ঢাকা ১২:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

ট্রাম্প বলছেন আজই চুক্তি, সময় নিয়ে ভিন্ন সুর ইরানের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহু আলোচিত পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, রোববারই দুই দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে। তবে ইরান এ বিষয়ে আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং জানিয়েছে, এখনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।

শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিনের উত্তেজনা নিরসনে এই সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং এটি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিকে কার্যত বন্ধ করে দেবে।

চুক্তির মধ্যস্থতাকারীদের একজন হিসেবে পাকিস্তানও আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

তবে ইরানের অবস্থান অনেকটাই ভিন্ন। দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড এবং আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সমঝোতা স্মারকের বেশ কিছু বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তাদের মতে, ট্রাম্প চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে অস্বাভাবিক তাড়াহুড়া করছেন।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ১৪ জুন ট্রাম্পের জন্মদিন হওয়ায় তিনি এই চুক্তিকে রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন। এজন্যই দ্রুত চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে বলে তাদের ধারণা।

এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইও সময়সীমা নিয়ে সতর্ক মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি এবং এটি অবিলম্বে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনাও নেই।

এদিকে ট্রাম্প তার বক্তব্যে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের প্রসঙ্গও টেনে আনেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হলে যুক্তরাষ্ট্র সেই পারমাণবিক উপাদানগুলো সংগ্রহ করবে এবং সেগুলো ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হবে।

দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ করে আসছে। তবে তেহরান বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইরানের দাবি, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে, বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য পরিচালিত হচ্ছে।

চুক্তি নিয়ে আশাবাদী অবস্থান প্রকাশ করলেও ট্রাম্প সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধান না এলে ওয়াশিংটনের হাতে বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। যদিও তিনি আশা প্রকাশ করেন, সেই পরিস্থিতি তৈরি হবে না।

একই দিনে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় যে পারমাণবিক চুক্তি হয়েছিল, তা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ করে দিয়েছিল।

ট্রাম্প লিখেছেন, ওবামার চুক্তি ইরানের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একটি সহজ পথ ছিল। তার ভাষায়, সেই চুক্তি বহাল থাকলে ইরান অনেক আগেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারত। বিপরীতে বর্তমান সমঝোতাকে তিনি ‘পারমাণবিক অস্ত্র ঠেকানোর শক্ত দেয়াল’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

তিনি আরও দাবি করেন, বর্তমানে ইরান আর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না এবং তার প্রশাসনের সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো অবস্থায় রয়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন সমঝোতায় কোনো অর্থনৈতিক প্রণোদনা বা নগদ অর্থ লেনদেনের বিষয় নেই। তিনি ওবামা প্রশাসনের সময়ে ইরানকে দেওয়া অর্থ সহায়তারও সমালোচনা করেন।

অন্যদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, নিরাপত্তা ও লজিস্টিক জটিলতার কারণে চুক্তি সশরীরে নয়, ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে স্বাক্ষর করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলে পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য আরও বিস্তারিত আলোচনা শুরু হবে।

তবে এখনো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদের বিষয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের ব্যাখ্যা এক নয়।

ফলে ট্রাম্পের আশাবাদী ঘোষণার বিপরীতে ইরানের সতর্ক অবস্থান নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—চুক্তি কি সত্যিই আজই স্বাক্ষরিত হবে, নাকি আলোচনার পথ আরও দীর্ঘ হবে? আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল এখন সেই উত্তর জানার অপেক্ষায় রয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে আজ পঞ্চম সাক্ষীর জবানবন্দি

ট্রাম্প বলছেন আজই চুক্তি, সময় নিয়ে ভিন্ন সুর ইরানের

আপডেট সময় : ১০:২১:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহু আলোচিত পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, রোববারই দুই দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে। তবে ইরান এ বিষয়ে আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং জানিয়েছে, এখনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।

শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিনের উত্তেজনা নিরসনে এই সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং এটি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিকে কার্যত বন্ধ করে দেবে।

চুক্তির মধ্যস্থতাকারীদের একজন হিসেবে পাকিস্তানও আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

তবে ইরানের অবস্থান অনেকটাই ভিন্ন। দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড এবং আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সমঝোতা স্মারকের বেশ কিছু বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তাদের মতে, ট্রাম্প চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে অস্বাভাবিক তাড়াহুড়া করছেন।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ১৪ জুন ট্রাম্পের জন্মদিন হওয়ায় তিনি এই চুক্তিকে রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন। এজন্যই দ্রুত চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে বলে তাদের ধারণা।

এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইও সময়সীমা নিয়ে সতর্ক মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি এবং এটি অবিলম্বে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনাও নেই।

এদিকে ট্রাম্প তার বক্তব্যে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের প্রসঙ্গও টেনে আনেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হলে যুক্তরাষ্ট্র সেই পারমাণবিক উপাদানগুলো সংগ্রহ করবে এবং সেগুলো ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হবে।

দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ করে আসছে। তবে তেহরান বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইরানের দাবি, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে, বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য পরিচালিত হচ্ছে।

চুক্তি নিয়ে আশাবাদী অবস্থান প্রকাশ করলেও ট্রাম্প সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধান না এলে ওয়াশিংটনের হাতে বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। যদিও তিনি আশা প্রকাশ করেন, সেই পরিস্থিতি তৈরি হবে না।

একই দিনে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় যে পারমাণবিক চুক্তি হয়েছিল, তা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ করে দিয়েছিল।

ট্রাম্প লিখেছেন, ওবামার চুক্তি ইরানের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একটি সহজ পথ ছিল। তার ভাষায়, সেই চুক্তি বহাল থাকলে ইরান অনেক আগেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারত। বিপরীতে বর্তমান সমঝোতাকে তিনি ‘পারমাণবিক অস্ত্র ঠেকানোর শক্ত দেয়াল’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

তিনি আরও দাবি করেন, বর্তমানে ইরান আর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না এবং তার প্রশাসনের সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো অবস্থায় রয়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন সমঝোতায় কোনো অর্থনৈতিক প্রণোদনা বা নগদ অর্থ লেনদেনের বিষয় নেই। তিনি ওবামা প্রশাসনের সময়ে ইরানকে দেওয়া অর্থ সহায়তারও সমালোচনা করেন।

অন্যদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, নিরাপত্তা ও লজিস্টিক জটিলতার কারণে চুক্তি সশরীরে নয়, ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে স্বাক্ষর করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলে পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য আরও বিস্তারিত আলোচনা শুরু হবে।

তবে এখনো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদের বিষয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের ব্যাখ্যা এক নয়।

ফলে ট্রাম্পের আশাবাদী ঘোষণার বিপরীতে ইরানের সতর্ক অবস্থান নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—চুক্তি কি সত্যিই আজই স্বাক্ষরিত হবে, নাকি আলোচনার পথ আরও দীর্ঘ হবে? আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল এখন সেই উত্তর জানার অপেক্ষায় রয়েছে।