১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তিচুক্তি একসময় দীর্ঘ সশস্ত্র সংঘাতের অবসানের আশা জাগালেও, তিন দশক পর বর্তমান বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল ও সহিংস। একসময়ের রাষ্ট্র বনাম জনসংহতি সমিতির একক সংঘাত এখন রূপান্তরিত হয়েছে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর বহুমুখী লড়াইয়ে। রাঙ্গামাটির কুতুকছড়িতে ধর্মসিং চাকমার হত্যাকাণ্ড পাহাড়ি রাজনীতির গভীর বিভাজন, আস্থাহীনতা এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের একটি প্রতীকী উদাহরণ মাত্র। বিশিষ্ট গবেষক ও বিশ্লেষক ড. মাহফুজ পারভেজের মতে, পাহাড়ের এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের মূলে রয়েছে তিনটি প্রধান কারণ। প্রথমত, শান্তিচুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো যেমন—ভূমি কমিশন, আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতা এবং বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসন আংশিক বা অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ায় একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা নতুন নতুন সশস্ত্র উপদলের জন্ম দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, চাঁদাবাজি, কাঠ ও প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের মতো ‘ছায়া-অর্থনীতি’র ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা এখন রাজনৈতিক লক্ষ্যের চেয়েও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয়ে উঠেছে। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাথে স্থানীয় জনগণের আস্থার ঘাটতি এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিজেদের ‘রক্ষক’ হিসেবে উপস্থাপনের ফলে সাধারণ মানুষ এক ধরনের দ্বৈত চাপের মুখে ভয়ের সংস্কৃতিতে বসবাস করছে।
এই গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট থেকে উত্তরণে বর্তমান বাস্তবতায় ১৯৯৭ সালের চুক্তির কাঠামো আর যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ফেরাতে একটি ‘আপডেটেড’ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চুক্তি প্রয়োজন, যেখানে কেবল মূলধারার সংগঠন নয়, বরং বর্তমানে সক্রিয় সব পক্ষকে বহুপাক্ষিক সংলাপের আওতায় আনতে হবে। এছাড়া পাহাড়ের সংঘাত-কেন্দ্রিক অর্থনীতি ভেঙে দিয়ে স্থানীয়দের জন্য বৈধ অর্থনৈতিক সুযোগ ও বিকল্প জীবিকা নিশ্চিত করা জরুরি। নিরাপত্তা কৌশলের ক্ষেত্রে শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে সামাজিক নজরদারি, আস্থাভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং স্থানীয় নেতৃত্বের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করতে হবে। ড. মাহফুজ পারভেজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শান্তির পথ সামরিক নয় বরং রাজনৈতিক। অসম্পূর্ণ শান্তিচুক্তি ও বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা পাহাড়ে যে আগুনের জন্ম দিয়েছে, তা নেভাতে ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় কুতুকছড়ির মতো ঘটনা পাহাড়ের স্থায়ী অস্থিরতার অংশ হয়েই থেকে যাবে।
রিপোর্টারের নাম 

























