ঢাকা ০৫:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

সরীসৃপতন্ত্র

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:০৫:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

৮ নভেম্বর ১৯৮৭, সন্ধ্যা ৭টা

খানিকটা টিকটিকির অনুপ্রেরণায়, অনেকটা নিজের পেটের তাড়নায় এবং বৃষ্টিস্নাত রাতের প্রভাবে মোকাম এসে দাঁড়ায় নাজমুল জেনারেল স্টোরের উল্টো পাশে। উদ্দেশ্য—ডিম-খিচুড়ির বন্দোবস্ত করা। সড়কের আলো-আঁধারির অবগুণ্ঠনে মিশে মোকাম সরু চোখে তাকিয়ে থাকে নাজমুল এবং সালেহ কাকার দোকান দুটির দিকে। নাজমুল সালেহ কাকার দোকানের সবচেয়ে কর্মঠ এবং চালু কর্মচারী ছিল। টানা বেশ কয়েক বছর দিনরাত এক করে সালেহ কাকার এই বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কাজ করে দোকানদারি শিখেছে সে। তারপর একদিন তাকে কদমবুসি করে ঠিক তার পাশেই নিজে একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর খুলে বসেছে। মহল্লার সমস্ত মুদি সরঞ্জামের একমাত্র সাপ্লায়ার সালেহ চাচা, তার এত দিনের চ্যালা তাকেই চ্যালেঞ্জ করে ঠিক পাশেই আরেকটা দোকান খুলে বসলে তিনি হাসিমুখেই তাকে বিদায় দেন, কিন্তু সেই হাসিতে তার অন্তরের প্রতিফলন ছিল না।

দুই দোকানই মুদি সরঞ্জাম বিক্রি করে, কিন্তু তাদের মাঝে একটা তফাত আছে। সালেহ কাকার দোকানে একটা বড় ক্যাসেট প্লেয়ার আছে। পুরোনো, কিন্তু অনেক আওয়াজ। তাতে থেমে থেমে সামান্য বিরতি দিয়ে সারা দিন ধরে বাজতে থাকে ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ, জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ’ গানটি। নাজমুল নিজে নতুন দোকান খুলেই একই সাইজের একটা ক্যাসেট প্লেয়ার দোকানে সেট করে। এলাকার মানুষ অবাক হয়ে শোনে, নাজমুলের ক্যাসেট প্লেয়ারে বাজছে— ‘জয় বাংলা বাংলার জয়, হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়…’ ইত্যাদি। তারপর কিছুদিনের জন্য দুই গানের প্রতিযোগিতায় মহল্লার মানুষ বিরক্ত হয়, কেউ কেউ এ-ও বলে বসে, হুমু এরশাদই ভালো।

কথা হচ্ছে, নাজমুলের ওপর সালেহ চাচার যে আশীর্বাদের হাত, তা আদতে ওপরে ওপরেই। আর এটা মহল্লাবাসীদের অনেক আগে বুঝতে পারে নাজমুল নিজেই। পানিতে নেমে কুমিরের সাথে লড়াই করা যায় না। সালেহ চাচার সাথে পাল্লা দিয়ে ক্যাসেট প্লেয়ার বাজানোর মতো বেয়াদবি করে তার পক্ষে মহল্লায় টিকে থাকার কথা নয়। কিন্তু মহল্লায় কিছু নতুন চাপানউতোর ঘটছে, যার সূত্রে নাজমুলেরও পায়ের নিচের মাটি পোক্ত হয়েছে অনেকটা। আজ প্রায় এক বছর ধরে নাজমুলের দোকানের সামনে একটা বাইক দাঁড় করানো থাকে। বাইকের গুঁফো মালিক ঘাড়ে-গর্দানে বেশ লম্বা। সানগ্লাস চোখে দিয়ে লোকটি যখন নাজমুলের দোকানের সামনে বাইক পার্ক করিয়ে নেমে দাঁড়ায়, ওকে ঘিরে ভিড় জমে যায় মহল্লার উঠতি রংবাজ ছেলেপেলেদের। নাজমুল ত্রস্তভাবে দোকান থেকে বেরিয়ে এসে বরফঠান্ডা কোলার বোতল এগিয়ে দেয় তার দিকে। সে বোতলের পাইপটা ছুড়ে ফেলে দেয় খড়কুটোর মতো। ছোট এক ঢোঁক কোলা গিলে তারপর সে বোতল এগিয়ে দেয় তার আশপাশের চ্যালাচামুণ্ডাদের দিকে। এই লোকের একটা হাত কাঁধের ওপর না থাকলে নাজমুলের মহল্লা থেকে পাততাড়ি গোটাতে সময় লাগত না। বরং সালেহ কাকা আর নাজমুলের রেষারেষি এখন বেশ কমে এসেছে। সালেহ কাকা ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ ছাড়লে নাজমুল তখন ক্যাসেট প্লেয়ার বন্ধ করে রাখে। পাশের দোকানের প্লেয়ারে গান শেষ হলে পরে নাজমুলের দোকানে আবার সজোরে বেজে ওঠে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়।’ দুটো দোকানে দুটো ভিন্ন গান আলাদা আলাদাভাবে কয়েকবার বাজার পর মাঝারি সাউন্ডে একসাথে বাজতে থাকে প্রায় সারা দিন। এভাবে তাদের মাঝে আর ঠোকাঠুকি লাগে না। গান দুটোর কথা ও সুর হাতে হাত রেখে মিছিল করে এগিয়ে চলে। ছড়িয়ে পড়ে টাইগারপাড়ার পথে-প্রান্তরে।

