ঢাকা ০৪:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬

জ্বালানি তেল ও এলপিজির দ্বিমুখী চাপে দিশেহারা ভোক্তা: সরবরাহ বৃদ্ধির ঘোষণার পরও পাম্পে দীর্ঘ সারি

দেশের জ্বালানি খাতে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে, যেখানে তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম নির্ধারণের দ্বিমুখী চাপে পিষ্ট হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা। গত ১৮ এপ্রিল বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালেও পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলের জন্য হাহাকার ও দীর্ঘ লাইন কমেনি। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার অকটেনে ২০ টাকা, পেট্রোলে ১৯ টাকা, ডিজেলে ১৫ টাকা এবং কেরোসিনে ১৮ টাকা বাড়ানো হয়েছে।

ফলে বর্তমানে প্রতি লিটার অকটেন ১২০ টাকা, ডিজেল ১১৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদিও ১৯ এপ্রিল থেকে বিপিসি ডিজেল ও পেট্রোলে ১০ শতাংশ এবং অকটেনে ২০ শতাংশ বর্ধিত বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর কোনো সুফল মিলছে না। রাজধানীর শাহবাগ, নীলক্ষেত, মতিঝিল ও তেজগাঁও এলাকার পাম্পগুলোতে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা তেলের জন্য গ্রাহকদের দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে দেখা যাচ্ছে। পাম্প মালিকদের দাবি, সরবরাহ বৃদ্ধির ঘোষণা কাগজে-কলমে থাকলেও তারা চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না এবং রেশনিংয়ের মাধ্যমে তেল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

জ্বালানি তেলের সংকটের পাশাপাশি এলপিজি গ্যাসের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। চলতি মাসেই দুই দফায় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম মোট ৫৯৯ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ ১৯ এপ্রিল বিইআরসি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে তা ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। ধানমন্ডি ও কাঁঠালবাগান এলাকার ডিলারদের দাবি, বাড়তি দামে কিনে আনার কারণে সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, ভোক্তারা অভিযোগ করেছেন যে তারা কখনোই সরকার নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস কিনতে পারছেন না এবং ক্ষেত্রবিশেষে সিলিন্ডার প্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। বিইআরসি কেবল অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালেও তদারকির অভাব স্পষ্ট।

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান যে, দেশে তেলের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। বরং ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের অবৈধ মজুতের কারণেই এই কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বিভিন্ন পাম্পের পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, গত বছরের পুরো মাসের তুলনায় এ বছরের প্রথম ১৯ দিনেই বেশি পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও জেট ফুয়েল মজুত রয়েছে এবং নতুন জাহাজও আসছে।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম সরকারের এই দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন যে, ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার মিল না থাকায় মানুষের মধ্যে অনাস্থা বাড়ছে। তার মতে, পর্যাপ্ত মজুত থাকলে পাম্পগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কেন, তা বড় প্রশ্ন। সরকারের পক্ষ থেকে ‘ফুয়েল পাস অ্যাপ’ ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মতো উদ্যোগ নেওয়া হলেও জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতা ও জনভোগান্তি থামার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

অবরোধ প্রত্যাহার করলেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা সম্ভব: ইরান

জ্বালানি তেল ও এলপিজির দ্বিমুখী চাপে দিশেহারা ভোক্তা: সরবরাহ বৃদ্ধির ঘোষণার পরও পাম্পে দীর্ঘ সারি

আপডেট সময় : ০৩:০১:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬

দেশের জ্বালানি খাতে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে, যেখানে তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম নির্ধারণের দ্বিমুখী চাপে পিষ্ট হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা। গত ১৮ এপ্রিল বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালেও পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলের জন্য হাহাকার ও দীর্ঘ লাইন কমেনি। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার অকটেনে ২০ টাকা, পেট্রোলে ১৯ টাকা, ডিজেলে ১৫ টাকা এবং কেরোসিনে ১৮ টাকা বাড়ানো হয়েছে।

ফলে বর্তমানে প্রতি লিটার অকটেন ১২০ টাকা, ডিজেল ১১৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদিও ১৯ এপ্রিল থেকে বিপিসি ডিজেল ও পেট্রোলে ১০ শতাংশ এবং অকটেনে ২০ শতাংশ বর্ধিত বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর কোনো সুফল মিলছে না। রাজধানীর শাহবাগ, নীলক্ষেত, মতিঝিল ও তেজগাঁও এলাকার পাম্পগুলোতে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা তেলের জন্য গ্রাহকদের দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে দেখা যাচ্ছে। পাম্প মালিকদের দাবি, সরবরাহ বৃদ্ধির ঘোষণা কাগজে-কলমে থাকলেও তারা চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না এবং রেশনিংয়ের মাধ্যমে তেল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

জ্বালানি তেলের সংকটের পাশাপাশি এলপিজি গ্যাসের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। চলতি মাসেই দুই দফায় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম মোট ৫৯৯ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ ১৯ এপ্রিল বিইআরসি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে তা ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। ধানমন্ডি ও কাঁঠালবাগান এলাকার ডিলারদের দাবি, বাড়তি দামে কিনে আনার কারণে সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, ভোক্তারা অভিযোগ করেছেন যে তারা কখনোই সরকার নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস কিনতে পারছেন না এবং ক্ষেত্রবিশেষে সিলিন্ডার প্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। বিইআরসি কেবল অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালেও তদারকির অভাব স্পষ্ট।

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান যে, দেশে তেলের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। বরং ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের অবৈধ মজুতের কারণেই এই কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বিভিন্ন পাম্পের পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, গত বছরের পুরো মাসের তুলনায় এ বছরের প্রথম ১৯ দিনেই বেশি পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও জেট ফুয়েল মজুত রয়েছে এবং নতুন জাহাজও আসছে।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম সরকারের এই দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন যে, ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার মিল না থাকায় মানুষের মধ্যে অনাস্থা বাড়ছে। তার মতে, পর্যাপ্ত মজুত থাকলে পাম্পগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কেন, তা বড় প্রশ্ন। সরকারের পক্ষ থেকে ‘ফুয়েল পাস অ্যাপ’ ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মতো উদ্যোগ নেওয়া হলেও জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতা ও জনভোগান্তি থামার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।