ঢাকা ১২:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

সংসদের সাউন্ড সিস্টেম বিপর্যয়: নেপথ্যে শত কোটির দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের জাল

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৩৯:৫২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
  • ২২ বার পড়া হয়েছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সাউন্ড সিস্টেমের নজিরবিহীন বিপর্যয় সংসদীয় কার্যক্রমে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে একে সাধারণ যান্ত্রিক ত্রুটি মনে করা হলেও, অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে ভয়াবহ সব তথ্য। এই সিস্টেম স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম, দুর্নীতি এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। এই নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় সংসদ কর্তৃপক্ষ পৃথক দুটি তদন্ত শুরু করেছে।

দুর্নীতির নেপথ্যে ‘রাজনৈতিক দাপট’ ও সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট এই সাউন্ড সিস্টেম প্রকল্পকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছিল। বিশেষ করে কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের সিইও জাহিদুর রহিম জোয়ারদারের বিরুদ্ধে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক শ্রেণির প্রকৌশলীর যোগসাজশে কয়েকশ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। জাহিদুর রহিম সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ভায়রা ভাই পরিচয় দিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখাতেন। তিনি দীর্ঘদিন সংসদের প্ল্যানারি হলের ‘সাইমালটেনিয়াস ইন্টারপ্রেটেশন সিস্টেম’ (এসআইএস) এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন।

অনিয়মের পাহাড় ও ওভার ইনভয়েসিং
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংসদের সাউন্ড সিস্টেম আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি মেরামতের নামেও নতুন করে দুর্নীতির ফাঁদ পাতা হয়েছিল।

  • অতিরিক্ত প্রাক্কলন: সাউন্ড সিস্টেম মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রায় চার কোটি টাকার একটি উচ্চমূল্যের প্রাক্কলন জমা দিয়েছিল জাহিদুর রহিমের প্রতিষ্ঠান। এমনকি প্রকৌশলীদের আসা-যাওয়া ও সম্মানী বাবদই ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকার আবেদন করা হয়েছিল।
  • ভুল স্পেসিফিকেশন: বর্তমান চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, সাউন্ড সিস্টেমের সরঞ্জাম ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ৩৮ গ্রামের হেডফোন দেওয়ার কথা থাকলেও সরবরাহ করা হয়েছে ২৫৮ গ্রামের ভারি হেডফোন, যা ব্যবহার করতে সংসদ সদস্যরা শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
  • পুরোনো প্রযুক্তির ব্যবহার: অভিযোগ রয়েছে, যে মডেলের সিস্টেম বর্তমানে উৎপাদনই হয় না, সেই পুরোনো সিস্টেম মেরামতের নামে সরকারি অর্থ আত্মসাতের পাঁয়তারা চালানো হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধান ও নথিপত্র তলব
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই প্রকল্পের টেন্ডার, বাজার যাচাই প্রতিবেদন, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং বিল পরিশোধের ভাউচারসহ চার ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র চেয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে দফায় দফায় চিঠি দিয়েছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে কয়েকবার চিঠি দেওয়ার পরও গণপূর্ত অধিদপ্তর নথি হস্তান্তরে গড়িমসি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার দায়ে নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে বদলি করা হয়েছে এবং আরও কয়েকজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আজ ১৬ এপ্রিল সকালে জাহিদুর রহিম জোয়ারদারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদক কার্যালয়ে তলব করা হয়েছে।

সংসদ অধিবেশনে অচলাবস্থা
সাউন্ড সিস্টেমের এই শোচনীয় অবস্থার কারণে সংসদ সদস্যদের বক্তব্য বারবার ব্যাহত হচ্ছে এবং একাধিকবার অধিবেশন মুলতবি করতে হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে অধিবেশন শুরু হতে আধা ঘণ্টা বিলম্ব হয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০২২ সালে এই সিস্টেম স্থাপনের সময় কোনো ওয়ারেন্টি বা দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতার শর্ত রাখা হয়নি, যা অত্যন্ত দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয়। বর্তমানে বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে এই পুরো সিস্টেমটি নতুন করে ঢেলে সাজানোর কথা ভাবা হচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

