দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চলমান থাকলেও কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না পরিকল্পিত ‘টার্গেট কিলিং’। জনবহুল ব্যস্ত সড়কে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে দিনে-দুপুরে একের পর এক লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। ঘাতকদের প্রাণঘাতী বুলেটের শিকার হচ্ছেন জুলাই বিপ্লবের অগ্রসৈনিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা, ব্যবসায়ী এবং সংবাদকর্মীরা। অধিকাংশ ঘটনায় মূল অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ায় দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ ধরনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ভিত্তিক হত্যাকাণ্ড আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশিষ্টজনদের মতে, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই নাজুক অবস্থা বজায় থাকলে তার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি আসন্ন নির্বাচনে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর কাওরান বাজারের মতো জনাকীর্ণ স্থানে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে অত্যন্ত পেশাদার ভঙ্গিতে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। মাত্র ১৫ সেকেন্ডের এই কিলিং মিশনে ঘাতকরা আগে থেকেই ওত পেতে ছিল এবং মুসাব্বিরকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে অনায়াসে পালিয়ে যায়। এই ঘটনায় ভ্যান সমিতির একজন নেতাও গুলিবিদ্ধ হন। সিসিটিভি ফুটেজে শুটারদের ছবি শনাক্ত করা গেলেও ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। একইভাবে গত ডিসেম্বরে পুরানা পল্টনে খুব কাছ থেকে মাথায় গুলি করা হয় ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদিকে, যিনি পরে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়া যশোর, চট্টগ্রাম ও খুলনায় বিএনপি নেতা এবং সাংবাদিকদের ওপর একই কায়দায় হামলা চালানো হয়েছে, যা পরিকল্পিত অপরাধের একটি বিপজ্জনক প্যাটার্ন নির্দেশ করে।
পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশে হত্যাকাণ্ডের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে খুনের ঘটনা ৩২৭টি বৃদ্ধি পেয়ে মোট ৩ হাজার ৭৬৭টিতে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি মাসে দেশে গড়ে প্রায় ৩০০-র বেশি খুনের মামলা রেকর্ড হচ্ছে, যার মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম রেঞ্জে অপরাধের হার সবচেয়ে বেশি। ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী জানিয়েছেন, পারিবারিক কলহ ও পূর্বশত্রুতার পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ফ্যাসিবাদী শক্তির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর অপতৎপরতা এই খুনের ঘটনাগুলোর অন্যতম কারণ। তবে পুলিশ অধিকাংশ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতাভুক্ত করতে বদ্ধপরিকর বলে তিনি দাবি করেন।
নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতির জন্য গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে ‘ডেভিল হান্ট’ অভিযানের আশানুরূপ কোনো দৃশ্যমান ফল না পাওয়ায় অপরাধীরা এখনো সক্রিয় রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে প্রচার করার ফলে খুনিরা পার পেয়ে যাওয়ার মানসিক প্রশ্রয় পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা এবং ঘাতকদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে না পারলে ভোটারদের মনে ভীতি সৃষ্টি হবে। এই টার্গেট কিলিংয়ের সংস্কৃতি বন্ধ না হলে নির্বাচনী পরিবেশ প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রবল হয়ে উঠবে।
রিপোর্টারের নাম 
























