ঢাকা ০৬:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

মোবাইল ফোন ও ‘টেক্সট নেক সিনড্রোম’: ঘাড়ের ওপর নীরব চাপ

আধুনিক জীবনে মোবাইল ফোন এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। যোগাযোগ, কাজ, শিক্ষা কিংবা বিনোদন—সবকিছুতেই স্মার্টফোনের ব্যবহার এখন আকাশচুম্বী। তবে এর দীর্ঘ ও ভুল ব্যবহার আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর ফেলছে নীরব প্রভাব, যার মধ্যে অন্যতম হলো ঘাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ‘টেক্সট নেক সিনড্রোম’। বিশ্বজুড়ে ঘাড় ব্যথা এখন একটি বড় স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ঘাড় ব্যথার সমস্যায় ভোগেন। প্রতি বছর প্রায় ২০-৩০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে নেক পেইন বা ঘাড় ব্যথায় আক্রান্ত হন। আধুনিক জীবনযাপন এবং মোবাইল-কম্পিউটারের দীর্ঘ ব্যবহারের কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও এই সমস্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আমাদের মাথার স্বাভাবিক ওজন প্রায় পাঁচ-ছয় কেজি। যখন আমরা মাথা সোজা রেখে সামনে তাকাই, তখন এই ওজন সরাসরি মেরুদণ্ড বহন করে এবং ঘাড়ের পেশি ও ডিস্কের ওপর চাপ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। কিন্তু মাথা সামনের দিকে ঝুঁকলেই ‘মোমেন্ট আর্ম’ বৃদ্ধি পায় এবং ঘাড়ের পেশি ও ডিস্কের ওপর কয়েক গুণ বেশি চাপ পড়ে। বিভিন্ন গবেষণায় এর মাত্রা উঠে এসেছে:

  • ১৫ ডিগ্রি ঝুঁকলে: ঘাড়ে চাপ প্রায় ১২ কেজি
  • ৩০ ডিগ্রি ঝুঁকলে: প্রায় ১৮ কেজি
  • ৪৫ ডিগ্রি ঝুঁকলে: প্রায় ২২ কেজি
  • ৬০ ডিগ্রি ঝুঁকলে: চাপ বেড়ে প্রায় ২৫-২৭ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।

অর্থাৎ, একটি ছোট মোবাইল স্ক্রিন দেখার জন্য দীর্ঘসময় মাথা নিচু করে রাখলে ঘাড়কে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ওজন বহন করতে হয়, যা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

দীর্ঘদিন ভুল ভঙ্গিতে মোবাইল ব্যবহারের ফলে যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে—ঘাড়ে ব্যথা ও টান টান ভাব, টেনশন হেডেক (মাথাব্যথা), হাত ঝিনঝিন বা অবশ লাগা, ডিস্ক ডিজেনারেশন (নষ্ট হওয়া) বা প্রলাপ্স, সারভাইকাল স্পন্ডাইলোসিস, ঘাড়ের স্বাভাবিক বাঁক নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ মেয়াদে নার্ভে চাপ পড়া। বর্তমানে অনেক তরুণ রোগী অল্প বয়সেই ঘাড়ের ডিস্ক সমস্যা বা সারভাইকাল স্পন্ডাইলোসিস নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন, যার অন্যতম কারণ অতিরিক্ত মোবাইলের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা ও ভুল ভঙ্গি।

কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চললে এই সমস্যা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। মোবাইল ফোন চোখের সমান উচ্চতায় ধরে ব্যবহার করুন, দীর্ঘসময় মাথা নিচু করে থাকবেন না এবং প্রতি ২০-৩০ মিনিট পর ঘাড় সোজা করে বিশ্রাম নিন। মোবাইলের পর্দায় দীর্ঘ সময় একদৃষ্টিতে তাকিয়ে না থেকে বিরতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

গাজার ভেতরে ‘ইয়েলো লাইন’ সরিয়ে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার: ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ

