ঢাকা ০২:১৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজদণ্ড যখন আধ্যাত্মিকতার চরণে: নবাব সলিমুল্লাহ ও হাকিমুল উম্মতের সেই ঐতিহাসিক মিলন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৩৩:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২৯ বার পড়া হয়েছে

বিশ শতকের শুরুর লগ্ন। অবিভক্ত ভারতবর্ষ তখন উত্তাল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্যদিকে মুসলিম উম্মাহর আত্মপরিচয় সংকটের সন্ধিক্ষণ। ঠিক সেই সময়ে বাংলার ইতিহাসে রচিত হয়েছিল এক অনন্য অধ্যায়। একদিকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ঢাকার প্রতাপশালী নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ বাহাদুর, আর অন্যদিকে আধ্যাত্মিক জগতের প্রদীপ্ত নক্ষত্র ‘হাকিমুল উম্মত’ মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)। ১৯০৯ সালের নভেম্বরে এই দুই মহাপ্রাণের মহামিলনের সাক্ষী হয়েছিল মোগল ঐতিহ্যের শহর ঢাকা। আভিজাত্য আর আধ্যাত্মিকতার সেই বিরল মেলবন্ধনের প্রভাব আজও বাংলার ইতিহাসে অম্লান।

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ছিলেন স্বভাবগতভাবেই প্রচারবিমুখ ও নির্জনতাপ্রিয় এক সাধক। জনসমাগম কিংবা পার্থিব জাঁকজমক থেকে তিনি সবসময় নিজেকে দূরে রাখতেন। তার জীবনীকারদের মতে, দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য আমন্ত্রণ এলেও রুটিনমাফিক ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির কাজে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কায় তিনি সফর এড়িয়ে চলতেন। তবে উম্মাহর সংশোধন ও দ্বীনের দাওয়াতের প্রয়োজনে তিনি মাঝেমধ্যে বের হতেন। নবাব সলিমুল্লাহর গভীর অনুরাগ ও বারবার করা অনুরোধের প্রেক্ষিতে তিনি শেষ পর্যন্ত ঢাকা সফরে রাজি হন। তবে একজন শাসকের আমন্ত্রণে সাড়া দিলেও তিনি জুড়ে দিয়েছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও নীতিগত কিছু শর্ত।

থানভী (রহ.)-এর শর্তগুলোর মধ্যে ছিল—সফরের বিনিময়ে কোনো অর্থ বা উপঢৌকন গ্রহণ করবেন না; নবাবের সাথে সাক্ষাতের সময় কোনো তৃতীয় পক্ষ থাকতে পারবে না; রাজপ্রাসাদের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের সহজ যাতায়াতযোগ্য কোনো স্থানে তার থাকার ব্যবস্থা করতে হবে এবং কোনো বিশেষ বিষয়ে ওয়াজ করার জন্য তাকে বাধ্য করা যাবে না। ধর্মপ্রাণ ও আলেমভক্ত নবাব সলিমুল্লাহ কোনো দ্বিধা ছাড়াই এই শর্তগুলো মেনে নিয়েছিলেন।

নবাব সলিমুল্লাহর ইচ্ছা ছিল ব্রিটিশ ভাইসরয়দের মতো রাজকীয় প্রটোকলে মাওলানা থানভীকে বরণ করে নেওয়ার। রেলস্টেশনে মখমলের কার্পেট আর ব্যান্ডপার্টির আয়োজনের প্রস্তুতিও প্রায় সম্পন্ন ছিল। কিন্তু এই খবর শোনামাত্রই মাওলানা থানভী কড়া ভাষায় জানিয়ে দেন, শরিয়তবিরোধী কোনো আয়োজন করা হলে তিনি সফর বাতিল করবেন। শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত সাদামাটাভাবে তিনি ঢাকায় পদার্পণ করেন। তবে কোনো আনুষ্ঠানিকতা না থাকলেও স্টেশনে প্রিয় নেতা ও আধ্যাত্মিক পুরুষকে দেখতে মানুষের ঢল নেমেছিল। নবাব সলিমুল্লাহ নিজেও স্টেশনে উপস্থিত ছিলেন এবং বিনয় ও শিষ্টাচারের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে হুজুরের গাড়ির পেছনে অন্য একটি সাধারণ গাড়িতে চড়ে তাকে অনুসরণ করেন।