নাজমুলের দোকানের অদূরে দাঁড়িয়ে এসব কথা মনে পড়ে মোকামের। সে আবারও চোখ সরু করে তাকিয়ে থাকে পাশাপাশি দুটো ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের দিকে। সালেহ কাকার দোকানে বড় চাচা বসে আছে। কাজেই সে দোকানে যাওয়ার উপায় নেই। যেতে হবে নাজমুলের দোকানেই। কিন্তু কোন মুখে গিয়ে দাঁড়াবে সে নাজমুলের সামনে? গিয়ে কীই-বা বলবে? মোকাম মনে মনে চেষ্টা করে কথা গোছাতে। কিন্তু কথারা জমাট বাঁধতে চায় না। নাজমুলের দোকানে তার শ খানেক টাকার ধারদেনা জমে আছে। সে টাকা পরিশোধ হবে কবে কিংবা কীভাবে, মোকামের জানা নেই। নাজমুল যখন সালেহ কাকার দোকানের কর্মচারী, তখন থেকেই নাজমুলের সঙ্গে তার পরিচয়। দুজনে সমবয়সী। মোকামকে স্থানীয় বাসিন্দা এবং বাড়িওয়ালা পরিবারের একজন হিসেবে নাজমুল সব সময় সম্মান দিয়েছে। কিন্তু ধারদেনায় সাত রাজার সম্পত্তিও একদিন ফুরিয়ে আসে। আর নাজমুল তো সামান্য এক মুদিদোকানিমাত্র। এমতাবস্থায় ঘাড়ের ওপর দেনা আর পকেটে সব মিলিয়ে আধা কেজি নাজিরশাইল কেনার মতো পয়সা নিয়ে মোকাম যখন নাজমুলের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়, তার আক্ষরিক অর্থেই বলার মতো কিছু থাকে না।

‘নাজমুল ভাই, আছেন কেমন?’ মোকাম খেজুরে আলাপ শুরুর চেষ্টা করে। ‘অনেক দিন দেখাসাক্ষাৎ নাই আপনার সঙ্গে। আলাপ-সালাপও হয় না তেমন।’ এইটুকু বলে মোকাম আর কথা খুঁজে পায় না। গায়েপড়ে খেজুরে আলাপ করায় তার কোনো পারদর্শিতা নেই। এমনিতেই মোকাম গায়েপড়ে খেজুরে আলাপ চালাতে পারে না। তার ওপর টাকাপয়সা বাকি থাকায় গত দেড় মাস সে নাজমুলের দোকানের ছায়াও মাড়ায়নি। হায় বর্ষাস্নাত রাত! হায় ডিম-খিচুড়ি! লোভ মানুষকে কোথায় কোথায় এনে দাঁড় করিয়ে দেয়!