মরণফাঁদ লেভেল ক্রসিং: অব্যবস্থাপনা ও প্রাণের ঝুঁকি

সংসদের সাউন্ড সিস্টেম বিপর্যয়: নেপথ্যে শত কোটির দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের জাল

আপডেট সময় : ১০:৩৯:৫২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সাউন্ড সিস্টেমের নজিরবিহীন বিপর্যয় সংসদীয় কার্যক্রমে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে একে সাধারণ যান্ত্রিক ত্রুটি মনে করা হলেও, অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে ভয়াবহ সব তথ্য। এই সিস্টেম স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম, দুর্নীতি এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। এই নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় সংসদ কর্তৃপক্ষ পৃথক দুটি তদন্ত শুরু করেছে।

দুর্নীতির নেপথ্যে ‘রাজনৈতিক দাপট’ ও সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট এই সাউন্ড সিস্টেম প্রকল্পকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছিল। বিশেষ করে কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের সিইও জাহিদুর রহিম জোয়ারদারের বিরুদ্ধে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক শ্রেণির প্রকৌশলীর যোগসাজশে কয়েকশ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। জাহিদুর রহিম সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ভায়রা ভাই পরিচয় দিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখাতেন। তিনি দীর্ঘদিন সংসদের প্ল্যানারি হলের ‘সাইমালটেনিয়াস ইন্টারপ্রেটেশন সিস্টেম’ (এসআইএস) এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন।

অনিয়মের পাহাড় ও ওভার ইনভয়েসিং
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংসদের সাউন্ড সিস্টেম আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি মেরামতের নামেও নতুন করে দুর্নীতির ফাঁদ পাতা হয়েছিল।

  • অতিরিক্ত প্রাক্কলন: সাউন্ড সিস্টেম মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রায় চার কোটি টাকার একটি উচ্চমূল্যের প্রাক্কলন জমা দিয়েছিল জাহিদুর রহিমের প্রতিষ্ঠান। এমনকি প্রকৌশলীদের আসা-যাওয়া ও সম্মানী বাবদই ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকার আবেদন করা হয়েছিল।
  • ভুল স্পেসিফিকেশন: বর্তমান চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, সাউন্ড সিস্টেমের সরঞ্জাম ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ৩৮ গ্রামের হেডফোন দেওয়ার কথা থাকলেও সরবরাহ করা হয়েছে ২৫৮ গ্রামের ভারি হেডফোন, যা ব্যবহার করতে সংসদ সদস্যরা শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
  • পুরোনো প্রযুক্তির ব্যবহার: অভিযোগ রয়েছে, যে মডেলের সিস্টেম বর্তমানে উৎপাদনই হয় না, সেই পুরোনো সিস্টেম মেরামতের নামে সরকারি অর্থ আত্মসাতের পাঁয়তারা চালানো হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধান ও নথিপত্র তলব
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই প্রকল্পের টেন্ডার, বাজার যাচাই প্রতিবেদন, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং বিল পরিশোধের ভাউচারসহ চার ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র চেয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে দফায় দফায় চিঠি দিয়েছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে কয়েকবার চিঠি দেওয়ার পরও গণপূর্ত অধিদপ্তর নথি হস্তান্তরে গড়িমসি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার দায়ে নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে বদলি করা হয়েছে এবং আরও কয়েকজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আজ ১৬ এপ্রিল সকালে জাহিদুর রহিম জোয়ারদারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদক কার্যালয়ে তলব করা হয়েছে।

সংসদ অধিবেশনে অচলাবস্থা
সাউন্ড সিস্টেমের এই শোচনীয় অবস্থার কারণে সংসদ সদস্যদের বক্তব্য বারবার ব্যাহত হচ্ছে এবং একাধিকবার অধিবেশন মুলতবি করতে হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে অধিবেশন শুরু হতে আধা ঘণ্টা বিলম্ব হয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০২২ সালে এই সিস্টেম স্থাপনের সময় কোনো ওয়ারেন্টি বা দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতার শর্ত রাখা হয়নি, যা অত্যন্ত দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয়। বর্তমানে বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে এই পুরো সিস্টেমটি নতুন করে ঢেলে সাজানোর কথা ভাবা হচ্ছে।