বর্তমান বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগের পন্থায় হাঁটতে শুরু করেছে এবং পুলিশকে নিজেদের দলীয় লাঠিয়াল বাহিনীর মতো ব্যবহার করতে চাইছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। ঝিনাইদহে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার ওপর সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। জেলা আদালতে কী ধরনের রায় হবে, কী বিচার হবে কিংবা কে জামিন পাবে—সব কিছু এখন রিমোট কন্ট্রোলের মতো ঢাকা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। গত সোমবার (২৫ মে) সন্ধ্যা ৬টায় ঝিনাইদহ শহরের পায়রা চত্বরে স্থানীয় এনসিপি আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
গত শুক্রবার (২২ মে) ঝিনাইদহে এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপ ও বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলার জেরে এনসিপি ও জেলা ছাত্রদল পরস্পরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে ছাত্রদলের করা মামলায় পুলিশ এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক রেজাসহ তিন জনকে আটক করে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাতেই সোমবারের এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলন শেষে শহরের পায়রা চত্বর থেকে এনসিপি নেতাকর্মীদের একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয় এবং মিছিলটি শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এ সময় সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক রেজা এবং জাতীয় যুবশক্তির সাংগঠনিক সম্পাদক রিফাত রশিদসহ ঝিনাইদহ জেলা কমিটির নেতৃবৃন্দ।
সংবাদ সম্মেলনে হাসনাত আব্দুল্লাহ আরও বলেন, বর্তমান আইনমন্ত্রীর জেলা ঝিনাইদহ হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, সেখানে আজ আইন ও আদালত সরকারের একটি নির্দিষ্ট মহলের হাতে বন্দি হয়ে পড়েছে। সরকার বর্তমানে পুলিশ ও বিচার বিভাগকে নিজেদের দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্য দিয়ে পরিচালিত করছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষের আশা ছিল যে পুলিশ এবার জনগণের প্রকৃত বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠবে।
কিন্তু অত্যন্ত লজ্জাজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেদেরকে সরকারের দলীয় সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ এই ধরনের অন্যায় ও জনরোষের কারণেই ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছে। বর্তমান সরকারও যদি আওয়ামী লীগের মতো হওয়ার চেষ্টা করে, তবে দেশের মানুষ তা কখনোই মেনে নেবে না। জেল, জুলুম কিংবা নির্যাতন চালিয়ে মানুষকে কোনোভাবেই দমিয়ে রাখা যাবে না।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আজ যখন বিএনপি, এনসিপি ও জামায়াত একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত, তখন ভারতে বসে আওয়ামী লীগ হাসছে। অথচ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। ঝিনাইদহে যেভাবে অপশাসন ও বিরোধীদলীয় মত দমনের পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে, তা তুলে ধরে তিনি বলেন, গত ২২ মে মসজিদের ভেতর এবং এর কম্পাউন্ডের বাইরে এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, তারেক রেজাসহ স্থানীয় নেতাকর্মীদের ওপর নগ্ন হামলা চালানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলে যেভাবে ছাত্রলীগ-যুবলীগ হামলা চালিয়ে উল্টো মামলা দিতো, ঠিক একই পন্থায় এনসিপি, যুবশক্তি ও ছাত্রশক্তির ওপর হামলা করে আবার মামলা দেওয়া হয়েছে। এমনকি এনসিপির নেতৃবৃন্দ যখন মামলা দিতে থানায় যান, তখন ওপর থেকে রিমোট কন্ট্রোলের সবুজ সংকেত না আসা পর্যন্ত পুলিশ দীর্ঘ ৮ ঘণ্টা সময়ক্ষেপণ করে মামলা নেয়নি, অথচ ছাত্রদলের মামলা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে গ্রহণ করা হয়েছে।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, জুলাইয়ের পর একটি স্বাধীন, দল নিরপেক্ষ ও আইনানুগ পুলিশ বাহিনী গঠনের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে পুলিশ সদস্যরা খোদ প্রধানমন্ত্রীর সামনেই বক্তব্য দিচ্ছেন যে তারা একটি নির্দিষ্ট দলের চেতনায় উজ্জীবিত এবং কোনো আপস করবেন না। অথচ পুলিশ কোনো নির্দিষ্ট দল কিংবা বিএনপির হবে না, পুলিশ হবে বাংলাদেশের জনগণের। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী অতীতে বলেছিলেন যে তাঁর কাছে একটি পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু এখন স্পষ্ট যে সরকারের হাতে আসলে কোনো কার্যকর প্ল্যান নেই, বরং সরকারকে অর্ধেক হাইজ্যাক করে নিয়েছে আওয়ামী লীগ এবং বাকি অর্ধেক নানা ভাগে বিভক্ত। সরকার যদি দেশকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে চায়, তবে তাদের দ্রুত জনগণের কাছে ফিরে আসতে হবে। রাস্তায় যখন সাধারণ মানুষ নেমে আসে, তখন মিলিটারি, পুলিশ বা হেলিকপ্টার পাঠিয়েও পার পাওয়া যায় না। এভাবে চলতে থাকলে রীতি পরিবর্তনের আগেই দেশের মানুষ বিকল্প পথ বেছে নেবে। উল্লেখ্য, ছাত্রদল নেতার করা মামলায় রবিবার গ্রেফতার হওয়া এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক রেজা সোমবার সকাল ১০টায় জামিন পেয়ে জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান।
রিপোর্টারের নাম 

























