেষ হয়েছে। ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিন—উভয়পক্ষেই এই চুক্তির ঘোষণাকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়েছে।

গত দুই বছরে ইসরায়েলের অভিযানে গাজায় ৬৭ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার শিশু। অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।

চুক্তি অনুসারে, হামাস ২০ জীবিত জিম্মিকে দ্রুত মুক্তি দেবে, তবে নিহত জিম্মিদের মরদেহ উদ্ধারে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে এখনো কিছু জটিলতা রয়েছে। বন্দি বিনিময়ের তালিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি। হামাস চায়, ইসরায়েলে আটক শীর্ষ ফিলিস্তিনি নেতাদের মুক্তি দেওয়া হোক।

এ ছাড়া ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ, যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার প্রশাসন এবং হামাসের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।

হামাসের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী সরে যাওয়া এলাকায় তারা নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করবে। তবে হামাসের যোদ্ধারা রাস্তায় ফিরবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রবিবার মধ্যপ্রাচ্য সফরের কথা জানিয়েছেন। তিনি সম্ভবত মিসরে অনুষ্ঠেয় চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সেখানে যাবেন। ইসরায়েলি পার্লামেন্টের স্পিকার আমির ওহানা তাকে নেসেটে বক্তব্য দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।