ঢাকা ১২:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

আশুরার ইতিহাস: কারবালা থেকে কায়রো পর্যন্ত শির মোবারকের যাত্রা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:১৮:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। এ মাসের ১০ তারিখ, পবিত্র আশুরা, মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম শোকাবহ দিন। ৬১ হিজরির ১০ মহররম (৬৮০ খ্রিস্টাব্দ) ইরাকের কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত হয় ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক ঘটনা। সেদিন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন ইবনে আলী (রা.) এবং তার সঙ্গীরা শাহাদাত বরণ করেন।

কারবালার এই ঘটনার পর ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পবিত্র শির মোবারক কোথায় নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে কোথায় সংরক্ষিত বা সমাহিত করা হয়—এ নিয়ে ইসলামি ইতিহাসে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে।

ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে উল্লেখ রয়েছে, কারবালার ঘটনার পর ওবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদের বাহিনীর সদস্য শিমর ইবনে জিলজাওশান (বা জিলজুশান) ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শির মোবারক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করেন। পরে আহলে বাইতের নারী ও শিশুদের সঙ্গে তা কুফায় গভর্নর ওবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদের কাছে পাঠানো হয়।

পরবর্তীতে ইবনে জিয়াদ শির মোবারকসহ আহলে বাইতের সদস্যদের দামেস্কে তৎকালীন শাসক ইয়াজিদের দরবারে পাঠান। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে আহলে বাইতের সদস্যদের মদিনায় ফিরে যেতে দেওয়া হলেও শির মোবারক বিভিন্ন সময়ে একাধিক স্থানে সংরক্ষিত বা স্থানান্তরিত হয়েছে বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আল-মাকরিজির বর্ণনা অনুযায়ী, ৫৪৮ হিজরির ৮ জমাদিউস সানিতে ফিলিস্তিনের আসকালান থেকে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শির মোবারক একটি বিশেষ সুরক্ষিত বাক্সে করে মিশরের কায়রোতে আনা হয়। দুই দিন পর সেটি কায়রো পৌঁছালে তৎকালীন শাসক আমির সাইফ তা গ্রহণ করেন।

ঐতিহাসিক সূত্রে আরও উল্লেখ রয়েছে, কায়রোতে শির মোবারক পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে সমবেত হন। পরে ৫৪৮ হিজরির ১০ জমাদিউস সানিতে আল-আজহার মসজিদের নিকটবর্তী একটি স্থানে তা পুনরায় সমাহিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেই স্থানকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হয় ঐতিহাসিক সাইয়্যেদিনা হোসাইন মসজিদ, যা বর্তমানে মিশরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে পরিচিত।

তবে এ বিষয়ে আরেকটি ঐতিহাসিক বর্ণনাও রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইয়াজিদের নির্দেশে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শির মোবারক গোলাপজল দিয়ে ধৌত করে কাপড়ে জড়িয়ে রাখা হয়। পরে আসকালান থেকে আগত একদল ব্যক্তি সেটি ফিলিস্তিনের আসকালান এলাকায় সমাহিত করেন।

ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ১০৯৬ থেকে ১২৯০ সালের মধ্যে ক্রুসেডারদের মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসনের সময় আশঙ্কা তৈরি হয় যে, আসকালানে সংরক্ষিত এই পবিত্র নিদর্শন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে কারণে ফাতেমি শাসকেরা সেটি মিশরের কায়রোতে স্থানান্তর করেন এবং আল-আজহার মসজিদের পাশে পুনরায় সমাহিত করেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়।

বর্তমানে কায়রোর ঐতিহাসিক সাইয়্যেদিনা হোসাইন মসজিদকে কেন্দ্র করে এই ঐতিহ্য আজও মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে উল্লেখ্য, ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শির মোবারক কোথায় সমাহিত হয়েছে, সে বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে সর্বসম্মত মত নেই। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। কায়রোর সাইয়্যেদিনা হোসাইন মসজিদ-সংক্রান্ত বিবরণও মূলত নির্দিষ্ট কয়েকটি ঐতিহাসিক সূত্র ও গবেষণার ওপর ভিত্তি করে প্রচলিত।

তথ্যসূত্র: তাসাউফের শায়খ জাকিউদ্দিন ইবরাহীমের رأس الإمام الحسين بمشهده بالقاهرة تحقيقا مؤكدا حاسما এবং মিশরের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি ড. আলী জুমার البيان القويم গ্রন্থ।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

