ঢাকা ০২:১৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সার্ভে স্কুল থেকে বুয়েট: প্রকৌশল শিক্ষার প্রসারে নওয়াব সলিমুল্লাহর অবিস্মরণীয় অবদান

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৩২:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২৫ বার পড়া হয়েছে

দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তিপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তবে এই সুবিশাল প্রতিষ্ঠানের বর্তমান রূপের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ইতিহাস এবং ঢাকার নওয়াব পরিবারের অনন্য ত্যাগ ও বদান্যতা। উনিশ শতকের শেষার্ধে একটি সাধারণ সার্ভে স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আজকের পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।

১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে ভূমি জরিপ কাজে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে পুরান ঢাকার নলগোলায় একটি ভাড়া বাড়িতে ‘ঢাকা সার্ভে স্কুল’ প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে মাত্র ৩৫ জন ছাত্র নিয়ে বাংলা মাধ্যমে এই স্কুলের পাঠদান চলত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কারিগরি শিক্ষার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯ শতকের শেষ দিকে এই স্কুলটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে উন্নীত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার মি. সেভেজ ১৮৯৯ সালে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব দিলেও অর্থসংকটে তা থমকে যায়। ১৯০১ সালে মহারানী ভিক্টোরিয়ার মৃত্যু পরবর্তী এক শোকসভায় পুনরায় বিষয়টি আলোচনায় আসে। তৎকালীন প্রশাসন স্কুলটিকে উন্নীত করার জন্য ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করে। সরকার মাত্র ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাকি ১ লক্ষ টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব পড়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ওপর। কিন্তু সাধারণের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সাড়া না পাওয়ায় প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

এমন এক সংকটময় মুহূর্তে ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে আসেন নওয়াব খাজা আহসানুল্লাহ। তিনি প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। তবে ১৯০১ সালের ডিসেম্বরে তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে অর্থায়ন নিয়ে আবারও জটিলতা তৈরি হয়। নওয়াব এস্টেটের আর্থিক অবস্থা তখন খুব একটা স্বচ্ছল ছিল না, ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও দ্বিধা দেখা দেয়। কিন্তু পিতার দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অনড় থাকেন নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহ। ১৯০২ সালের এপ্রিলে তিনি ধার-কর্জ করে ১ লক্ষ ১২ হাজার টাকা সরকারের হাতে তুলে দেন। নওয়াব পরিবারের এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয় ‘আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল’।

১৯০২ সালের ২২ জুলাই বঙ্গদেশের ছোটলাট স্যার জন উডবার্ন এই স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯০৪ সাল থেকে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পাঠ্যসূচি অনুযায়ী এখানে তিন বছর মেয়াদী ওভারশিয়র কোর্স চালু হয়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেলে ব্রিটিশ সরকার এই স্কুলের মানোন্নয়নে বিশেষ নজর দেয়। বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট মি. আর্নল্ডকে এর প্রথম হেডমাস্টার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯০৬ সালে নলগোলার পুরনো ক্যাম্পাস থেকে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের দক্ষিণাংশে নবনির্মিত নিজস্ব ভবনে স্থানান্তরিত হয়।

পরবর্তীতে ১৯২০ সালে স্কুলটি জনশিক্ষা পরিচালকের অধীনে আসে এবং এর প্রধান পদটি ‘অধ্যক্ষ’ হিসেবে উন্নীত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে শিল্পায়নের প্রয়োজনে দক্ষ প্রকৌশলীর চাহিদা বাড়লে ১৯৪৬-৪৭ শিক্ষাবর্ষে এটি ‘আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ১৯৫৮ সালে ছাত্রদের আবাসনের জন্য নির্মিত হয় ‘ভিল নিউ হোস্টেল’, যা পরবর্তীতে নওয়াবের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘আহসানুল্লাহ হল’ নামকরণ করা হয়।

অবশেষে ১৯৬২ সালের ১ জুন এই কলেজটি একটি পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় এবং নাম দেওয়া হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়’। স্বাধীনতার পর যা আজকের গৌরবময় ‘বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়’ বা বুয়েট। আজ যেখানে হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী প্রকৌশল বিদ্যায় শিক্ষিত হচ্ছে, তার মূলে রয়েছে নওয়াব সলিমুল্লাহর সেই দূরদর্শী চিন্তা ও পিতার প্রতিশ্রুতির প্রতি অটল সম্মান। নওয়াব পরিবারের সেই উদারতা ছাড়া হয়তো আজকের এই বুয়েট প্রতিষ্ঠা পাওয়া অসম্ভব ছিল।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

