ঢাকা ০২:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

পেশাদারিত্ব ছাপিয়ে মুজিব পরিবারের বন্দনাই ছিল উচ্চপদে আসীন হওয়ার অলিখিত যোগ্যতা

বাংলাদেশ পুলিশের অফিসিয়াল মাসিক প্রকাশনা ‘ডিটেকটিভ’ (The Detective) ফ্যাসিস্ট শাসনের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে পরিণত হয়েছিল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিবারের, বিশেষ করে শেখ মুজিবুর রহমান, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা, শেখ রাসেল ও পরিবারের অন্য সদস্যদের বন্দনা ও অতিভক্তির প্রাতিষ্ঠানিক এক মঞ্চে। দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ এ প্রকাশনায় অতিমাত্রায় প্রশস্তিমূলক লেখা প্রকাশ করে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার পথ সুগম করেন।

সমালোচকদের মতে, পুলিশের অভ্যন্তরে এ ‘তোষণ সংস্কৃতি’ ছিল উচ্চপদে দ্রুত পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের একটি অলিখিত এবং কার্যকর পথ, যা শেষ পর্যন্ত বাহিনীর পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক শপথকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।

বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিটেকটিভের বিভিন্ন সংখ্যার প্রচ্ছদ, সম্পাদকীয় ও ভেতরের পাতায় মুজিব পরিবারের সদস্যদের জীবন, আদর্শ ও নেতৃত্বকে নিয়ে একপেশেভাবে গুণকীর্তন করা হতো। ওই সব লেখার প্রধান লেখক ও প্রকাশনার মূল দায়িত্বে থাকা অধিকাংশ কর্মকর্তাই পরে পুলিশের সর্বোচ্চ পদসহ গুরুত্বপূর্ণ পদবি লাভ পুলিশের অভ্যন্তরে এ বন্দনার ধারা এতটাই প্রবল ছিল যে, এটি ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের প্রতি আনুগত্য প্রমাণের একটি মঞ্চ। বাহিনীটির ভেতরে এমন রসিকতাও প্রচলিত ছিলÑ‘ডিটেকটিভে লেখা মানেই সিভিতে প্লাস পয়েন্ট’ এবং ‘একটি কবিতা মানে একটি পদোন্নতি’। আওয়ামী সরকারের পতনের পর সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের কারো কারো ভাগ্য বিপর্যয়ের ঘটনাও তোষণভিত্তিক এ সংস্কৃতির ক্ষতিকর দিকটি সামনে এনেছে, যা প্রমাণ করে রাজনৈতিক আনুগত্য শেষ পর্যন্ত পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি।

পুলিশের প্রকাশনা, নাকি রাজনৈতিক মুখপত্র?

পুলিশ সদর দপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এখনো ‘Detective Magazine’ (ডিটেকটিভ ম্যাগাজিন)-এর অস্তিত্ব দেখা যায়। সেখানে প্রকাশনাটি পুলিশ বাহিনীর অফিসিয়াল অঙ্গ হিসেবে উল্লেখ আছে। শুরুতে ডিটেকটিভ ছিল আইনশৃঙ্খলা, অপরাধ বিশ্লেষণ, তদন্ত কৌশল ও সাহিত্যবিষয়ক একটি পেশাদার প্রকাশনা। কিন্তু কনটেন্ট ঘেঁটে দেখা যায়, এটি একসময় পেশাদার গবেষণাপত্রের বদলে রাজনৈতিক বন্দনার অ্যালবামে পরিণত হয়েছিল।

২০১০ সাল নাগাদ প্রতিটি সংখ্যায় মুজিব পরিবারকে কেন্দ্র করে থিম নির্ধারিত হতো, সম্পাদকীয় পর্যায় থেকে ‘বিষয় নির্দেশনা’ পর্যন্ত দেওয়া হতো, যাতে মুজিব পরিবারকে কেন্দ্র করেই মূল বিষয়বস্তু নির্ধারিত হয়। এ মঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নিতে পুলিশ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত পেশাদারিত্বের চেয়ে রাজনৈতিক তোষণকেই বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি সংখ্যায় শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা বা শেখ রাসেলকে নিয়ে লেখা থাকত। কখনো গদ্যে, কখনো কবিতায়। ভাষা এতটাই অতিভক্তিমূলক ছিল যে, অনেক লেখা কার্যত রাজনৈতিক পোস্টারের মতো লাগত। এ বন্দনার ধারায় সরাসরি অংশ নিতেন পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মাঠপর্যায়ের অফিসার এমনকি র‌্যাব সদস্যরাও। এর মধ্য দিয়ে পুলিশের অভ্যন্তরে একটি নতুন সংস্কৃতি জন্ম নেয়Ñডিটেকটিভে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিবারকে বন্দনা ও তোষণ করে সেটিকে কাজে লাগিয়ে পদোন্নতির সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা।

