লিখিত কোনও নীতি না থাকলেও মৌখিক নির্দেশের মাধ্যমে সন্ধ্যার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে প্রবেশে নারী শিক্ষার্থীদের বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় লিঙ্গ-বৈষম্যের অভিযোগ জোরালো হয়েছে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) এক নেত্রী প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন।
গত সপ্তাহে এক নারী শিক্ষার্থীকে কেন্দ্রীয় মাঠের ফটকে আটকে দেওয়া হয়। সেখানে তাকে জানানো হয়, বিকেল ৫টার পর নারী শিক্ষার্থীরা মাঠে প্রবেশ করতে পারবেন না— যে নিষেধাজ্ঞা পুরুষ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) ফারেহা তুল ফারাহ নামে এক শিক্ষার্থী ফেসবুকে লেখেন, সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীরা তাকে কেন্দ্রীয় মাঠে ঢুকতে বাধা দেন। তাদের দাবি ছিল, এই সিদ্ধান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ডাকসুর যৌথভাবে নেওয়া।
তিনি লেখেন, “ফটকে আমাকে বলা হয়েছে— বিকেল ৫টার পর নারী শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় মাঠে ঢুকতে পারবে না। সবাই পারবে, শুধু মেয়েরা নয়।”
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ডাকসু— উভয় পক্ষই এমন কোনও নীতির অস্তিত্ব অস্বীকার করেছে।
এ বিষয়ে শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক এস এম জাকারিয়া বলেন, সন্ধ্যার পর নারী শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রীয় মাঠে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, “প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ধরনের কোনও নির্দেশনা নেই।” পাশাপাশি তিনি জানান, সন্ধ্যায় নারী শিক্ষার্থীরা যাতে খেলাধুলা করতে পারেন, সে জন্য নারী শিক্ষকদের উপস্থিতির মতো ব্যবস্থা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
ডাকসুর অস্বীকার, বৈষম্যের অভিযোগ
ডাকসুর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য হেমা চাকমাও এমন কোনও সিদ্ধান্তে ছাত্র সংসদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ নাকচ করেছেন।
ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “বিকাল পাঁচটার পর সেন্ট্রাল ফিল্ডের মাঠে মেয়েদের ঢুকতে না দেওয়া, এটা ডাকসুর সিদ্ধান্ত না, না এবং না। ডাকসুর কাজ বরং শিক্ষার্থীরা যাতে ভালোমতো মাঠে ঢুকতে পারে, তা এনশিওর করা, এনকারেজ করা।”
হেমা চাকমা বলেন, এই ঘটনা জবাবদিহিহীনভাবে চাপিয়ে দেওয়া অলিখিত ও লিঙ্গভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের একটি বড় চিত্র তুলে ধরে।
তিনি জানান, কথিত এই ‘কারফিউ’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় মাঠে প্রতীকী কর্মসূচি— খেলা-ধূলা বা গান-বাজনা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা রাত ১০টা বা ১১টা পর্যন্ত চলতে পারে। এই আয়োজনে তার সঙ্গে কে কে থাকবেন, সেই প্রশ্নও রাখেন হেমা চাকমা।
তিনি আরও বলেন, “সন্ধ্যার পর নারী শিক্ষার্থীরা কী করতে পারবেন বা পারবেন না— এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছ থেকে লিখিত ব্যাখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হবে।”
মৌখিক নির্দেশের সংস্কৃতি
শিক্ষার্থীদের মতে, কেন্দ্রীয় মাঠের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। বরং এটি এমন এক বৃহত্তর সংস্কৃতির অংশ, যেখানে লিখিত বিধির বদলে মৌখিক নির্দেশের মাধ্যমে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, যা তাদেরকে খামখেয়ালি ‘পুলিশিং’-এর মুখে ফেলে।
যদিও কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা অস্বীকার করে, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ— মাঠপর্যায়ে প্রহরী ও কর্মীরা প্রায়ই যাচাই করা যায় না এমন ‘উপরের নির্দেশের’ কথা বলে বাধা দেন।
প্রতীকী উদ্যোগ বনাম দৈনন্দিন বাস্তবতা
এই বিতর্কের প্রেক্ষাপটে স্মরণ করা হচ্ছে গত ১৪ জুলাই পালিত ‘নারী শিক্ষার্থী দিবস’-এর কথাও। জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ সেদিন এক রাতের জন্য নারী শিক্ষার্থীদের রাত ১০টার পর হলের বাইরে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
তবে উদ্যাপনের বদলে অনেক শিক্ষার্থী এই উদ্যোগের প্রতিবাদ করেছিলেন। তাদের মতে, এটি ছিল প্রতীকী পদক্ষেপ, যা ক্যাম্পাসে নারীদের চলাচলের ওপর আরোপিত দৈনন্দিন বিধিনিষেধের মূল সমস্যাগুলো সমাধানে ব্যর্থ।
রিপোর্টারের নাম 






















