রাজধানী ঢাকা বর্তমানে এক ভয়াবহ নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। একটি সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ঢাকার রাস্তায় বর্তমানে অন্তত ৪০১ জন চিহ্নিত অবৈধ অস্ত্রধারী অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের কাছে থাকা দুই সহস্রাধিক অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি এবং দখলবাজির মতো ভয়ংকর অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি জনমনে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা ও স্থাপনা থেকে লুট হওয়া ৫ হাজার ৮১৮টি অস্ত্রের মধ্যে ১ হাজার ৩৩৫টি অস্ত্রের কোনো হদিস এখনো মেলেনি। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, এই অবৈধ অস্ত্রগুলোর বড় একটি অংশ ভাড়ায় খাটানো হচ্ছে এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা এসব অস্ত্রধারী আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে ঢাকার বিভাগওয়ারী অস্ত্রধারীদের যে তালিকা করা হয়েছে, তাতে দেখা যায় মতিঝিল বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১১৮ জন অবৈধ অস্ত্রধারী সক্রিয়। এছাড়া ওয়ারীতে ৭৩, তেজগাঁওয়ে ৬১, মিরপুরে ৬০, রমনায় ৩৬, লালবাগে ২৪, গুলশানে ১৬ এবং উত্তরা বিভাগে ১৩ জন তালিকাভুক্ত অস্ত্রধারী রয়েছে। এদের মধ্যে অনেকে কারাগারে বা দেশের বাইরে থাকলেও একটি বড় অংশ নির্বাচনি মাঠে সক্রিয় হওয়ার অপেক্ষায় আছে। এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে অস্ত্র আইনে মামলার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত বছর সারাদেশে ১ হাজার ৮১৫টি অস্ত্র মামলা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। শুধুমাত্র রাজধানীতেই এই বৃদ্ধির হার ১৯৭ শতাংশ, যা জননিরাপত্তার নাজুক অবস্থাকেই ফুটিয়ে তোলে।
অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ পরিচালনা করা হলেও লুণ্ঠিত অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো বেহাত রয়ে গেছে। পুলিশের আইজিপি বাহারুল আলম লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া নিয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং এগুলো অপরাধে ব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ২ হাজার ২৩২ জন বন্দির মধ্যে ৭১৩ জন এখনো পলাতক, যাদের কাছে কারাগার থেকে লুট হওয়া ২৭টি অস্ত্র রয়েছে। নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এবং আইজিপি উভয়েই স্বীকার করেছেন যে, এই ছোট অস্ত্রগুলো নির্বাচনি সহিংসতায় ব্যবহৃত হতে পারে, যা একটি বড় উদ্বেগের কারণ।
র্যাব ও ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দাবি করছেন যে, তারা অবৈধ অস্ত্রধারীদের আইনের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন এবং নিয়মিত স্পেশাল ড্রাইভ পরিচালনা করছেন। তবে অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হকের মতে, অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে কঠোর অভিযান না চালালে সমাজ স্থিতিশীল হবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ করা এবং লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার করা নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে থাকার দাবি করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো স্বস্তি ফেরেনি।
রিপোর্টারের নাম 
