অতিভক্তিমূলক ভাষার বন্যা : মুজিব ও হাসিনার মাত্রাতিরিক্ত স্তুতি

ডিটেকটিভের বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা ও প্রবন্ধগুলোয় মুজিব পরিবারকে নিয়ে অতিভক্তি ও প্রশস্তি ছিল মাত্রাতিরিক্ত, যা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতার ধারণাকে লঙ্ঘন করেছে। ২০১৫ সালের আগস্ট সংখ্যায় এক লেখক লেখেন, ‘মুজিবের আদর্শ ছাড়া বাংলাদেশ কল্পনাই করা যায় না। আমরা তার সৈনিক, তার কথাই আমাদের শপথ।’ আরেক লেখায় বলা হয়, ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুর মহাকাব্যের পরিণতি। তিনি শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের মানবতার আলোকবর্তিকা।’

প্রতিটি সংখ্যায় শেখ মুজিবের জীবনী, তার আদর্শ এবং শেখ হাসিনা ও শেখ রাসেলকে নিয়ে একাধিক লেখা থাকত। ওই সব লেখায় প্রায়ই শেখ মুজিব এবং শেখ হাসিনাকে পৌরাণিক বা অপ্রতিরোধ্য মাত্রায় উন্নীত করা হয়, যা ব্যক্তিপূজার সুস্পষ্ট বার্তা বহন করে। ২০২১ সালের আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত লেখায় তৎকালীন স্পেশাল ব্রাঞ্চের কর্মকর্তা শামিমা বেগম তার কবিতা ‘অবিনশ্বর মুজিব’ ও ‘তোমার চেতনার স্পন্দন জাগি’-তে বঙ্গবন্ধুকে প্রায় পৌরাণিক বা ঐশী মর্যাদায় ভূষিত করেন। তার লেখায় বঙ্গবন্ধুকে ‘অবিনশ্বর’, ‘ধ্রুবতারা’, ‘বিশ্বমানবের জ্যোতি’ এবং ‘রক্তে দোদুল্যমান এক মহানায়কের চির ভাস্বর উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

পুলিশ সুপার দেওয়ান লালন আহমেদ তার কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে ‘দেশের জন্য জীবন দেওয়া মহান’ এবং ‘গ্রাম বাংলার মাটি মানুষের শেখ সাহেব’ বলে বন্দনা করেন। পুলিশ সুপার আলেপ মাহমুদ তার প্রবন্ধে সরাসরি ঘোষণা করেন, ‘বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু নেই, তার নামেই শুরু প্রতিটি প্রভাত’। তার লেখায় বঙ্গবন্ধুকে ‘বাঙালি জাতির প্রতিটি প্রাণের স্পন্দনে প্রজ্বলিত বাতিঘর’ হিসেবে আখ্যা দেন, যেখানে বলা হয়Ñ‘যে আলো নিভে না কখনো।’ জেরিন মুখার্জী তার প্রবন্ধে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে ‘বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে মহীয়সী নারী’ উল্লেখ করেন।

শেক মুজিবের পাশাপাশি শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও গুণকীর্তনও ডিটেকটিভের পাতায় গুরুত্বসহকারে প্রচার করা হতো। লেখকরা শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্ব-বঙ্গবন্ধুর মহাকাব্য’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। বলা হয়, ‘যে হাত দোলনা দোলায়, সেই হাত বিশ্ব শাসন করে’Ñতার নাম শেখ হাসিনা। অন্য এক প্রবন্ধে তাকে ‘জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণে দার্শনিক শেখ হাসিনার অভিযাত্রা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বলা হয়, তার হাত ধরে বাংলাদেশ ‘বিশ্বে এখন রোল মডেল’। হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত বিশেষ কভারেজে তাকে ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অ্যাকটিভিট রোল মডেল’ বলা হতো। পুলিশ সপ্তাহ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও মুজিব পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য ও ছবিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হতো, যা একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মুখপত্রের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করত।

