বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের যে ১০টি দেশ সবচেয়ে বেশি খাদ্যঝুঁকিতে রয়েছে, জাতিসংঘ সমর্থিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’-এ এবার বাংলাদেশের নামও সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং আরও ৪০ লাখ মানুষ জরুরি খাদ্য সংকটের মুখোমুখি। যদিও গত বছরের তুলনায় সামগ্রিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবুও দেশের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখনও উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং পুষ্টিহীনতার চরম চাপে রয়েছে।
এই ক্রমবর্ধমান খাদ্য সংকট মোকাবিলায় দেশের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি এবং এর সীমাবদ্ধতাগুলো নিচে কোনো পয়েন্ট ছাড়া বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসছে জলবায়ু পরিবর্তন ও ঘন ঘন বন্যা থেকে। এ বছরও হাওরাঞ্চলের জেলাগুলোতে (যেমন সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ) আগাম বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে চলে গেছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা। এই স্থায়ী জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু সাময়িক ত্রাণ বা খাদ্য মজুত বাড়ানো যথেষ্ট নয়, বরং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কৃষকদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন এক সংকটকালীন সময়ে সরকার আগামী বাজেটে খাদ্যে সরাসরি ভর্তুকি কমানোর পরিকল্পনা করছে, যা ওএমএস, টিসিবি বা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যদিও সরকার কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবুও সরাসরি খাদ্য সহায়তা খাতের বরাদ্দ হ্রাস নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য শঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ভর্তুকি কমানোর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকার অবশ্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে, যার আওতায় আগামী অর্থবছরে প্রায় ৩ কোটি ৬৩ লাখ মানুষকে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মতে, শুধু বরাদ্দ বা আওতা বাড়ালেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না, কারণ অতীতে দেখা গেছে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও তালিকার জটিলতার কারণে প্রকৃত দরিদ্রদের একটি বড় অংশ এই সুবিধার বাইরে থেকে যায়। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের মতে, বাংলাদেশে এখন খাদ্যের অপ্রাপ্যতার চেয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সংকট বেশি প্রকট, যার ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে প্রোটিন ও পুষ্টিকর খাবার কমিয়ে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি এড়াতে হলে জলবায়ু সহনশীল কৃষিতে বড় বিনিয়োগ, উন্নত বীজ ও সার সরবরাহ, স্থায়ী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং পুষ্টিনিরাপত্তাকে জাতীয় খাদ্যনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এনে একটি সমন্বিত ও স্বচ্ছ দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
রিপোর্টারের নাম 























