ঢাকা ০৫:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

৩০ কিলোমিটার রেলপথে ১২ বছর, অর্ধেক কাজও শেষ নয়; আরও দুই বছর সময় চায় রেলওয়ে

ঢাকার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের রেল যোগাযোগ আধুনিক ও গতিশীল করার লক্ষ্যে শুরু হয়েছিল ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুয়েলগেজ ডাবল রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প। ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল মাত্র তিন বছরের মধ্যে। কিন্তু এক যুগ পেরিয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৫৭ দশমিক ২০ শতাংশ। চার দফা সময় বাড়ানোর পরও প্রকল্পটি শেষ না হওয়ায় এবার আরও দুই বছর সময় চেয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের সমান্তরালে একটি ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ’ প্রকল্পটি ২০১৪ সালের ১ জুলাই শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ৩৭৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য ছিল। পরে একাধিকবার মেয়াদ ও প্রকল্প পরিকল্পনা সংশোধনের ফলে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকায়, যা প্রায় দ্বিগুণ।

শুরুতে প্রকল্পটি শুধু নতুন একটি ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণের জন্য নেওয়া হলেও পরে বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনকেও ডুয়েলগেজে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে প্রকল্পের পরিধি বাড়ে এবং নতুন করে নকশা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়। ২০২৩ সালে সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।

প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুরু থেকেই জমি অধিগ্রহণ, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক জটিলতায় প্রকল্পটি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দুই দফা দরপত্র আহ্বানের পর ২০১৭ সালে কাজ পায় চীনের একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। তবে প্রকল্প এলাকা সময়মতো বুঝে না পাওয়ার অভিযোগ তুলে প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ সালে কাজ অসমাপ্ত রেখেই সরে যায়। তখন পর্যন্ত তারা মোট কাজের মাত্র ৪৭ শতাংশ সম্পন্ন করেছিল।

এরপর নতুন ঠিকাদার নিয়োগের জন্য আবারও দরপত্র আহ্বান করা হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারতীয় ও দেশীয় দুটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তারা মে মাসে মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করে। নতুন ঠিকাদার দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছুটা গতি এলেও প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি এখনো আশানুরূপ নয়।

প্রকল্পের আওতায় জুরাইন থেকে নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশন পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ২২টি ছোট সেতু, পাঁচটি স্টেশন ভবন, ১১টি প্ল্যাটফর্ম, ১১টি প্ল্যাটফর্ম শেড, ফুটওভার ব্রিজ, আধুনিক সংকেতব্যবস্থা এবং বিভিন্ন রেলওয়ে অবকাঠামো নির্মাণের কাজও রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বলা হয়েছে, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমান একক রেললাইন সেই চাহিদা পূরণে অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে একই লাইনে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ উভয় ধরনের ট্রেন চলাচল করতে পারবে, ফলে যাত্রী পরিবহন ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

তবে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি এখনো হতাশাজনক। মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ, আর ভৌত অগ্রগতি ৫৭ দশমিক ২০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকল্পের সময়ের তুলনায় কাজের গতি অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক মো. সেলিম রউফের মতে, বিলম্বের পেছনে কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে। তিনি বলেন, প্রকল্পের ধরন পরিবর্তন, নতুন দরপত্র, ঠিকাদার পরিবর্তন, বর্ষা মৌসুম এবং জ্বালানি সংকটের কারণে কাজ ব্যাহত হয়েছে। তার দাবি, বর্তমান রেললাইন সচল রেখে নতুন লাইন নির্মাণ করতে হওয়ায় কাজের গতি স্বাভাবিকভাবেই ধীর। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে এবং ২০২৯ সালে নতুন লাইনে ট্রেন চলাচল শুরু করা সম্ভব হতে পারে।

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা এই দীর্ঘসূত্রিতাকে দেশের অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের একটি দীর্ঘদিনের সমস্যার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন না করেই বড় প্রকল্প শুরু করার প্রবণতা সময় ও ব্যয় উভয়ই বাড়িয়ে দেয়। তার মতে, প্রকল্প শুরুর আগে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ ও প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ না করলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর আটকে থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ করিডোরে নিয়মিত ও আধুনিক কমিউটার ট্রেন চালু করা গেলে রাজধানীর যানজট কমাতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু দীর্ঘ বিলম্বের কারণে সেই সম্ভাব্য সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা।

এক দশকের বেশি সময় ধরে চলমান এই প্রকল্প এখন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দীর্ঘসূত্রিতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিকল্পনা দুর্বলতার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত কবে বাস্তবে রূপ নেবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাঁড়াশি অভিযানে টাস্কফোর্স, গুলশানে রেস্তোরাঁকে জরিমানা