প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা ভঙ্গ

সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সরকারি বাহিনীর অফিসিয়াল প্রকাশনায় এ ধরনের ভাষা সাংবিধানিক সে বাধ্যবাধকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ প্রবণতা শুধু প্রকাশনাকে নয়, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের উচ্চপদস্থ চার কর্মকর্তা বলেন, ‘পুলিশের মুখপত্রে যদি নিরপেক্ষ আলোচনার পরিবর্তে তোষণের জায়গা নেয়, তাহলে বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার মৃত্যু ঘটে। বাহিনী তখন রাষ্ট্রের নয়, সরকারের বাহিনীতে পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে এ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে ভবিষ্যতে সবাইকে সতর্ক থাকা দরকার।’

২০১৫ সালের পর ডিটেকটিভে পেশাগত গবেষণা বা কারিগরি লেখা কার্যত বিলীন হয়ে যায়। অপরাধ বিশ্লেষণ, ফরেনসিক, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বা তদন্ত তত্ত্বের মতো বিষয়গুলো বাদ পড়ে যায়। জায়গা করে নেয় কবিতা, স্মৃতিকথা ও আবেগঘন প্রশস্তি। তৎকালীন এক সম্পাদক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমরা বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীকে কেন্দ্র করেই থিম ঠিক করতাম। এতে বাহিনীর মনোবল বাড়ে।’

সমালোচকদের মতে, এটি মনোবল নয়; আনুগত্যের প্রতিযোগিতা তৈরি করেছিল। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান, তাদের প্রায়ই নির্দেশ দেওয়া হতো ‘বঙ্গবন্ধু বা শেখ হাসিনাকে নিয়ে লিখতে হবে।’ যারা লিখতেন না, তাদের পদোন্নতিতে ‘অদৃশ্য বাধা’ তৈরি হতো। অন্যদিকে ডিটেকটিভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই পরে দ্রুত উচ্চপদে উন্নীত হন।

তোষণনীতির সুফল

ডিটেকটিভের প্রকাশনা কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা কর্মকর্তারা, বিশেষ করে প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যরা তুলনামূলকভাবে দ্রুত পদোন্নতি এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। সমালোচকরা মনে করেন, এ উত্থান ছিল পেশাগত দক্ষতা বা সুনামের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রমাণেরই ফল। পুলিশের অভ্যন্তরে এই শ্রেণির কর্মকর্তারা ‘তেলবাজ কর্মকর্তা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন, যাদের কাছে প্রকাশনায় বন্দনা করা ছিল পদোন্নতির ‘গোপন কোড’।

ডিটেকটিভের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বেনজীর আহমেদ এবং বর্তমানে কারাবন্দি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন (গণহত্যায় সাজাপ্রাপ্ত) পুলিশের সর্বোচ্চ পদ আইজিপি হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা লাভ করেন। তোষণনীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সরকার পতনের পর আল-মামুনকে অবসরে পাঠানো হয় এবং পরে তিনি গ্রেপ্তার হন। বেনজীরের বিরুদ্ধে ওঠে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ। হাসিনার আমলেই তিনি বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন।

প্রকাশনাটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী হাবিবুর রহমান দ্রুত অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পান এবং পরে ডিএমপি কমিশনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। জুলাই বিপ্লবের গণহত্যায় অভিযুক্ত হাবিবুর রহমান ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারতে পালিয়ে যান। প্রধান সম্পাদক হিসেবে যুক্ত থাকা কামরুল আহসান অতিরিক্ত আইজিপি পদে থেকে গ্রেড-১ পদে পদোন্নতি লাভ করেন। মুজিব বন্দনামূলক কবিতা লেখায় অগ্রণী ভূমিকা রাখা শামিমা বেগম ২০২২ সালের মে মাসে ডিআইজি পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

অবসরপ্রাপ্ত এক ডিআইজি মন্তব্য করেন, ‘একসময় ডিটেকটিভ ছিল আমাদের সাংগঠনিক চেতনার প্রকাশভঙ্গি কিন্তু পরে সেটি হয়ে যায় তোষণ সংস্কৃতির প্রতীক। ডিটেকটিভ হয়ে উঠেছিল বন্দনা ও পদোন্নতির লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম। আমরা বুঝতামÑকার লেখা কোথায় ছাপা হলো, তার ওপর নির্ভর করবে তার পরের পদোন্নতি।’

