বর্তমানে দেশের জ্বালানি খাতের অস্থিরতা কেবল বৈশ্বিক সংকটের ফল নয়, বরং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা ও লুণ্ঠনমূলক মুনাফার প্রতিফলন। সরকার একের পর এক জেট ফুয়েল, এলপি গ্যাস, ফার্নেস অয়েল এবং সর্বশেষ ডিজেল-অকটেনের দাম বাড়ালেও এর সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। উল্টো সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষ, যা নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চরম ব্যর্থতা ও অনীহা প্রদর্শন করছে।
অলিগোপলি ও লুণ্ঠনমূলক রাজনৈতিক অর্থনীতি
দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘকাল ধরে এক অসাধু চক্রের কবলে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘অলিগোপলি’, যেখানে গুটিকয়েক প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান বাজারের নিয়ন্ত্রণ নেয়। নীতিনির্ধারকরা বারবার ‘ভর্তুকি কমানোর’ অজুহাত দিলেও মূলত লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও মুনাফার কাঠামোগত ফাঁকগুলো বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। অন্তর্বর্তীকালীন শ্বেতপত্র কমিটি লুণ্ঠনের যে রিপোর্ট দিয়েছিল, বর্তমান নির্বাচিত সরকার সেই কাঠামো পরিবর্তন না করে বরং আগের ফ্যাসিবাদী নীতিতেই দাম বাড়িয়ে জনগণের ওপর বোঝা চাপাচ্ছে।
লোডশেডিং ও বৈষম্য
সরকার জ্বালানি সরবরাহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি নেই বলে দাবি করলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহে চরম বৈষম্য দেখা দিচ্ছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও ক্যাপাসিটি চার্জ ও আমদানির দেনা বাড়ছে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে। এই কৃত্রিম সংকট মূলত এই খাতের ‘পাওয়ারফুল লবি’র স্বার্থ রক্ষার্থেই জিইয়ে রাখা হচ্ছে।
কয়লা উত্তোলন ও ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা
জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকার এখন দেশের মাটির নিচের কয়লার দিকে নজর দিচ্ছে। বড়পুকুরিয়া, জামালগঞ্জ ও খালাসপীর কয়লাখনিতে উন্মুক্ত বা ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সমীক্ষা ও পরিকল্পনা চলছে। তবে ২০০৬ সালের ফুলবাড়ী ও কানসাটের রক্তক্ষয়ী জনবিদ্রোহের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় যে, জনসম্মতি ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত নিলে তা রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
উত্তরণের পথ: কাঠামোগত সংস্কার
অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের মতে, এই সমস্যা ব্যক্তিনির্ভর নয়, বরং কাঠামোগত। সংকট ও জনদুর্ভোগ লাঘব করতে হলে সরকারকে কেবল আইন প্রণয়ন নয়, বরং লুণ্ঠনকারী চক্রের হাত থেকে এই খাতকে মুক্ত করতে হবে। জ্বালানি স্বনির্ভরতা আনতে হলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এই রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক সংস্কারে অবহেলা করলে সরকার বড় ধরনের জনরোষের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 





