সার্ভে স্কুল থেকে বুয়েট: প্রকৌশল শিক্ষার প্রসারে নওয়াব সলিমুল্লাহর অবিস্মরণীয় অবদান

আপডেট সময় : ০২:৩২:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তিপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তবে এই সুবিশাল প্রতিষ্ঠানের বর্তমান রূপের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ইতিহাস এবং ঢাকার নওয়াব পরিবারের অনন্য ত্যাগ ও বদান্যতা। উনিশ শতকের শেষার্ধে একটি সাধারণ সার্ভে স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আজকের পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।

১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে ভূমি জরিপ কাজে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে পুরান ঢাকার নলগোলায় একটি ভাড়া বাড়িতে ‘ঢাকা সার্ভে স্কুল’ প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে মাত্র ৩৫ জন ছাত্র নিয়ে বাংলা মাধ্যমে এই স্কুলের পাঠদান চলত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কারিগরি শিক্ষার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯ শতকের শেষ দিকে এই স্কুলটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে উন্নীত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার মি. সেভেজ ১৮৯৯ সালে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব দিলেও অর্থসংকটে তা থমকে যায়। ১৯০১ সালে মহারানী ভিক্টোরিয়ার মৃত্যু পরবর্তী এক শোকসভায় পুনরায় বিষয়টি আলোচনায় আসে। তৎকালীন প্রশাসন স্কুলটিকে উন্নীত করার জন্য ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করে। সরকার মাত্র ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাকি ১ লক্ষ টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব পড়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ওপর। কিন্তু সাধারণের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সাড়া না পাওয়ায় প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

এমন এক সংকটময় মুহূর্তে ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে আসেন নওয়াব খাজা আহসানুল্লাহ। তিনি প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। তবে ১৯০১ সালের ডিসেম্বরে তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে অর্থায়ন নিয়ে আবারও জটিলতা তৈরি হয়। নওয়াব এস্টেটের আর্থিক অবস্থা তখন খুব একটা স্বচ্ছল ছিল না, ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও দ্বিধা দেখা দেয়। কিন্তু পিতার দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অনড় থাকেন নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহ। ১৯০২ সালের এপ্রিলে তিনি ধার-কর্জ করে ১ লক্ষ ১২ হাজার টাকা সরকারের হাতে তুলে দেন। নওয়াব পরিবারের এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয় ‘আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল’।

১৯০২ সালের ২২ জুলাই বঙ্গদেশের ছোটলাট স্যার জন উডবার্ন এই স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯০৪ সাল থেকে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পাঠ্যসূচি অনুযায়ী এখানে তিন বছর মেয়াদী ওভারশিয়র কোর্স চালু হয়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেলে ব্রিটিশ সরকার এই স্কুলের মানোন্নয়নে বিশেষ নজর দেয়। বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট মি. আর্নল্ডকে এর প্রথম হেডমাস্টার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯০৬ সালে নলগোলার পুরনো ক্যাম্পাস থেকে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের দক্ষিণাংশে নবনির্মিত নিজস্ব ভবনে স্থানান্তরিত হয়।

পরবর্তীতে ১৯২০ সালে স্কুলটি জনশিক্ষা পরিচালকের অধীনে আসে এবং এর প্রধান পদটি ‘অধ্যক্ষ’ হিসেবে উন্নীত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে শিল্পায়নের প্রয়োজনে দক্ষ প্রকৌশলীর চাহিদা বাড়লে ১৯৪৬-৪৭ শিক্ষাবর্ষে এটি ‘আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ১৯৫৮ সালে ছাত্রদের আবাসনের জন্য নির্মিত হয় ‘ভিল নিউ হোস্টেল’, যা পরবর্তীতে নওয়াবের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘আহসানুল্লাহ হল’ নামকরণ করা হয়।

অবশেষে ১৯৬২ সালের ১ জুন এই কলেজটি একটি পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় এবং নাম দেওয়া হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়’। স্বাধীনতার পর যা আজকের গৌরবময় ‘বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়’ বা বুয়েট। আজ যেখানে হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী প্রকৌশল বিদ্যায় শিক্ষিত হচ্ছে, তার মূলে রয়েছে নওয়াব সলিমুল্লাহর সেই দূরদর্শী চিন্তা ও পিতার প্রতিশ্রুতির প্রতি অটল সম্মান। নওয়াব পরিবারের সেই উদারতা ছাড়া হয়তো আজকের এই বুয়েট প্রতিষ্ঠা পাওয়া অসম্ভব ছিল।