তোষণের রাজনৈতিক আনুগত্য অবশ্য শেষ পর্যন্ত টেকেনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর দেখা যায়, ডিটেকটিভনির্ভর আনুগত্যের সুফলভোগী কর্মকর্তাদের অনেকেই দ্রুত অবনমন, আইনি জটিলতা বা বিচার প্রক্রিয়ার মুখে পড়েন। ফলে পরিষ্কার হয়, তোষণনির্ভর ক্যারিয়ার আসলে দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুরক্ষা দেয় না।

অপরাধ বিশ্লেষক মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওমর ফারুক আমার দেশকে বলেন, ডিটেকটিভ থেকে স্পষ্ট যে, বিশেষ পরিবারের প্রতি আনুগত্যই ছিল পদোন্নতির অলিখিত মাপকাঠি। এখন নতুন সরকারের অধীনে প্রশ্ন উঠেছে-যেসব কর্মকর্তা ডিটেকটিভের মাধ্যমে মুজিব পরিবার বন্দনায় সক্রিয় ছিলেন এবং তার সুফল পেয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কি কোনো বিভাগীয় তদন্ত বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে? পুলিশের এ তোষণভিত্তিক সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে পেশাদার নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করাই এখন নতুন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

পুলিশ সদর দপ্তরের বক্তব্য

এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন আমার দেশকে বলেন, পুলিশ পেশাদার ও নিরপেক্ষ বাহিনী হিসেবে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রকাশনা ও যোগাযোগ কার্যক্রমে রাজনৈতিক পক্ষপাত দূর করতে নীতিমালা হালনাগাদ, সম্পাদকীয় সতর্কতা বৃদ্ধি এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বাহিনীর প্রকাশনা ও যোগাযোগ কার্যক্রম থেকে সব ধরনের রাজনৈতিক পক্ষপাত দূর করতে ইতোমধ্যে নীতিমালা হালনাগাদ, সম্পাদকীয় সতর্কতা জোরদার এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতের ওয়ানডে জয়ে বাংলাদেশের সৈকত, আইসিসি চুক্তিতে নেই বিসিবির বাধা

পেশাদারিত্ব ছাপিয়ে মুজিব পরিবারের বন্দনাই ছিল উচ্চপদে আসীন হওয়ার অলিখিত যোগ্যতা

আপডেট সময় : ০৩:০৭:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ পুলিশের অফিসিয়াল মাসিক প্রকাশনা ‘ডিটেকটিভ’ (The Detective) ফ্যাসিস্ট শাসনের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে পরিণত হয়েছিল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিবারের, বিশেষ করে শেখ মুজিবুর রহমান, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা, শেখ রাসেল ও পরিবারের অন্য সদস্যদের বন্দনা ও অতিভক্তির প্রাতিষ্ঠানিক এক মঞ্চে। দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ এ প্রকাশনায় অতিমাত্রায় প্রশস্তিমূলক লেখা প্রকাশ করে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার পথ সুগম করেন।

সমালোচকদের মতে, পুলিশের অভ্যন্তরে এ ‘তোষণ সংস্কৃতি’ ছিল উচ্চপদে দ্রুত পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের একটি অলিখিত এবং কার্যকর পথ, যা শেষ পর্যন্ত বাহিনীর পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক শপথকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।

বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিটেকটিভের বিভিন্ন সংখ্যার প্রচ্ছদ, সম্পাদকীয় ও ভেতরের পাতায় মুজিব পরিবারের সদস্যদের জীবন, আদর্শ ও নেতৃত্বকে নিয়ে একপেশেভাবে গুণকীর্তন করা হতো। ওই সব লেখার প্রধান লেখক ও প্রকাশনার মূল দায়িত্বে থাকা অধিকাংশ কর্মকর্তাই পরে পুলিশের সর্বোচ্চ পদসহ গুরুত্বপূর্ণ পদবি লাভ পুলিশের অভ্যন্তরে এ বন্দনার ধারা এতটাই প্রবল ছিল যে, এটি ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের প্রতি আনুগত্য প্রমাণের একটি মঞ্চ। বাহিনীটির ভেতরে এমন রসিকতাও প্রচলিত ছিলÑ‘ডিটেকটিভে লেখা মানেই সিভিতে প্লাস পয়েন্ট’ এবং ‘একটি কবিতা মানে একটি পদোন্নতি’। আওয়ামী সরকারের পতনের পর সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের কারো কারো ভাগ্য বিপর্যয়ের ঘটনাও তোষণভিত্তিক এ সংস্কৃতির ক্ষতিকর দিকটি সামনে এনেছে, যা প্রমাণ করে রাজনৈতিক আনুগত্য শেষ পর্যন্ত পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি।

পুলিশের প্রকাশনা, নাকি রাজনৈতিক মুখপত্র?