মোবাইল ফোন ও ‘টেক্সট নেক সিনড্রোম’: ঘাড়ের ওপর নীরব চাপ

আপডেট সময় : ০১:৩৯:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

আধুনিক জীবনে মোবাইল ফোন এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। যোগাযোগ, কাজ, শিক্ষা কিংবা বিনোদন—সবকিছুতেই স্মার্টফোনের ব্যবহার এখন আকাশচুম্বী। তবে এর দীর্ঘ ও ভুল ব্যবহার আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর ফেলছে নীরব প্রভাব, যার মধ্যে অন্যতম হলো ঘাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ‘টেক্সট নেক সিনড্রোম’। বিশ্বজুড়ে ঘাড় ব্যথা এখন একটি বড় স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ঘাড় ব্যথার সমস্যায় ভোগেন। প্রতি বছর প্রায় ২০-৩০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে নেক পেইন বা ঘাড় ব্যথায় আক্রান্ত হন। আধুনিক জীবনযাপন এবং মোবাইল-কম্পিউটারের দীর্ঘ ব্যবহারের কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও এই সমস্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আমাদের মাথার স্বাভাবিক ওজন প্রায় পাঁচ-ছয় কেজি। যখন আমরা মাথা সোজা রেখে সামনে তাকাই, তখন এই ওজন সরাসরি মেরুদণ্ড বহন করে এবং ঘাড়ের পেশি ও ডিস্কের ওপর চাপ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। কিন্তু মাথা সামনের দিকে ঝুঁকলেই ‘মোমেন্ট আর্ম’ বৃদ্ধি পায় এবং ঘাড়ের পেশি ও ডিস্কের ওপর কয়েক গুণ বেশি চাপ পড়ে। বিভিন্ন গবেষণায় এর মাত্রা উঠে এসেছে:

  • ১৫ ডিগ্রি ঝুঁকলে: ঘাড়ে চাপ প্রায় ১২ কেজি
  • ৩০ ডিগ্রি ঝুঁকলে: প্রায় ১৮ কেজি
  • ৪৫ ডিগ্রি ঝুঁকলে: প্রায় ২২ কেজি
  • ৬০ ডিগ্রি ঝুঁকলে: চাপ বেড়ে প্রায় ২৫-২৭ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।

অর্থাৎ, একটি ছোট মোবাইল স্ক্রিন দেখার জন্য দীর্ঘসময় মাথা নিচু করে রাখলে ঘাড়কে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ওজন বহন করতে হয়, যা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

দীর্ঘদিন ভুল ভঙ্গিতে মোবাইল ব্যবহারের ফলে যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে—ঘাড়ে ব্যথা ও টান টান ভাব, টেনশন হেডেক (মাথাব্যথা), হাত ঝিনঝিন বা অবশ লাগা, ডিস্ক ডিজেনারেশন (নষ্ট হওয়া) বা প্রলাপ্স, সারভাইকাল স্পন্ডাইলোসিস, ঘাড়ের স্বাভাবিক বাঁক নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ মেয়াদে নার্ভে চাপ পড়া। বর্তমানে অনেক তরুণ রোগী অল্প বয়সেই ঘাড়ের ডিস্ক সমস্যা বা সারভাইকাল স্পন্ডাইলোসিস নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন, যার অন্যতম কারণ অতিরিক্ত মোবাইলের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা ও ভুল ভঙ্গি।

কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চললে এই সমস্যা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। মোবাইল ফোন চোখের সমান উচ্চতায় ধরে ব্যবহার করুন, দীর্ঘসময় মাথা নিচু করে থাকবেন না এবং প্রতি ২০-৩০ মিনিট পর ঘাড় সোজা করে বিশ্রাম নিন। মোবাইলের পর্দায় দীর্ঘ সময় একদৃষ্টিতে তাকিয়ে না থেকে বিরতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।