‘দেখাসাক্ষাৎ হইব কেমনে?’ নাজমুল কথা বলার সময় মোকামের দিকে ফিরেও তাকায় না। ‘আকাশের চানের সাক্ষাৎ কি আমাগো মতো আম আদমি প্রতিদিন পায়?’ মোকামের দিকে না তাকালেও ঠোঁটের কোণে এক বিদ্রূপের হাসি ঝুলিয়ে রাখতে সে ভোলে না, ‘মাঝেমইধ্যে আমাগো মতো গরিবের কথা আপনেগো মনে পড়ে, দয়া কইরা দেখা দিয়া যান, যেন চানের আলো আইয়া পড়ে আমার দোকানে, আর সেই আলো খাইয়াই তো আমরা বউ-বাচ্চা লইয়া বাঁইচা থাকি।’

মোকাম চুপসে যায়। তার গরম খিচুড়ি খাওয়ার হাউসের ওপর ঝপাস করে এক বালতি বরফগলা পানি ঢেলে দিয়েছে নাজমুল।

‘তা আজ কী মনে কইরা পায়ের ধুলা দিলেন?’ ভালো বিপদ! মোকাম মুখে কুলুপ আঁটলেও দেখা যায় নাজমুল তাকে ছাড়তে নারাজ। ‘বাকির টাকাগুলি দিবেন আইজ? দেশের হালহকিকত ভালো না। প্রায় দিনই দোকানে ব্যাচাবিক্রি হয় না। সোমায় সোমায় দোকান বন্ধ কইরা রাখা লাগে। টাকাপয়সার টানাটানিতে আছি। বউ-বাচ্চা লয়া ডাইল-ভাত খায়াও থাকার পারতেছি না।’

মাঝখানে বিরতিতে নিয়ে ক্যালকুলেটর টিপেটুপে কী সব হিসাব করে একটা টালি খাতায় টুকে রাখে সে। ‘পুরা টাকা দিবার না পারলে এক শটা টেকা দিয়া যান,’ নাজমুল বলে। তারপর জবাবে মোকামের তরফ থেকে দীর্ঘ নীরবতা ফিরে এলে সে প্রথমবারের মতো মোকামের দিকে চোখ তুলে তাকায়। বলে, ‘পঞ্চাশটা টেকাই দেন তাইলে?’

নাজমুলের কাঙ্ক্ষিত টাকার পরিমাণের এই ধারাবাহিক অবনমনকে মোকামের কাছে মানুষ হিসেবে তার অবনমন বলে মনে হয়। তার ভেতরে কিছু একটা বদল ঘটে। সে রূপান্তরিত হতে থাকে চূড়ান্ত রকমের বাসনাহীন এক বোবা প্রাণীতে, অনেক চেষ্টার পরও যার মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোয় না। ডিম-খিচুড়ির চিন্তায় তার নোলায় যেটুকু পানি জমা হয়েছিল, তা তার কাছে বিষের মতো লাগে। মোকাম শব্দ করে থুক ছিটায়। তবে তার থুতু দলা হয়ে বেরোয় না, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায় চারপাশে। নিদারুণ এ মুহূর্তেও মোকাম তার জীবনের এই ভিন্নতর দুঃখ ভুলতে পারে না যে সে জীবনে কখনোই একদলা থুতু একসঙ্গে থুক করে ফেলতে পারেনি। সব সময়ই তার থুতু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বেরোয় মুখ থেকে। অথচ সে পথেঘাটে কুলি-মুটে-দিনমজুর-রিকশাওয়ালা শ্রেণির অনেক মানুষকেই দেখেছে আরামসে দলা দলা থুতু থুক থুক করে ফেলতে। হতাশার অতল গভীরে ডুবে থেকে সে তোতলাতে তোতলাতে যতটুকু যা বলার, নাজমুলকে বলে। পত্রিকা অফিসের চাকরি নিয়ে তার হতাশার গল্প শোনায়। বেতন হয় না নিয়মিত, চাকরির নিশ্চয়তা নেই, সব দিক থেকে বিপদ ঘনিয়ে ধরেছে। বলে, বেতন পাওয়ামাত্রই সে তার সমস্ত পাওনা পুরোপুরি চুকিয়ে দেবে। নাজমুলের দোকানের সামনে থেকে ছায়ার মতো সরতে সরতে একপর্যায়ে সে অন্ধকারে মিশে যায়।

‘ও মা, আপনের দেহি খালি হাত!’