পুলিশ সদর দপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এখনো ‘Detective Magazine’ (ডিটেকটিভ ম্যাগাজিন)-এর অস্তিত্ব দেখা যায়। সেখানে প্রকাশনাটি পুলিশ বাহিনীর অফিসিয়াল অঙ্গ হিসেবে উল্লেখ আছে। শুরুতে ডিটেকটিভ ছিল আইনশৃঙ্খলা, অপরাধ বিশ্লেষণ, তদন্ত কৌশল ও সাহিত্যবিষয়ক একটি পেশাদার প্রকাশনা। কিন্তু কনটেন্ট ঘেঁটে দেখা যায়, এটি একসময় পেশাদার গবেষণাপত্রের বদলে রাজনৈতিক বন্দনার অ্যালবামে পরিণত হয়েছিল।

২০১০ সাল নাগাদ প্রতিটি সংখ্যায় মুজিব পরিবারকে কেন্দ্র করে থিম নির্ধারিত হতো, সম্পাদকীয় পর্যায় থেকে ‘বিষয় নির্দেশনা’ পর্যন্ত দেওয়া হতো, যাতে মুজিব পরিবারকে কেন্দ্র করেই মূল বিষয়বস্তু নির্ধারিত হয়। এ মঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নিতে পুলিশ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত পেশাদারিত্বের চেয়ে রাজনৈতিক তোষণকেই বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি সংখ্যায় শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা বা শেখ রাসেলকে নিয়ে লেখা থাকত। কখনো গদ্যে, কখনো কবিতায়। ভাষা এতটাই অতিভক্তিমূলক ছিল যে, অনেক লেখা কার্যত রাজনৈতিক পোস্টারের মতো লাগত। এ বন্দনার ধারায় সরাসরি অংশ নিতেন পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মাঠপর্যায়ের অফিসার এমনকি র‌্যাব সদস্যরাও। এর মধ্য দিয়ে পুলিশের অভ্যন্তরে একটি নতুন সংস্কৃতি জন্ম নেয়Ñডিটেকটিভে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিবারকে বন্দনা ও তোষণ করে সেটিকে কাজে লাগিয়ে পদোন্নতির সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা।

অতিভক্তিমূলক ভাষার বন্যা : মুজিব ও হাসিনার মাত্রাতিরিক্ত স্তুতি

ডিটেকটিভের বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত কবিতা ও প্রবন্ধগুলোয় মুজিব পরিবারকে নিয়ে অতিভক্তি ও প্রশস্তি ছিল মাত্রাতিরিক্ত, যা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতার ধারণাকে লঙ্ঘন করেছে। ২০১৫ সালের আগস্ট সংখ্যায় এক লেখক লেখেন, ‘মুজিবের আদর্শ ছাড়া বাংলাদেশ কল্পনাই করা যায় না। আমরা তার সৈনিক, তার কথাই আমাদের শপথ।’ আরেক লেখায় বলা হয়, ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুর মহাকাব্যের পরিণতি। তিনি শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের মানবতার আলোকবর্তিকা।’

প্রতিটি সংখ্যায় শেখ মুজিবের জীবনী, তার আদর্শ এবং শেখ হাসিনা ও শেখ রাসেলকে নিয়ে একাধিক লেখা থাকত। ওই সব লেখায় প্রায়ই শেখ মুজিব এবং শেখ হাসিনাকে পৌরাণিক বা অপ্রতিরোধ্য মাত্রায় উন্নীত করা হয়, যা ব্যক্তিপূজার সুস্পষ্ট বার্তা বহন করে। ২০২১ সালের আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত লেখায় তৎকালীন স্পেশাল ব্রাঞ্চের কর্মকর্তা শামিমা বেগম তার কবিতা ‘অবিনশ্বর মুজিব’ ও ‘তোমার চেতনার স্পন্দন জাগি’-তে বঙ্গবন্ধুকে প্রায় পৌরাণিক বা ঐশী মর্যাদায় ভূষিত করেন। তার লেখায় বঙ্গবন্ধুকে ‘অবিনশ্বর’, ‘ধ্রুবতারা’, ‘বিশ্বমানবের জ্যোতি’ এবং ‘রক্তে দোদুল্যমান এক মহানায়কের চির ভাস্বর উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

