ঢাকা ০৯:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

বেকারত্ব কমাতে মহাপরিকল্পনা, চাকরির বাজারে কি আসছে নতুন জোয়ার?

নিজস্ব প্রতিবেদক

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের ধীরগতি এবং সীমিত কর্মসংস্থানের কারণে দেশের অর্থনীতি যখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন নতুন অর্থবছরের বাজেটে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে যাচ্ছে সরকার। নীতিনির্ধারকদের আশা, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে অর্থনীতিতে নতুন গতি ফিরবে এবং সৃষ্টি হবে লাখো নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে। এই বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা।

কর্মসংস্থান কেন বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সেই অনুপাতে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে এবং অনেকেই যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র সরকারি চাকরির মাধ্যমে বেকারত্ব সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস হতে হবে শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ।

বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য

সরকার আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগ অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, বিনিয়োগ বাড়লে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, উৎপাদন বাড়বে, রপ্তানি সম্প্রসারিত হবে এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হবে।

৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ উদ্যোগ

অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে বন্ধ ও অর্ধচলমান শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এই তহবিল থেকে স্বল্প সুদে ঋণ নিয়ে বন্ধ কারখানা পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। নীতিমালা অনুযায়ী, সম্ভাবনাময় কিন্তু আর্থিক সংকটে থাকা শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এ সুবিধা পাবে। বিশেষ করে শ্রমঘন শিল্প, রপ্তানিমুখী কারখানা এবং উৎপাদনমুখী খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

কোন খাতে জোর দিচ্ছে সরকার

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, তৈরি পোশাক, কৃষিভিত্তিক শিল্প, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, হালকা প্রকৌশল এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব খাত তুলনামূলকভাবে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম। পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তা এবং নতুন ব্যবসা উদ্যোগের ক্ষেত্রেও সহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিনিয়োগ কমার কারণ

গত কয়েক বছরে ডলার সংকট, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ প্রবাহে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। ফলে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগ থেকে সরে গেছেন অথবা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নীতিগত স্থিতিশীলতা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, আর্থিক খাত সংস্কার এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বড় লক্ষ্য, বড় চ্যালেঞ্জ

সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে রাজস্ব ঘাটতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি সরকারের এই পরিকল্পনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সফলতার মাপকাঠি হবে কর্মসংস্থান

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজেটের সফলতা কেবল রাজস্ব আদায় বা ব্যয়ের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যাবে না। বরং কত নতুন বিনিয়োগ এলো, কত নতুন শিল্প চালু হলো এবং কত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো—সেটিই হবে প্রকৃত মূল্যায়নের মানদণ্ড। কারণ দেশের কোটি কোটি তরুণের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নতুন চাকরির সুযোগ কতটা তৈরি হবে। নতুন বাজেট সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে অর্থনীতির আগামী দিনের গতিপথ।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

শুভ জন্মদিন ফুটবল জাদুকর

বেকারত্ব কমাতে মহাপরিকল্পনা, চাকরির বাজারে কি আসছে নতুন জোয়ার?

আপডেট সময় : ০৬:৪২:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের ধীরগতি এবং সীমিত কর্মসংস্থানের কারণে দেশের অর্থনীতি যখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন নতুন অর্থবছরের বাজেটে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে যাচ্ছে সরকার। নীতিনির্ধারকদের আশা, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে অর্থনীতিতে নতুন গতি ফিরবে এবং সৃষ্টি হবে লাখো নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে। এই বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা।

কর্মসংস্থান কেন বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সেই অনুপাতে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে এবং অনেকেই যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র সরকারি চাকরির মাধ্যমে বেকারত্ব সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস হতে হবে শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ।

বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য

সরকার আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগ অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, বিনিয়োগ বাড়লে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, উৎপাদন বাড়বে, রপ্তানি সম্প্রসারিত হবে এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হবে।

৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ উদ্যোগ

অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে বন্ধ ও অর্ধচলমান শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এই তহবিল থেকে স্বল্প সুদে ঋণ নিয়ে বন্ধ কারখানা পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। নীতিমালা অনুযায়ী, সম্ভাবনাময় কিন্তু আর্থিক সংকটে থাকা শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এ সুবিধা পাবে। বিশেষ করে শ্রমঘন শিল্প, রপ্তানিমুখী কারখানা এবং উৎপাদনমুখী খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

কোন খাতে জোর দিচ্ছে সরকার

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, তৈরি পোশাক, কৃষিভিত্তিক শিল্প, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, হালকা প্রকৌশল এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব খাত তুলনামূলকভাবে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম। পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তা এবং নতুন ব্যবসা উদ্যোগের ক্ষেত্রেও সহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিনিয়োগ কমার কারণ

গত কয়েক বছরে ডলার সংকট, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ প্রবাহে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। ফলে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগ থেকে সরে গেছেন অথবা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নীতিগত স্থিতিশীলতা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, আর্থিক খাত সংস্কার এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বড় লক্ষ্য, বড় চ্যালেঞ্জ

সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে রাজস্ব ঘাটতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি সরকারের এই পরিকল্পনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সফলতার মাপকাঠি হবে কর্মসংস্থান

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজেটের সফলতা কেবল রাজস্ব আদায় বা ব্যয়ের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যাবে না। বরং কত নতুন বিনিয়োগ এলো, কত নতুন শিল্প চালু হলো এবং কত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো—সেটিই হবে প্রকৃত মূল্যায়নের মানদণ্ড। কারণ দেশের কোটি কোটি তরুণের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নতুন চাকরির সুযোগ কতটা তৈরি হবে। নতুন বাজেট সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে অর্থনীতির আগামী দিনের গতিপথ।