ঢাকা ০২:১৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

গুমকাণ্ডে অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের রহস্যজনক পলায়ন: গোয়েন্দা ব্যর্থতার চিত্র তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে

আওয়ামী লীগের প্রায় দেড় যুগের শাসনামলে সংঘটিত বিভিন্ন গুমের ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত একাধিক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তার রহস্যজনকভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘জোরপূর্বক গুম সম্পর্কিত তদন্ত কমিশন’। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে কমিশন উল্লেখ করেছে যে, এই কর্মকর্তারা কীভাবে এবং কাদের সহায়তায় পালাতে সক্ষম হলেন, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সুস্পষ্ট জবাব মেলেনি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এসব কর্মকর্তার ওপর নজরদারি রাখা বা তাদের পলায়নের পথ বন্ধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে কোনো একক ইউনিট এগিয়ে আসেনি। মূলত এই পলায়নকে অগ্রাধিকারভিত্তিক নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করার কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা কার্যকর না থাকার সুযোগ নিয়েই অভিযুক্ত জেনারেলরা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন।

গত ৪ জানুয়ারি জমা দেওয়া এই প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতিকে একটি বিস্তৃত গোয়েন্দা ও বাস্তবায়নগত ব্যর্থতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কমিশনের মতে, ডিজিএফআই, এমআই, এএসইউ এবং এনএসআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বিভিন্ন স্তরে এই ব্যর্থতা ছড়িয়ে আছে। এটি কেবল একটি সাধারণ পদ্ধতিগত ত্রুটি নয়, বরং একটি জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ যা ভবিষ্যতে অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) গুমের প্রমাণ মেলায় ১১ জন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করে। এই তালিকায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল সাইফুল আবেদীন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী, মেজর জেনারেল হামিদুল হক এবং মেজর জেনারেল তৌহিদ-উল-ইসলামের মতো নাম রয়েছে। তদন্তে স্পষ্ট হয়েছে যে, ‘আয়নাঘর’ ও জেআইসিতে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো এই জেনারেলদের প্রত্যক্ষ সম্মতি ও কমান্ড ছাড়া সম্ভব ছিল না।

কমিশনের প্রতিবেদনে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পালানোর প্রক্রিয়াকে তিনটি স্বতন্ত্র ‘ঢেউ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথম ঢেউটি ছিল ২০২৪ সালের আগস্টে, যখন মেজর জেনারেল মজিবুর রহমান দেশ ছাড়েন। দ্বিতীয় ঢেউটি দেখা যায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ওয়ারেন্ট জারির পরপরই। আর তৃতীয় ঢেউটি ঘটে ২০২৫ সালের অক্টোবরে, যখন দ্বিতীয় দফার ওয়ারেন্ট জারির মুখে মেজর জেনারেল কবির আহমেদ পালিয়ে যান। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, মেজর জেনারেল কবির আহমেদের পলায়নের মাত্র এক সপ্তাহ আগে কমিশন তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিল এবং তিনি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিলেন। এরপরও তিনি সেনানিবাসের মতো কঠোর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ থেকে কীভাবে নিখোঁজ হলেন, তা একটি বড় রহস্য। কমিশন আশঙ্কা করছে যে, এই কর্মকর্তাদের অনেকেই সম্ভবত ভারত সীমান্ত অতিক্রম করেছেন, যা আন্তঃসীমান্ত হস্তান্তরে পার্শ্ববর্তী দেশের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা এবং দীর্ঘদিনের দায়মুক্তির সংস্কৃতির দিকে ইঙ্গিত দেয়।

সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, পাসপোর্ট বাতিল এবং পরোয়ানা জারি থাকার পরও সেনানিবাসের ভেতরে অবস্থানরত কর্মকর্তারা কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন। কমিশন খুঁজে দেখেছে যে, মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স (এমআই) এবং আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট (এএসইউ)-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে এক ধরনের রক্ষণাত্মক মনোভাব বিদ্যমান। তারা দাবি করেছেন যে, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি রাখা তাদের ম্যান্ডেটের আওতাভুক্ত নয়। বারবার ঘটে যাওয়া এই পলায়নের ঘটনাগুলো বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে অনিশ্চিত করে তুলছে বলে তদন্ত কমিশন মনে করে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতের ওয়ানডে জয়ে বাংলাদেশের সৈকত, আইসিসি চুক্তিতে নেই বিসিবির বাধা