বাড়িতে ঢোকামাত্র টিকটিকিকে দেখে এই অপমানিত ভগ্ন হৃদয় নিয়েও মোকামের চোখ কপালে উঠে যায়। টিকটিকির পরনে লুঙ্গির পাশাপাশি একটা মেরিলিন মনরোর ছবি সাঁটা টি-শার্ট। চোখে কালো সানগ্লাস। পিঙ্ক কালারের টি-শার্টে ঠিক বুকের ওপর মেরিলিন মনরোর সেই বিখ্যাত স্কার্ট উড়তে থাকা ছবি। মনরোর ঠোঁটে সলজ্জ হাসি। ছবির নিচে লেখা, ‘কিস মি বেইবস।’ জোগাড় করল কোথা থেকে এসব?

‘কী করা,’ উপর্যুপরি কয়েকটা মানসিক ধাক্কা সামলে মোকাম স্বাভাবিক স্বরে কথা বলার চেষ্টা করা। ‘এমনিতেই ওই দোকানে আমার বেশ কিছু টাকা বাকি পড়ে আছে আজ অনেক দিন। আজও সে বাকিই চাওয়া লাগত। পাওয়া যেত না কিছুই। মাঝখানে শুধু শুধু অপমান হওয়া।’

‘এই আপনাদের মতো…কী যেন কয়…মধ্যবিত্ত…মিডল ক্লাস…হ্যাঁ হ্যাঁ, মিডল ক্লাস সেন্টিমেন্টের মানুষগুলিরে লয়া পারন যায় না,’ বৃষ্টিভেজা শীতের রাতে গরম গরম খিচুড়ি আর ডিমভাজি খেতে না পারার ক্ষোভে ফেটে পড়ে টিকটিকি। ‘দেখি, সরেন, সরেন…’

মোকামকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে সে বেরিয়ে যাওয়ার সময় মোকামের একবার মনে হয়, মিডল ক্লাস সেন্টিমেন্টের মতো এত খাপে খাপে মিলে যাওয়া একটা গালি টিকটিকি শিখল কোথায়, সেটা টিকটিকিকে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু উত্তেজিত টিকটিকিকে থামানোর সাহস হয় না তার। সে অনুভব করে যে টিকটিকি বুঝেশুনেই তাকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে কথাটি বলেছে। তবে মোকামের হাঁড়ির খবর আসলে জন্তুটা জানে না। মোকাম এখন ঠিক মধ্যবিত্ত নয়, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পর্যায়ে। দেশে স্থিতাবস্থা না এলে আর পত্রিকা অফিসে তার লেখাপত্রের বিল আর এক মাস আটকে রাখলেই সে আরও একধাপ পিছলে এসে নিম্নবিত্তে পরিণত হবে।

তবু কিছু একটা বলা লাগে, তাই মোকাম ঘুরে টিকটিকিকে প্রশ্ন করে, ‘কই যাচ্ছেন?’

‘বাহ্! এই তো…’ টিকটিকি সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়ে উত্তর দেয়। ‘আমারেই যদি আপনে-আজ্ঞে করেন, তাইলে যাগো ঝাড়ি মাইরা কাম আদায় করতে হয়, তাগো লগে পারবেন ক্যামনে?’

একমুহূর্ত কী যেন চিন্তা করে টিকটিকি মোকামকে হাত দিয়ে ইশারা করে বলে, ‘চলেন, আপনেও চলেন আমার লগে। এইডা আমার একার মিশন না।’

‘কিসের মিশন!’ মোকাম তার কণ্ঠের ভয় লুকাতে পারে না।

‘ডাকাতি। ডাকাতির মিশন।’ টিকটিকির কপাল বিরক্তিতে কুঁচকে যায়। ‘ব্যাংক ডাকাতি করতে যাইতেছি।’

ভয়ার্ত মোকামের মুখের হাঁ আর বন্ধ না হলে টিকটিকির কণ্ঠে একরাশ বিরক্তি ঝরে পড়ে—’আরে, ডিম-খিচুড়ির মিশন। আহেন তো অহন আমার লগে। যা লাগে, শালার কলার ধইরা নিয়া আসমু।’

মোকাম অনিচ্ছাসত্ত্বেও এক পা-দুই পা করে বেরিয়ে আসে দরজা দিয়ে। উঠোনে দাঁড়িয়ে মোকামের ঘাড় আপনাতেই বারান্দায় মৌলীর ঝুলে থাকা লাল গামছার ওপর চলে যায়। হাওয়ায় এখনো বৃষ্টির ছাট। ভেজা হাওয়ার ধাক্কায় সামনে-পিছে ক্রমাগত দুলতে থাকা সে গামছাকে স্পর্শ করা বাতাস মোকামের চোখেমুখে এসে লাগে। মৌলীর শরীরের সুবাস, অত দূর থেকেই যেন ছড়িয়ে পড়ে মোকামের মস্তিষ্কের অলিগলিতে।

থির দাঁড়িয়ে থাকা মোকাম আবিষ্কার করে, টিকটিকিও তার সামনে মূর্তিবৎ স্থির হয়ে দাঁড়ানো। বুকে মেরিলিন মনরোর স্কার্ট উড়ছে, চোখে কালো চশমা, হাতে লুঙ্গির একটা মাথা ধরা।

‘আপনার সমস্যাটা কী, জানেন?’

