ঢাকা ০৫:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

রাউজানে খুনের উৎসব: রাজনৈতিক ছায়া না কি ‘দখলবাজির’ রেষারেষি?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:২৩:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

এক সময়ের ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের রাউজানে আবারও লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশক তুলনামূলক শান্ত থাকার পর গত ২১ মাসে উপজেলাটিতে অন্তত ২৩টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে ১৭ জনই সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সবশেষ রোববার রাতে কদলপুর ইউনিয়নে নাছির উদ্দিন এবং শনিবার ভোরে জঙ্গল রাউজান এলাকায় কাউসার জামান বাবলু নামে দুই যুবদল কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগেও ফেব্রুয়ারি ও জানুয়ারিতে প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হয়েছেন আরও দুই যুবদল নেতা। একের পর এক এসব হত্যাকাণ্ডে জনমনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

রাজনীতির আড়ালে আধিপত্যের লড়াই

স্থানীয় সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাউজানের এই হত্যাকাণ্ডগুলো যতটা না রাজনৈতিক আদর্শের সংঘাত, তার চেয়ে অনেক বেশি এলাকা দখল এবং অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। বিশেষ করে পাহাড়ের মাটি কাটা এবং ছড়া থেকে বালু উত্তোলন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধই এই খুনের নেপথ্য কারণ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দীর্ঘদিন এলাকাছাড়া থাকা বিএনপির অনেক নেতাকর্মী এলাকায় ফিরেছেন। তাঁদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কোন্দল শুরু হয়েছে, যা চরম আকার ধারণ করেছে। পুলিশি তদন্তে দেখা গেছে, নিহতদের অনেকেই নিজেরাও বিভিন্ন মামলার আসামি ছিলেন এবং তাঁরা এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।


আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ ও চ্যালেঞ্জ

রাউজানে খুনোখুনি বন্ধে পুলিশ ‘অপারেশন ফর দ্য পিস অব রাউজান’ নামে বিশেষ অভিযান শুরু করলেও পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি হয়নি। অভিযানে কিছু অস্ত্র উদ্ধার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূল অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নাজির আহমেদ খান জানিয়েছেন, রাউজানের ভৌগোলিক পরিবেশ এবং দ্রুত পালানোর সুযোগ অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “অপরাধী আজ না হয় কাল গ্রেপ্তার হবেই।” পুলিশ বর্তমানে সেখানে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করেছে এবং ভাড়াটে খুনি ও নির্দিষ্ট ছয়টি অপরাধী চক্রকে শনাক্ত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।


স্থানীয় ও বিশেষজ্ঞ মতামত

সচেতন নাগরিক কমিটি চট্টগ্রামের সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদারের মতে, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণেই রাউজান পুনরায় অস্থির হয়ে উঠেছে। তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিন একক আধিপত্য থাকার পর এখন ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের চেষ্টায় এই সংঘাত বাড়ছে। রাউজান থানার ওসি সাজেদুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর মামলা হয়েছে এবং সাম্প্রতিক খুনের ঘটনায় ইতিমধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের শঙ্কা, মাটি ও বালুর সিন্ডিকেট এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল নির্মূল না হলে রাউজানের রাজপথে রক্তের দাগ মোছা কঠিন হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসলামী ব্যাংকে শাবিপ্রবির ২৫ কোটি টাকা জমা, মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সুবিধা

রাউজানে খুনের উৎসব: রাজনৈতিক ছায়া না কি ‘দখলবাজির’ রেষারেষি?

আপডেট সময় : ০৪:২৩:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

এক সময়ের ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের রাউজানে আবারও লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশক তুলনামূলক শান্ত থাকার পর গত ২১ মাসে উপজেলাটিতে অন্তত ২৩টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে ১৭ জনই সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সবশেষ রোববার রাতে কদলপুর ইউনিয়নে নাছির উদ্দিন এবং শনিবার ভোরে জঙ্গল রাউজান এলাকায় কাউসার জামান বাবলু নামে দুই যুবদল কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগেও ফেব্রুয়ারি ও জানুয়ারিতে প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হয়েছেন আরও দুই যুবদল নেতা। একের পর এক এসব হত্যাকাণ্ডে জনমনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

রাজনীতির আড়ালে আধিপত্যের লড়াই

স্থানীয় সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাউজানের এই হত্যাকাণ্ডগুলো যতটা না রাজনৈতিক আদর্শের সংঘাত, তার চেয়ে অনেক বেশি এলাকা দখল এবং অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। বিশেষ করে পাহাড়ের মাটি কাটা এবং ছড়া থেকে বালু উত্তোলন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধই এই খুনের নেপথ্য কারণ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দীর্ঘদিন এলাকাছাড়া থাকা বিএনপির অনেক নেতাকর্মী এলাকায় ফিরেছেন। তাঁদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কোন্দল শুরু হয়েছে, যা চরম আকার ধারণ করেছে। পুলিশি তদন্তে দেখা গেছে, নিহতদের অনেকেই নিজেরাও বিভিন্ন মামলার আসামি ছিলেন এবং তাঁরা এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।


আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ ও চ্যালেঞ্জ

রাউজানে খুনোখুনি বন্ধে পুলিশ ‘অপারেশন ফর দ্য পিস অব রাউজান’ নামে বিশেষ অভিযান শুরু করলেও পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি হয়নি। অভিযানে কিছু অস্ত্র উদ্ধার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূল অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নাজির আহমেদ খান জানিয়েছেন, রাউজানের ভৌগোলিক পরিবেশ এবং দ্রুত পালানোর সুযোগ অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “অপরাধী আজ না হয় কাল গ্রেপ্তার হবেই।” পুলিশ বর্তমানে সেখানে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করেছে এবং ভাড়াটে খুনি ও নির্দিষ্ট ছয়টি অপরাধী চক্রকে শনাক্ত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।


স্থানীয় ও বিশেষজ্ঞ মতামত

সচেতন নাগরিক কমিটি চট্টগ্রামের সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদারের মতে, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণেই রাউজান পুনরায় অস্থির হয়ে উঠেছে। তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিন একক আধিপত্য থাকার পর এখন ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের চেষ্টায় এই সংঘাত বাড়ছে। রাউজান থানার ওসি সাজেদুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর মামলা হয়েছে এবং সাম্প্রতিক খুনের ঘটনায় ইতিমধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের শঙ্কা, মাটি ও বালুর সিন্ডিকেট এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল নির্মূল না হলে রাউজানের রাজপথে রক্তের দাগ মোছা কঠিন হবে।