এসএসসি পরীক্ষার সময়সূচি এগিয়ে আসায় বিপাকে পরীক্ষার্থীরা, সিলেবাস নিয়ে দুশ্চিন্তা

আশুরার ইতিহাস: কারবালা থেকে কায়রো পর্যন্ত শির মোবারকের যাত্রা

আপডেট সময় : ১১:১৮:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। এ মাসের ১০ তারিখ, পবিত্র আশুরা, মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম শোকাবহ দিন। ৬১ হিজরির ১০ মহররম (৬৮০ খ্রিস্টাব্দ) ইরাকের কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত হয় ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক ঘটনা। সেদিন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন ইবনে আলী (রা.) এবং তার সঙ্গীরা শাহাদাত বরণ করেন।

কারবালার এই ঘটনার পর ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পবিত্র শির মোবারক কোথায় নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে কোথায় সংরক্ষিত বা সমাহিত করা হয়—এ নিয়ে ইসলামি ইতিহাসে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে।

ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে উল্লেখ রয়েছে, কারবালার ঘটনার পর ওবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদের বাহিনীর সদস্য শিমর ইবনে জিলজাওশান (বা জিলজুশান) ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শির মোবারক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করেন। পরে আহলে বাইতের নারী ও শিশুদের সঙ্গে তা কুফায় গভর্নর ওবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদের কাছে পাঠানো হয়।

পরবর্তীতে ইবনে জিয়াদ শির মোবারকসহ আহলে বাইতের সদস্যদের দামেস্কে তৎকালীন শাসক ইয়াজিদের দরবারে পাঠান। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে আহলে বাইতের সদস্যদের মদিনায় ফিরে যেতে দেওয়া হলেও শির মোবারক বিভিন্ন সময়ে একাধিক স্থানে সংরক্ষিত বা স্থানান্তরিত হয়েছে বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আল-মাকরিজির বর্ণনা অনুযায়ী, ৫৪৮ হিজরির ৮ জমাদিউস সানিতে ফিলিস্তিনের আসকালান থেকে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শির মোবারক একটি বিশেষ সুরক্ষিত বাক্সে করে মিশরের কায়রোতে আনা হয়। দুই দিন পর সেটি কায়রো পৌঁছালে তৎকালীন শাসক আমির সাইফ তা গ্রহণ করেন।

ঐতিহাসিক সূত্রে আরও উল্লেখ রয়েছে, কায়রোতে শির মোবারক পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে সমবেত হন। পরে ৫৪৮ হিজরির ১০ জমাদিউস সানিতে আল-আজহার মসজিদের নিকটবর্তী একটি স্থানে তা পুনরায় সমাহিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেই স্থানকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হয় ঐতিহাসিক সাইয়্যেদিনা হোসাইন মসজিদ, যা বর্তমানে মিশরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে পরিচিত।

তবে এ বিষয়ে আরেকটি ঐতিহাসিক বর্ণনাও রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইয়াজিদের নির্দেশে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শির মোবারক গোলাপজল দিয়ে ধৌত করে কাপড়ে জড়িয়ে রাখা হয়। পরে আসকালান থেকে আগত একদল ব্যক্তি সেটি ফিলিস্তিনের আসকালান এলাকায় সমাহিত করেন।

ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ১০৯৬ থেকে ১২৯০ সালের মধ্যে ক্রুসেডারদের মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসনের সময় আশঙ্কা তৈরি হয় যে, আসকালানে সংরক্ষিত এই পবিত্র নিদর্শন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে কারণে ফাতেমি শাসকেরা সেটি মিশরের কায়রোতে স্থানান্তর করেন এবং আল-আজহার মসজিদের পাশে পুনরায় সমাহিত করেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়।

বর্তমানে কায়রোর ঐতিহাসিক সাইয়্যেদিনা হোসাইন মসজিদকে কেন্দ্র করে এই ঐতিহ্য আজও মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে উল্লেখ্য, ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শির মোবারক কোথায় সমাহিত হয়েছে, সে বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে সর্বসম্মত মত নেই। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। কায়রোর সাইয়্যেদিনা হোসাইন মসজিদ-সংক্রান্ত বিবরণও মূলত নির্দিষ্ট কয়েকটি ঐতিহাসিক সূত্র ও গবেষণার ওপর ভিত্তি করে প্রচলিত।

তথ্যসূত্র: তাসাউফের শায়খ জাকিউদ্দিন ইবরাহীমের رأس الإمام الحسين بمشهده بالقاهرة تحقيقا مؤكدا حاسما এবং মিশরের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি ড. আলী জুমার البيان القويم গ্রন্থ।