চাঞ্চল্যকর ওসমান বিন হাদী হত্যা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ফয়সালের অবস্থান নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। অনলাইনে জোড়ালোভাবে প্রচার চালানো হচ্ছে যে, ফয়সালের মোবাইল লোকেশন ডিওএইচএস (DOHS) এলাকার একজন বিগ্রেডিয়ার জেনারেলের বাসভবনে পাওয়া গেছে। তবে ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং টেলিকমিউনিকেশন প্রকৌশলীদের মতে, প্রচলিত কল ডিটেইল রেকর্ড বা সিডিআর (CDR) প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় এ ধরনের সুনির্দিষ্ট দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাধারণত যে সিডিআর ডেটা ব্যবহার করে, তা মূলত সেল টাওয়ার বা বিটিএস (BTS)-এর ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। একটি মোবাইল টাওয়ার যখন সিগন্যাল দেয়, তখন তা একটি নির্দিষ্ট জ্যামিতিক এলাকা বা সেক্টর কাভার করে। ঢাকা বা ডিওএইচএস-এর মতো উচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একটি টাওয়ারের কাভারেজ সাধারণত ৩০০ মিটার থেকে ১ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। প্রকৌশলীরা ব্যাখ্যা করছেন, এই নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের মধ্যে শত শত বহুতল ভবন এবং হাজার হাজার ফ্ল্যাট থাকে। সিডিআর ডেটা কেবল এটি নিশ্চিত করতে পারে যে ব্যবহারকারী ওই টাওয়ারের সীমানার ‘কোথাও’ ছিলেন, কিন্তু তিনি কোন ভবনের কোন ফ্লোরে বা কার বাসায় ছিলেন, তা পিনপয়েন্ট করা এই প্রযুক্তিতে সম্ভব নয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সিডিআর তথ্যে কোনো জিপিএস (GPS) কোঅর্ডিনেট থাকে না, এটি কেবল ‘লোকেশন এরিয়া কোড’ এবং ‘সেল আইডি’ প্রদান করে। প্রযুক্তির ভাষায় এটি একটি বড় বৃত্তের মতো, যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং ওই এলাকার হাজারো সাধারণ নাগরিক একই টাওয়ারের অধীনে নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেন। এছাড়া শহরাঞ্চলে উঁচু ভবনের কারণে সিগন্যাল প্রতিফলিত বা ওভারল্যাপিং হওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটে। ফলে অনেক সময় ব্যবহারকারী এক ভবনে থাকলেও তার ফোনটি পাশের বা পেছনের অন্য কোনো টাওয়ারের সাথে সংযুক্ত হতে পারে। তাই শুধুমাত্র টাওয়ার লোকেশন বা সিডিআর-এর ওপর ভিত্তি করে সুনির্দিষ্ট কোনো বাসা বা ব্যক্তির নাম উল্লেখ করাকে ‘মনগড়া’ ও ‘বৈজ্ঞানিকভাবে অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যের উৎস বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের নাম ও ছবি ব্যবহার করে খোলা একটি ফেসবুক পেজ থেকে এই দাবিটি প্রথম প্রচার করা হয়, যা প্রকৃতপক্ষে তার ভেরিফাইড বা অফিশিয়াল পেজ নয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, একটি অননুমোদিত উৎস থেকে স্পর্শকাতর হত্যা মামলা এবং সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জড়িয়ে এমন ভুয়া খবর ছড়ানোর পেছনে সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তাদের মতে, সামনে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষের আবেগকে পুঁজি করে এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর অবিশ্বাস তৈরি করতে ফ্যাক্ট-চেকিং ছাড়াই এসব গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় যাচাই-বাছাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্যে বিভ্রান্ত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
রিপোর্টারের নাম 





