গুমকাণ্ডে অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের রহস্যজনক পলায়ন: গোয়েন্দা ব্যর্থতার চিত্র তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে

আপডেট সময় : ০৫:১৪:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

আওয়ামী লীগের প্রায় দেড় যুগের শাসনামলে সংঘটিত বিভিন্ন গুমের ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত একাধিক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তার রহস্যজনকভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘জোরপূর্বক গুম সম্পর্কিত তদন্ত কমিশন’। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে কমিশন উল্লেখ করেছে যে, এই কর্মকর্তারা কীভাবে এবং কাদের সহায়তায় পালাতে সক্ষম হলেন, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সুস্পষ্ট জবাব মেলেনি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এসব কর্মকর্তার ওপর নজরদারি রাখা বা তাদের পলায়নের পথ বন্ধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে কোনো একক ইউনিট এগিয়ে আসেনি। মূলত এই পলায়নকে অগ্রাধিকারভিত্তিক নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করার কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা কার্যকর না থাকার সুযোগ নিয়েই অভিযুক্ত জেনারেলরা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন।

গত ৪ জানুয়ারি জমা দেওয়া এই প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতিকে একটি বিস্তৃত গোয়েন্দা ও বাস্তবায়নগত ব্যর্থতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কমিশনের মতে, ডিজিএফআই, এমআই, এএসইউ এবং এনএসআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বিভিন্ন স্তরে এই ব্যর্থতা ছড়িয়ে আছে। এটি কেবল একটি সাধারণ পদ্ধতিগত ত্রুটি নয়, বরং একটি জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ যা ভবিষ্যতে অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) গুমের প্রমাণ মেলায় ১১ জন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করে। এই তালিকায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল সাইফুল আবেদীন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী, মেজর জেনারেল হামিদুল হক এবং মেজর জেনারেল তৌহিদ-উল-ইসলামের মতো নাম রয়েছে। তদন্তে স্পষ্ট হয়েছে যে, ‘আয়নাঘর’ ও জেআইসিতে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো এই জেনারেলদের প্রত্যক্ষ সম্মতি ও কমান্ড ছাড়া সম্ভব ছিল না।

কমিশনের প্রতিবেদনে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পালানোর প্রক্রিয়াকে তিনটি স্বতন্ত্র ‘ঢেউ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথম ঢেউটি ছিল ২০২৪ সালের আগস্টে, যখন মেজর জেনারেল মজিবুর রহমান দেশ ছাড়েন। দ্বিতীয় ঢেউটি দেখা যায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ওয়ারেন্ট জারির পরপরই। আর তৃতীয় ঢেউটি ঘটে ২০২৫ সালের অক্টোবরে, যখন দ্বিতীয় দফার ওয়ারেন্ট জারির মুখে মেজর জেনারেল কবির আহমেদ পালিয়ে যান। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, মেজর জেনারেল কবির আহমেদের পলায়নের মাত্র এক সপ্তাহ আগে কমিশন তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিল এবং তিনি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিলেন। এরপরও তিনি সেনানিবাসের মতো কঠোর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ থেকে কীভাবে নিখোঁজ হলেন, তা একটি বড় রহস্য। কমিশন আশঙ্কা করছে যে, এই কর্মকর্তাদের অনেকেই সম্ভবত ভারত সীমান্ত অতিক্রম করেছেন, যা আন্তঃসীমান্ত হস্তান্তরে পার্শ্ববর্তী দেশের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা এবং দীর্ঘদিনের দায়মুক্তির সংস্কৃতির দিকে ইঙ্গিত দেয়।

সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, পাসপোর্ট বাতিল এবং পরোয়ানা জারি থাকার পরও সেনানিবাসের ভেতরে অবস্থানরত কর্মকর্তারা কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন। কমিশন খুঁজে দেখেছে যে, মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স (এমআই) এবং আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট (এএসইউ)-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে এক ধরনের রক্ষণাত্মক মনোভাব বিদ্যমান। তারা দাবি করেছেন যে, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি রাখা তাদের ম্যান্ডেটের আওতাভুক্ত নয়। বারবার ঘটে যাওয়া এই পলায়নের ঘটনাগুলো বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে অনিশ্চিত করে তুলছে বলে তদন্ত কমিশন মনে করে।