ঢাকায় অবস্থানকালে নবাব সলিমুল্লাহ নিজেই মাওলানার খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। শাহি দস্তরখানে খাবার পরিবেশনের সময় নবাব সলিমুল্লাহ অত্যন্ত বিনয়ের সাথে প্রতিটি পদের পরিচয় দিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে মাওলানা থানভী তার স্বভাবসুলভ রসবোধের মাধ্যমে নবাবকে বুঝিয়ে দেন যে, খাবারের নামের চেয়ে স্বাদ ও তৃপ্তিই মুখ্য। শাসকের দম্ভ যেখানে তুচ্ছ হয়ে আধ্যাত্মিকতার কাছে নতি স্বীকার করেছিল, সেই দৃশ্য ছিল অভাবনীয়।

সফরের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল নবাব সলিমুল্লাহর ‘বাইআত’ বা শিষ্যত্ব গ্রহণের আকুতি। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা একজন নবাব যখন মুরিদ হওয়ার আবেদন জানালেন, তখন মাওলানা থানভী (রহ.) অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, পীর বা আধ্যাত্মিক গুরুকে অনেক সময় তার শিষ্যের ভুল সংশোধনে কঠোর হতে হয়, যা একজন প্রভাবশালী শাসকের ক্ষেত্রে সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে। তবে নবাব এতে ক্ষুণ্ণ হননি, বরং মাওলানার প্রতি তার শ্রদ্ধা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। আমৃত্যু চিঠিপত্রের মাধ্যমে তিনি মাওলানার পরামর্শ নিতেন এবং নিজেকে ‘আপনার মুরিদ সলিমুল্লাহ’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে ধন্য মনে করতেন।

হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর সেই ঢাকা সফর কেবল একটি ভ্রমণ ছিল না; বরং এটি ছিল বাংলার মুসলিম সমাজের চেতনা পরিবর্তনের এক শক্তিশালী অনুঘটক। নবাব সলিমুল্লাহর মতো প্রভাবশালীদের মাঝে দ্বীনি মূল্যবোধের যে বীজ তিনি বুনে দিয়েছিলেন, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাবেই পরবর্তীতে এই অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ঘটে। ইতিহাসের সেই সোনালি অধ্যায় আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের আভিজাত্য ক্ষমতার দম্ভে নয়, বরং আধ্যাত্মিকতা ও বিনয়ের মাঝেই নিহিত।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

রাজদণ্ড যখন আধ্যাত্মিকতার চরণে: নবাব সলিমুল্লাহ ও হাকিমুল উম্মতের সেই ঐতিহাসিক মিলন

আপডেট সময় : ০২:৩৩:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

বিশ শতকের শুরুর লগ্ন। অবিভক্ত ভারতবর্ষ তখন উত্তাল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্যদিকে মুসলিম উম্মাহর আত্মপরিচয় সংকটের সন্ধিক্ষণ। ঠিক সেই সময়ে বাংলার ইতিহাসে রচিত হয়েছিল এক অনন্য অধ্যায়। একদিকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ঢাকার প্রতাপশালী নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ বাহাদুর, আর অন্যদিকে আধ্যাত্মিক জগতের প্রদীপ্ত নক্ষত্র ‘হাকিমুল উম্মত’ মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)। ১৯০৯ সালের নভেম্বরে এই দুই মহাপ্রাণের মহামিলনের সাক্ষী হয়েছিল মোগল ঐতিহ্যের শহর ঢাকা। আভিজাত্য আর আধ্যাত্মিকতার সেই বিরল মেলবন্ধনের প্রভাব আজও বাংলার ইতিহাসে অম্লান।

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ছিলেন স্বভাবগতভাবেই প্রচারবিমুখ ও নির্জনতাপ্রিয় এক সাধক। জনসমাগম কিংবা পার্থিব জাঁকজমক থেকে তিনি সবসময় নিজেকে দূরে রাখতেন। তার জীবনীকারদের মতে, দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য আমন্ত্রণ এলেও রুটিনমাফিক ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির কাজে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কায় তিনি সফর এড়িয়ে চলতেন। তবে উম্মাহর সংশোধন ও দ্বীনের দাওয়াতের প্রয়োজনে তিনি মাঝেমধ্যে বের হতেন। নবাব সলিমুল্লাহর গভীর অনুরাগ ও বারবার করা অনুরোধের প্রেক্ষিতে তিনি শেষ পর্যন্ত ঢাকা সফরে রাজি হন। তবে একজন শাসকের আমন্ত্রণে সাড়া দিলেও তিনি জুড়ে দিয়েছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও নীতিগত কিছু শর্ত।