পুলিশ সুপার দেওয়ান লালন আহমেদ তার কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে ‘দেশের জন্য জীবন দেওয়া মহান’ এবং ‘গ্রাম বাংলার মাটি মানুষের শেখ সাহেব’ বলে বন্দনা করেন। পুলিশ সুপার আলেপ মাহমুদ তার প্রবন্ধে সরাসরি ঘোষণা করেন, ‘বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু নেই, তার নামেই শুরু প্রতিটি প্রভাত’। তার লেখায় বঙ্গবন্ধুকে ‘বাঙালি জাতির প্রতিটি প্রাণের স্পন্দনে প্রজ্বলিত বাতিঘর’ হিসেবে আখ্যা দেন, যেখানে বলা হয়Ñ‘যে আলো নিভে না কখনো।’ জেরিন মুখার্জী তার প্রবন্ধে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে ‘বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে মহীয়সী নারী’ উল্লেখ করেন।

শেক মুজিবের পাশাপাশি শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও গুণকীর্তনও ডিটেকটিভের পাতায় গুরুত্বসহকারে প্রচার করা হতো। লেখকরা শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্ব-বঙ্গবন্ধুর মহাকাব্য’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। বলা হয়, ‘যে হাত দোলনা দোলায়, সেই হাত বিশ্ব শাসন করে’Ñতার নাম শেখ হাসিনা। অন্য এক প্রবন্ধে তাকে ‘জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণে দার্শনিক শেখ হাসিনার অভিযাত্রা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বলা হয়, তার হাত ধরে বাংলাদেশ ‘বিশ্বে এখন রোল মডেল’। হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত বিশেষ কভারেজে তাকে ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অ্যাকটিভিট রোল মডেল’ বলা হতো। পুলিশ সপ্তাহ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও মুজিব পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য ও ছবিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হতো, যা একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মুখপত্রের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করত।

প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা ভঙ্গ

সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সরকারি বাহিনীর অফিসিয়াল প্রকাশনায় এ ধরনের ভাষা সাংবিধানিক সে বাধ্যবাধকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ প্রবণতা শুধু প্রকাশনাকে নয়, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের উচ্চপদস্থ চার কর্মকর্তা বলেন, ‘পুলিশের মুখপত্রে যদি নিরপেক্ষ আলোচনার পরিবর্তে তোষণের জায়গা নেয়, তাহলে বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার মৃত্যু ঘটে। বাহিনী তখন রাষ্ট্রের নয়, সরকারের বাহিনীতে পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে এ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে ভবিষ্যতে সবাইকে সতর্ক থাকা দরকার।’

২০১৫ সালের পর ডিটেকটিভে পেশাগত গবেষণা বা কারিগরি লেখা কার্যত বিলীন হয়ে যায়। অপরাধ বিশ্লেষণ, ফরেনসিক, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বা তদন্ত তত্ত্বের মতো বিষয়গুলো বাদ পড়ে যায়। জায়গা করে নেয় কবিতা, স্মৃতিকথা ও আবেগঘন প্রশস্তি। তৎকালীন এক সম্পাদক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমরা বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীকে কেন্দ্র করেই থিম ঠিক করতাম। এতে বাহিনীর মনোবল বাড়ে।’

সমালোচকদের মতে, এটি মনোবল নয়; আনুগত্যের প্রতিযোগিতা তৈরি করেছিল। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান, তাদের প্রায়ই নির্দেশ দেওয়া হতো ‘বঙ্গবন্ধু বা শেখ হাসিনাকে নিয়ে লিখতে হবে।’ যারা লিখতেন না, তাদের পদোন্নতিতে ‘অদৃশ্য বাধা’ তৈরি হতো। অন্যদিকে ডিটেকটিভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই পরে দ্রুত উচ্চপদে উন্নীত হন।

