বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংরক্ষিত নারী আসন যে ভূমিকা পালন করছে, তা নারীর ক্ষমতায়ন নয়, বরং দলীয় আনুগত্যকে পুরস্কার দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট মডেল। এই ব্যবস্থা নারীকে জনগণের প্রতিনিধি না বানিয়ে, পুরুষতান্ত্রিক চিত্রনাট্যের পুতুলনাচের অংশে পরিণত করেছে। ভোটবিহীন এই আসনগুলো ক্ষমতা দেওয়ার বদলে উল্টো পুরুষতন্ত্রকেই মজবুত করছে।
ক্ষমতায়নের মডেল বনাম দলীয় আনুগত্য
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের সংসদে ঢোকার পথটি খুবই সহজ: এটি একপ্রকার ভিআইপি পাস বা সরাসরি সংসদের টিকিট, যা মেলে দলের বড় নেতাদের মনোরঞ্জন বা দলীয় আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে। একবার সংসদে ঢোকার পর তাদের কাজগুলো নির্দিষ্ট—চেয়ারম্যানের সুস্বাস্থ্য কামনা, দলের সিদ্ধান্তে বিনা প্রশ্নে হাত তুলে ‘জ্বি’ বলা এবং টকশোতে গিয়ে সংরক্ষিত আসনকে ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। অথচ জনগণের ভোট, জবাবদিহি বা নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক থাকে না।
১৯৭২ সালের সংবিধানে সংরক্ষিত নারী আসন চালুর পেছনে যৌক্তিক কারণ ছিল—যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক উপস্থিতি বাড়ানো। কিন্তু ৫০ বছর পরও সেই একই যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, যদিও এখন আসন বিতরণ হয় দলীয় অফিসে, যেন কোনো লটারি বা পুরস্কার। এই প্রক্রিয়ায় নারীরা জনগণের প্রতিনিধি না হয়ে দলের ‘বিশ্বস্ত মুখ’ হিসেবে সংসদে প্রবেশ করেন। সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের মধ্যে মাত্র ১৪ শতাংশ চাকরিজীবী, বাকিদের মধ্যে শিক্ষক, আইনজীবী বা কৃষকের সংখ্যা খুবই কম। প্রশ্ন ওঠে, তারা কি জনসমস্যা সমাধানের জন্য এসেছেন, নাকি দলীয় নেটওয়ার্কে বিনিয়োগের রিটার্ন তুলতে?
‘টোকেনিজম’ এবং সরাসরি ভোটের বিরোধ
রাজনৈতিক দলগুলো যে জুলাই সনদ স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেখানেও আগামী জাতীয় সংসদের কমপক্ষে পাঁচ শতাংশ আসনে সরাসরি নারী প্রার্থী মনোনয়নের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই সামান্য সংখ্যক আসনেও কিছু ইসলামপন্থী দলের বিরোধিতা নারী অধিকারকর্মীদের মধ্যে হতাশা জাগিয়েছে। ঐকমত্য কমিশন সংসদের ৩০০টি সরাসরি নির্বাচিত আসনের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের সুপারিশ করলেও রাজনৈতিক দলগুলো তা মানেনি।
সংবিধান সংস্কার কমিশন এবং নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সংরক্ষিত নারী আসন বাড়িয়ে ১০০ করার পাশাপাশি সেগুলো সরাসরি ভোটে নির্বাচনের প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু ঐকমত্যের সংলাপে সেই প্রস্তাবগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হতে পারেনি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার এই বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “এতে নারী রাজনৈতিক অধিকার পরাজিত হয়েছে। কেউ জয়ী হয়নি। পুরুষতন্ত্র জয়ী হয়েছে।”
অধ্যাপক রোজাবেথ মস ক্যান্টারের ‘টোকেনিজম’ তত্ত্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সংরক্ষিত আসনের চিত্র মিলে যায়। এই তত্ত্ব অনুসারে, যখন কোনো কাঠামো সংখ্যালঘুকে সীমিত জায়গা দেয়, তাদের মূলত সাজসজ্জার জন্য ব্যবহার করা হয়, নীতি তৈরির জন্য নয়। সংরক্ষিত আসনগুলোতে সংখ্যা আছে, কিন্তু সিদ্ধান্তের ক্ষমতা নেই। এখানে নারীদের প্রথম ধাপেই শেখানো হয়, বড় মন্ত্রীর চারপাশে জড়ো হয়ে ছবি তোলাই বড় কাজ।
কেন সরাসরি ভোটে আপত্তি?
রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য কমিশনের ৩৩ শতাংশ নারীকে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত করার প্রস্তাবকে “বাস্তবসম্মত নয়” বলে একসঙ্গে নাকচ করে দিয়েছে। এর কারণ স্পষ্ট—সরাসরি ভোট মানে নারী প্রার্থীরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ হবেন, যা ‘দলীয় চাটুকারিতা’ ছাড়া কাজ করতে উৎসাহিত করবে। এটা দলীয় নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ভোটবিহীন এই আসনগুলো হলো দলীয় আনুগত্যের পুরস্কার বা ‘দলীয় দয়া আসন’। অনেক সংরক্ষিত আসনের এমপির নাম শুনে স্থানীয়রা অবাক হন, কারণ তারা জনগণের ভোটে আসেননি। তাদের সংসদীয় কাজ পরিণত হয়েছে ‘অফিস টাইম’-এর মতো—সংসদে ঢোকা, দলের পক্ষে ভোট দেওয়া, প্রশংসা করা এবং বাকি সময় নীরবতা পালন করা। প্রশ্ন তোলা বা দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়া তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ তাদের আসন ভোট নয়, দলীয় পাস।
রুয়ান্ডা (৬১% নারী সংসদ সদস্য, ভোটে নির্বাচিত), নরওয়ে (৪০% নারী প্রার্থী বাধ্যতামূলক), নেপাল (এক-তৃতীয়াংশ নারী এমপি বাধ্যতামূলক) এবং তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলো দেখিয়ে দিয়েছে যে নারীর ক্ষমতায়ন করুণা নয়, বরং কাঠামোগত পরিবর্তন ও সরাসরি ভোটের মাধ্যমে সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশে নারীরা ‘দলীয় ব্যাকডোর’ দিয়ে সংসদে প্রবেশ করেন—যা ক্ষমতায়ন নয়, নির্ভরশীলতাই মুখ্য করে তোলে। শেষ পর্যন্ত, সংরক্ষিত নারী আসনের মাধ্যমে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার দুর্গ অক্ষত থাকে, আর নারীর অবস্থান হয় সাজসজ্জার শোপিস হিসেবে।
রিপোর্টারের নাম 

























