বিশ্বায়ন ও আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও পরিবারের কোনো প্রবীণ সদস্যের হজযাত্রা যেন এক আবেগঘন ও বেদনাবিধুর পরিবেশ তৈরি করে। বর্তমান সময়ে অল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো গেলেও, স্বজনদের মনে অনিশ্চয়তার ছায়া থেকে যায়। বাড়ি ছাড়ার আগে হাজিরা যেমন ক্ষমা চেয়ে নেন, তেমনই মিটিয়ে দেন সব দেনা-পাওনা, কেউ কেউ করে যান শেষ অসিয়ত। এই দৃশ্যকল্প এক বা দুই শতাব্দী আগের হজযাত্রার অনিশ্চয়তা ও বন্ধুর পথকে মনে করিয়ে দেয়।
‘বাঙালি মুসলমানের হজযাত্রা; ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আদি চালচিত্র’ শীর্ষক একটি বই সেই সময়ের হজযাত্রার এক জীবন্ত চিত্র তুলে ধরেছে। বইয়ের উৎসর্গপত্রে উল্লিখিত ‘আমার বংশের পূর্বপুরুষ, শ্রী শ্রী হাজী মিঠু বেপারী, তার স্মরণে’—এই ছোট্ট তথ্যই অনেক কিছুর ইঙ্গিত দেয়। শতবর্ষ-প্রাচীন হজ ভ্রমণকাহিনিগুলোতেও একই প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা কর্তৃক রচিত একটি ভ্রমণবৃত্তান্ত ১৯১৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল, আর ইয়াসিন আলী সরকারের হজ ভ্রমণকাহিনি লেখা হয় ১৯৩০ সালে। তাদের লেখায় ফোর্ট উইলিয়ামের সংস্কৃতানুসারী বাংলা গদ্যের প্রভাব স্পষ্ট ছিল, যা তৎকালীন লেখকদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। উদাহরণস্বরূপ, মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা লিখেছেন, ‘জেদ্দা হইতে উষ্ট্রযোগে মক্কা-মোয়াজ্জামাস্থ সম্মানিত কাবা মন্দিরে গমন করিতে হয়।’ ইয়াসিন আলী সরকার তার ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘রাত্রিভর নিদ্রাদেবীর আশ্রয় পাইলাম।’ তবে, ১৯২১ সালে প্রকাশিত খান বাহাদুর আহছানউল্লাহর হেজাজ ভ্রমণ এই ধারা থেকে কিছুটা মুক্ত ছিল। বিশ শতকের প্রথমার্ধের মুসলমান লেখকদের মধ্যে বঙ্কিমীয় গদ্যভাষা ব্যবহারের প্রবণতা কেন দেখা দিত, তা একটি স্বতন্ত্র গবেষণার বিষয়।
বইটির প্রথম অধ্যায়ে কাবাঘর নির্মাণের ইতিহাস এবং হজের উৎপত্তিগত প্রেক্ষাপট সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। এতে হজের সর্বজনীনতা নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। এই অধ্যায়ের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ হলো ‘হজকোষ’, যেখানে হজ-সম্পর্কিত বিভিন্ন পরিভাষার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে বাঙালি মুসলমানদের হজযাত্রার পথ, ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, হজযাত্রীর সংখ্যা, বয়স এবং সামাজিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে, এই অংশে একটি বড় ধরনের তথ্যগত ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়েছে, যেখানে বল্লাল সেনের আমলকে ‘৬০০ শতক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 



