তোষণনীতির সুফল

ডিটেকটিভের প্রকাশনা কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা কর্মকর্তারা, বিশেষ করে প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যরা তুলনামূলকভাবে দ্রুত পদোন্নতি এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। সমালোচকরা মনে করেন, এ উত্থান ছিল পেশাগত দক্ষতা বা সুনামের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রমাণেরই ফল। পুলিশের অভ্যন্তরে এই শ্রেণির কর্মকর্তারা ‘তেলবাজ কর্মকর্তা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন, যাদের কাছে প্রকাশনায় বন্দনা করা ছিল পদোন্নতির ‘গোপন কোড’।

ডিটেকটিভের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বেনজীর আহমেদ এবং বর্তমানে কারাবন্দি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন (গণহত্যায় সাজাপ্রাপ্ত) পুলিশের সর্বোচ্চ পদ আইজিপি হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা লাভ করেন। তোষণনীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সরকার পতনের পর আল-মামুনকে অবসরে পাঠানো হয় এবং পরে তিনি গ্রেপ্তার হন। বেনজীরের বিরুদ্ধে ওঠে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ। হাসিনার আমলেই তিনি বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন।

প্রকাশনাটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী হাবিবুর রহমান দ্রুত অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পান এবং পরে ডিএমপি কমিশনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। জুলাই বিপ্লবের গণহত্যায় অভিযুক্ত হাবিবুর রহমান ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারতে পালিয়ে যান। প্রধান সম্পাদক হিসেবে যুক্ত থাকা কামরুল আহসান অতিরিক্ত আইজিপি পদে থেকে গ্রেড-১ পদে পদোন্নতি লাভ করেন। মুজিব বন্দনামূলক কবিতা লেখায় অগ্রণী ভূমিকা রাখা শামিমা বেগম ২০২২ সালের মে মাসে ডিআইজি পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

অবসরপ্রাপ্ত এক ডিআইজি মন্তব্য করেন, ‘একসময় ডিটেকটিভ ছিল আমাদের সাংগঠনিক চেতনার প্রকাশভঙ্গি কিন্তু পরে সেটি হয়ে যায় তোষণ সংস্কৃতির প্রতীক। ডিটেকটিভ হয়ে উঠেছিল বন্দনা ও পদোন্নতির লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম। আমরা বুঝতামÑকার লেখা কোথায় ছাপা হলো, তার ওপর নির্ভর করবে তার পরের পদোন্নতি।’

তোষণের রাজনৈতিক আনুগত্য অবশ্য শেষ পর্যন্ত টেকেনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর দেখা যায়, ডিটেকটিভনির্ভর আনুগত্যের সুফলভোগী কর্মকর্তাদের অনেকেই দ্রুত অবনমন, আইনি জটিলতা বা বিচার প্রক্রিয়ার মুখে পড়েন। ফলে পরিষ্কার হয়, তোষণনির্ভর ক্যারিয়ার আসলে দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুরক্ষা দেয় না।

অপরাধ বিশ্লেষক মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওমর ফারুক আমার দেশকে বলেন, ডিটেকটিভ থেকে স্পষ্ট যে, বিশেষ পরিবারের প্রতি আনুগত্যই ছিল পদোন্নতির অলিখিত মাপকাঠি। এখন নতুন সরকারের অধীনে প্রশ্ন উঠেছে-যেসব কর্মকর্তা ডিটেকটিভের মাধ্যমে মুজিব পরিবার বন্দনায় সক্রিয় ছিলেন এবং তার সুফল পেয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কি কোনো বিভাগীয় তদন্ত বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে? পুলিশের এ তোষণভিত্তিক সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে পেশাদার নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করাই এখন নতুন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

পুলিশ সদর দপ্তরের বক্তব্য

এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন আমার দেশকে বলেন, পুলিশ পেশাদার ও নিরপেক্ষ বাহিনী হিসেবে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রকাশনা ও যোগাযোগ কার্যক্রমে রাজনৈতিক পক্ষপাত দূর করতে নীতিমালা হালনাগাদ, সম্পাদকীয় সতর্কতা বৃদ্ধি এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বাহিনীর প্রকাশনা ও যোগাযোগ কার্যক্রম থেকে সব ধরনের রাজনৈতিক পক্ষপাত দূর করতে ইতোমধ্যে নীতিমালা হালনাগাদ, সম্পাদকীয় সতর্কতা জোরদার এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।