থানভী (রহ.)-এর শর্তগুলোর মধ্যে ছিল—সফরের বিনিময়ে কোনো অর্থ বা উপঢৌকন গ্রহণ করবেন না; নবাবের সাথে সাক্ষাতের সময় কোনো তৃতীয় পক্ষ থাকতে পারবে না; রাজপ্রাসাদের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের সহজ যাতায়াতযোগ্য কোনো স্থানে তার থাকার ব্যবস্থা করতে হবে এবং কোনো বিশেষ বিষয়ে ওয়াজ করার জন্য তাকে বাধ্য করা যাবে না। ধর্মপ্রাণ ও আলেমভক্ত নবাব সলিমুল্লাহ কোনো দ্বিধা ছাড়াই এই শর্তগুলো মেনে নিয়েছিলেন।

নবাব সলিমুল্লাহর ইচ্ছা ছিল ব্রিটিশ ভাইসরয়দের মতো রাজকীয় প্রটোকলে মাওলানা থানভীকে বরণ করে নেওয়ার। রেলস্টেশনে মখমলের কার্পেট আর ব্যান্ডপার্টির আয়োজনের প্রস্তুতিও প্রায় সম্পন্ন ছিল। কিন্তু এই খবর শোনামাত্রই মাওলানা থানভী কড়া ভাষায় জানিয়ে দেন, শরিয়তবিরোধী কোনো আয়োজন করা হলে তিনি সফর বাতিল করবেন। শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত সাদামাটাভাবে তিনি ঢাকায় পদার্পণ করেন। তবে কোনো আনুষ্ঠানিকতা না থাকলেও স্টেশনে প্রিয় নেতা ও আধ্যাত্মিক পুরুষকে দেখতে মানুষের ঢল নেমেছিল। নবাব সলিমুল্লাহ নিজেও স্টেশনে উপস্থিত ছিলেন এবং বিনয় ও শিষ্টাচারের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে হুজুরের গাড়ির পেছনে অন্য একটি সাধারণ গাড়িতে চড়ে তাকে অনুসরণ করেন।

ঢাকায় অবস্থানকালে নবাব সলিমুল্লাহ নিজেই মাওলানার খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। শাহি দস্তরখানে খাবার পরিবেশনের সময় নবাব সলিমুল্লাহ অত্যন্ত বিনয়ের সাথে প্রতিটি পদের পরিচয় দিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে মাওলানা থানভী তার স্বভাবসুলভ রসবোধের মাধ্যমে নবাবকে বুঝিয়ে দেন যে, খাবারের নামের চেয়ে স্বাদ ও তৃপ্তিই মুখ্য। শাসকের দম্ভ যেখানে তুচ্ছ হয়ে আধ্যাত্মিকতার কাছে নতি স্বীকার করেছিল, সেই দৃশ্য ছিল অভাবনীয়।

সফরের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল নবাব সলিমুল্লাহর ‘বাইআত’ বা শিষ্যত্ব গ্রহণের আকুতি। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা একজন নবাব যখন মুরিদ হওয়ার আবেদন জানালেন, তখন মাওলানা থানভী (রহ.) অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, পীর বা আধ্যাত্মিক গুরুকে অনেক সময় তার শিষ্যের ভুল সংশোধনে কঠোর হতে হয়, যা একজন প্রভাবশালী শাসকের ক্ষেত্রে সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে। তবে নবাব এতে ক্ষুণ্ণ হননি, বরং মাওলানার প্রতি তার শ্রদ্ধা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। আমৃত্যু চিঠিপত্রের মাধ্যমে তিনি মাওলানার পরামর্শ নিতেন এবং নিজেকে ‘আপনার মুরিদ সলিমুল্লাহ’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে ধন্য মনে করতেন।

হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর সেই ঢাকা সফর কেবল একটি ভ্রমণ ছিল না; বরং এটি ছিল বাংলার মুসলিম সমাজের চেতনা পরিবর্তনের এক শক্তিশালী অনুঘটক। নবাব সলিমুল্লাহর মতো প্রভাবশালীদের মাঝে দ্বীনি মূল্যবোধের যে বীজ তিনি বুনে দিয়েছিলেন, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাবেই পরবর্তীতে এই অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ঘটে। ইতিহাসের সেই সোনালি অধ্যায় আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের আভিজাত্য ক্ষমতার দম্ভে নয়, বরং আধ্যাত্মিকতা ও বিনয়ের মাঝেই নিহিত।