ঢাকা ০২:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

দুই এনজিওর হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ: সাবেক এসবি প্রধান মনিরুলের দুর্নীতির পাহাড়

পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি আর্থিক অনিয়ম ও অর্থপাচারের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জঙ্গি অর্থায়নের মিথ্যা অভিযোগ তুলে দুটি ইসলামি এনজিওর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন তিনি। জুলাই বিপ্লবের পর ভারতে পালিয়ে যাওয়া এই প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তার দুর্নীতির অনুসন্ধান প্রায় শেষ পর্যায়ে এনেছে দুদক।

রোহিঙ্গাদের সহায়তায় আসা অনুদানের টাকা আত্মসাৎ করে নিজের স্ত্রী, শ্যালক ও শ্যালিকার নামে পাচার করেছেন মনিরুল। দুদকের তথ্যমতে, এই অর্থ দিয়ে তিনি ও তার পরিবার দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের নভেম্বরে কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ (কেএসআর) ও শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল নামের দুটি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এনজিওর ওপর প্রভাব বিস্তার করেন মনিরুল। প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মকর্তাদের জঙ্গি হিসেবে গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে তিনি সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেন। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এনজিও দুটির ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৮৬৯ কোটি টাকা জমা হয়, যার সিংহভাগই জালিয়াতির মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছে। এই অর্থ মনিরুলের শ্যালক রেজাউল আলম শাহীনের প্রতিষ্ঠান ‘এস এস এন্টারপ্রাইজ’ সহ বিভিন্ন নিকটাত্মীয়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে।

তদন্তে আরও দেখা গেছে, মনিরুলের স্ত্রী ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব সায়লা ফারজানার নামে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। সায়লার নামে ২০২০ সালে একটি ব্যাংক হিসাবেই প্রায় ১২ কোটি টাকা লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। শুধু তাই নয়, মনিরুল ও তার স্ত্রীর নামে বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৩৫টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের সন্ধান পেয়েছে দুদক। এছাড়া শ্যালক শাহীনের ১১টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ২৮৮ কোটি টাকা জমার তথ্য পাওয়া গেছে। দুদক বলছে, নিজের অপরাধ ঢাকতে মনিরুল নিজের নামে অ্যাকাউন্ট না খুলে পরিবারের সদস্যদের ব্যবহার করে মানিলন্ডারিং করেছেন।

সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা বর্তমানে সস্ত্রীক ভারতের ত্রিপুরার একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে। জুলাই বিপ্লবের পর তিনি হেলিকপ্টারে করে ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেন এবং পরে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পালিয়ে যান। এসবি প্রধান থাকাকালে ক্ষমতার দাপটে তার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করা সম্ভব না হলেও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তার সব অপকর্ম সামনে আসতে শুরু করেছে। ডিএমপিতে কর্মরত থাকাকালে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করারও মূল হোতা ছিলেন তিনি।

দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন জানিয়েছেন, অনুসন্ধানী কাজ প্রায় শেষ এবং সংগৃহীত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে খুব শিগগিরই মনিরুল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে। বর্তমানে পলাতক থাকলেও মনিরুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থেকে অন্তর্বর্তী সরকার ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কটূক্তি করে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা: ভারতের অনীহায় বিকল্প হিসেবে চীনকে ভাবছে বাংলাদেশ

দুই এনজিওর হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ: সাবেক এসবি প্রধান মনিরুলের দুর্নীতির পাহাড়

আপডেট সময় : ০১:১৯:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি আর্থিক অনিয়ম ও অর্থপাচারের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জঙ্গি অর্থায়নের মিথ্যা অভিযোগ তুলে দুটি ইসলামি এনজিওর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন তিনি। জুলাই বিপ্লবের পর ভারতে পালিয়ে যাওয়া এই প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তার দুর্নীতির অনুসন্ধান প্রায় শেষ পর্যায়ে এনেছে দুদক।

রোহিঙ্গাদের সহায়তায় আসা অনুদানের টাকা আত্মসাৎ করে নিজের স্ত্রী, শ্যালক ও শ্যালিকার নামে পাচার করেছেন মনিরুল। দুদকের তথ্যমতে, এই অর্থ দিয়ে তিনি ও তার পরিবার দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের নভেম্বরে কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ (কেএসআর) ও শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল নামের দুটি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এনজিওর ওপর প্রভাব বিস্তার করেন মনিরুল। প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মকর্তাদের জঙ্গি হিসেবে গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে তিনি সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেন। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এনজিও দুটির ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৮৬৯ কোটি টাকা জমা হয়, যার সিংহভাগই জালিয়াতির মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছে। এই অর্থ মনিরুলের শ্যালক রেজাউল আলম শাহীনের প্রতিষ্ঠান ‘এস এস এন্টারপ্রাইজ’ সহ বিভিন্ন নিকটাত্মীয়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে।

তদন্তে আরও দেখা গেছে, মনিরুলের স্ত্রী ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব সায়লা ফারজানার নামে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। সায়লার নামে ২০২০ সালে একটি ব্যাংক হিসাবেই প্রায় ১২ কোটি টাকা লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। শুধু তাই নয়, মনিরুল ও তার স্ত্রীর নামে বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৩৫টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের সন্ধান পেয়েছে দুদক। এছাড়া শ্যালক শাহীনের ১১টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ২৮৮ কোটি টাকা জমার তথ্য পাওয়া গেছে। দুদক বলছে, নিজের অপরাধ ঢাকতে মনিরুল নিজের নামে অ্যাকাউন্ট না খুলে পরিবারের সদস্যদের ব্যবহার করে মানিলন্ডারিং করেছেন।

সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা বর্তমানে সস্ত্রীক ভারতের ত্রিপুরার একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে। জুলাই বিপ্লবের পর তিনি হেলিকপ্টারে করে ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেন এবং পরে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পালিয়ে যান। এসবি প্রধান থাকাকালে ক্ষমতার দাপটে তার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করা সম্ভব না হলেও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তার সব অপকর্ম সামনে আসতে শুরু করেছে। ডিএমপিতে কর্মরত থাকাকালে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করারও মূল হোতা ছিলেন তিনি।

দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন জানিয়েছেন, অনুসন্ধানী কাজ প্রায় শেষ এবং সংগৃহীত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে খুব শিগগিরই মনিরুল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে। বর্তমানে পলাতক থাকলেও মনিরুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থেকে অন্তর্বর্তী সরকার ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কটূক্তি করে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।