দক্ষিণ এশিয়ায় পানি ক্রমেই এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদে পরিণত হচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তন এবং উজানের নিয়ন্ত্রণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ কয়েক দশকের দ্বিপক্ষীয় অচলাবস্থা, ফারাক্কা চুক্তির নবায়নে দিল্লির দৃশ্যমান অনীহা এবং তিস্তাসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তিতে চরম অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশ এখন চীনের কারিগরি ও অবকাঠামোগত সহায়তার দিকে গুরুত্বের সঙ্গে নজর দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ভারতের ক্রমাগত অসহযোগিতা ঢাকাকে বাধ্য করছে বেইজিংয়ের অভিজ্ঞতা, নদী শাসন প্রযুক্তি এবং অর্থায়নকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব পানিব্যবস্থাপনা ও কাঠামো গড়ে তুলতে।
গঙ্গা ও তিস্তাসহ ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিবণ্টন নিয়ে কয়েক দশকের স্থবিরতা ভাঙতে বাংলাদেশ এখন জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের মতো বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার জোরালো প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে নদী শাসন, ড্রেজিং এবং রিজার্ভার ব্যবস্থাপনায় চীনের এই কৌশলগত সম্পৃক্ততা দক্ষিণ এশিয়ায় এক নতুন ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা দিল্লির ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে।
বাংলাদেশ মূলত ‘তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’-এর জন্য চীনের বিশাল অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। এই মেগা প্রকল্পের আওতায় নদী খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য পানি ধরে রাখতে বড় আকারের রিজার্ভার বা জলাধার তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নৌ-বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় অঞ্চলে স্মার্ট স্লুইস গেট ও সেন্সর সিস্টেম স্থাপন এবং স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহারের মাধ্যমে বন্যা পূর্বাভাসের আধুনিক মডেল উন্নয়নে চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তার কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা হচ্ছে। এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নদীর প্রবাহ পর্যবেক্ষণ ও পানিব্যবস্থাপনায় ভারতের তথ্যের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে স্বাবলম্বী হতে পারবে।
১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির পর ভারতের সঙ্গে আর কোনো বড় নদীর পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর চুক্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তিস্তা চুক্তি এক দশকের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ‘ভেটো’ দেওয়ার ক্ষমতা কার্যত একটি কূটনৈতিক প্রতিবন্ধকতা বা ‘ব্লকিং মেকানিজম’ তৈরি করে রেখেছে। এর ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্য আজ ধ্বংসের মুখে। এই দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক শূন্যতায় চীন এখন একটি অপরিহার্য কৌশলগত অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। বেইজিংয়ের এই সম্পৃক্ততা যেমন বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়াবে, তেমনি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একক আধিপত্যের ক্ষেত্রে একটি নতুন কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করবে।
পররাষ্ট্র ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এখন দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে জাতিসংঘ জলধারা কনভেনশন বা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) মতো বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে অভিন্ন নদীর ন্যায্যতার প্রশ্ন তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই নতুন কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে পানির হিস্যা নিশ্চিত করা এবং বিষয়টিকে দ্বিপক্ষীয় গণ্ডি থেকে বৈশ্বিক ইস্যুতে রূপান্তর করে ভারতের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা। তবে অভিজ্ঞ কূটনীতিকরা সতর্ক করেছেন যে, চীনের ওপর অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা কিংবা ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের সম্ভাব্য টানাপোড়েন সামলানো হবে ঢাকার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, স্বচ্ছ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং নিজস্ব পানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধিই হতে পারে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রধান চাবিকাঠি।
রিপোর্টারের নাম 

