৩০ কিলোমিটার রেলপথে ১২ বছর, অর্ধেক কাজও শেষ নয়; আরও দুই বছর সময় চায় রেলওয়ে

আপডেট সময় : ০১:৫৯:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

ঢাকার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের রেল যোগাযোগ আধুনিক ও গতিশীল করার লক্ষ্যে শুরু হয়েছিল ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুয়েলগেজ ডাবল রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প। ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল মাত্র তিন বছরের মধ্যে। কিন্তু এক যুগ পেরিয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৫৭ দশমিক ২০ শতাংশ। চার দফা সময় বাড়ানোর পরও প্রকল্পটি শেষ না হওয়ায় এবার আরও দুই বছর সময় চেয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের সমান্তরালে একটি ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ’ প্রকল্পটি ২০১৪ সালের ১ জুলাই শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ৩৭৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য ছিল। পরে একাধিকবার মেয়াদ ও প্রকল্প পরিকল্পনা সংশোধনের ফলে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকায়, যা প্রায় দ্বিগুণ।

শুরুতে প্রকল্পটি শুধু নতুন একটি ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণের জন্য নেওয়া হলেও পরে বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনকেও ডুয়েলগেজে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে প্রকল্পের পরিধি বাড়ে এবং নতুন করে নকশা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়। ২০২৩ সালে সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।

প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুরু থেকেই জমি অধিগ্রহণ, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক জটিলতায় প্রকল্পটি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দুই দফা দরপত্র আহ্বানের পর ২০১৭ সালে কাজ পায় চীনের একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। তবে প্রকল্প এলাকা সময়মতো বুঝে না পাওয়ার অভিযোগ তুলে প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ সালে কাজ অসমাপ্ত রেখেই সরে যায়। তখন পর্যন্ত তারা মোট কাজের মাত্র ৪৭ শতাংশ সম্পন্ন করেছিল।

এরপর নতুন ঠিকাদার নিয়োগের জন্য আবারও দরপত্র আহ্বান করা হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারতীয় ও দেশীয় দুটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তারা মে মাসে মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করে। নতুন ঠিকাদার দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছুটা গতি এলেও প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি এখনো আশানুরূপ নয়।

প্রকল্পের আওতায় জুরাইন থেকে নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশন পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ২২টি ছোট সেতু, পাঁচটি স্টেশন ভবন, ১১টি প্ল্যাটফর্ম, ১১টি প্ল্যাটফর্ম শেড, ফুটওভার ব্রিজ, আধুনিক সংকেতব্যবস্থা এবং বিভিন্ন রেলওয়ে অবকাঠামো নির্মাণের কাজও রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বলা হয়েছে, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমান একক রেললাইন সেই চাহিদা পূরণে অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে একই লাইনে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ উভয় ধরনের ট্রেন চলাচল করতে পারবে, ফলে যাত্রী পরিবহন ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

তবে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি এখনো হতাশাজনক। মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ, আর ভৌত অগ্রগতি ৫৭ দশমিক ২০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকল্পের সময়ের তুলনায় কাজের গতি অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক মো. সেলিম রউফের মতে, বিলম্বের পেছনে কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে। তিনি বলেন, প্রকল্পের ধরন পরিবর্তন, নতুন দরপত্র, ঠিকাদার পরিবর্তন, বর্ষা মৌসুম এবং জ্বালানি সংকটের কারণে কাজ ব্যাহত হয়েছে। তার দাবি, বর্তমান রেললাইন সচল রেখে নতুন লাইন নির্মাণ করতে হওয়ায় কাজের গতি স্বাভাবিকভাবেই ধীর। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে এবং ২০২৯ সালে নতুন লাইনে ট্রেন চলাচল শুরু করা সম্ভব হতে পারে।

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা এই দীর্ঘসূত্রিতাকে দেশের অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের একটি দীর্ঘদিনের সমস্যার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন না করেই বড় প্রকল্প শুরু করার প্রবণতা সময় ও ব্যয় উভয়ই বাড়িয়ে দেয়। তার মতে, প্রকল্প শুরুর আগে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ ও প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ না করলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর আটকে থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ করিডোরে নিয়মিত ও আধুনিক কমিউটার ট্রেন চালু করা গেলে রাজধানীর যানজট কমাতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু দীর্ঘ বিলম্বের কারণে সেই সম্ভাব্য সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা।

এক দশকের বেশি সময় ধরে চলমান এই প্রকল্প এখন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দীর্ঘসূত্রিতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিকল্পনা দুর্বলতার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত কবে বাস্তবে রূপ নেবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।