মোকাম টিকটিকির প্রশ্ন বুঝলেও প্রসঙ্গ বোঝে না। তার নানামুখী সমস্যা আছে, সেটা ঠিক। কিন্তু টিকটিকি কোন সমস্যাটার কথা বলছে এই মুহূর্তে?

‘আপনের সমস্যা হইল, পোলাও-কোরমা খাইতে আপনেরও মন চায়। তবে সেইটা স্বপ্নে। বাস্তবে কিছু করার ইচ্ছা-আগ্রহ কোনোটাই আপনার নাই।’ একটু বিরতি দিয়ে টিকটিকি ফের বলে, ‘আপনে এইখানেই খাড়ায়া খাড়ায়া ওই বারান্দার দিকে চায়া থাকেন। আমি লয়া আনতেছি, চাউল-ডাউল আর আন্ডা।’

‘বাসায় তেলও বোধয় শেষ…’ মোকাম আমতা-আমতা করে বলে।

টিকটিকির চোখে সানগ্লাস, তাই ওর চোখের ভাষা মোকাম পড়তে পারে না। ত্রিশ সেকেন্ড সময়টা খুব বেশি নয়, কিন্তু কেউ টানা ত্রিশ সেকেন্ড চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকলে অস্বস্তি লাগা স্বাভাবিক। প্রাণীটা ঠায় ত্রিশ সেকেন্ড তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে, তারপর উল্টো দিকে ঘুরে হাঁটা শুরু করে। টিপটিপ বৃষ্টিতে পিচঢালা ভেজা রাস্তার ওপর তার লেজ একবার বামে দোলে, একবার ডানে। তারপর আবার বামে এবং ডানে। বাগানজুড়ে এক অপরিচিত সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে। কোন ফুলের? তাদের বাগানে তো আর কোনো ফুলগাছের চারা লাগানো হয় না। মৌলীর বারান্দায় নিঃসঙ্গ ভেজা গামছাটা দুলছে একা একা। মোকামের চোখ ভেঙে ঘুম আসে। চলবে

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিপিএল মহারণ: আজ সিলেট-রংপুর, ঢাকা-রাজশাহী; টিভিতে কখন দেখবেন?

সরীসৃপতন্ত্র

আপডেট সময় : ১২:০৫:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

৮ নভেম্বর ১৯৮৭, সন্ধ্যা ৭টা

খানিকটা টিকটিকির অনুপ্রেরণায়, অনেকটা নিজের পেটের তাড়নায় এবং বৃষ্টিস্নাত রাতের প্রভাবে মোকাম এসে দাঁড়ায় নাজমুল জেনারেল স্টোরের উল্টো পাশে। উদ্দেশ্য—ডিম-খিচুড়ির বন্দোবস্ত করা। সড়কের আলো-আঁধারির অবগুণ্ঠনে মিশে মোকাম সরু চোখে তাকিয়ে থাকে নাজমুল এবং সালেহ কাকার দোকান দুটির দিকে। নাজমুল সালেহ কাকার দোকানের সবচেয়ে কর্মঠ এবং চালু কর্মচারী ছিল। টানা বেশ কয়েক বছর দিনরাত এক করে সালেহ কাকার এই বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কাজ করে দোকানদারি শিখেছে সে। তারপর একদিন তাকে কদমবুসি করে ঠিক তার পাশেই নিজে একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর খুলে বসেছে। মহল্লার সমস্ত মুদি সরঞ্জামের একমাত্র সাপ্লায়ার সালেহ চাচা, তার এত দিনের চ্যালা তাকেই চ্যালেঞ্জ করে ঠিক পাশেই আরেকটা দোকান খুলে বসলে তিনি হাসিমুখেই তাকে বিদায় দেন, কিন্তু সেই হাসিতে তার অন্তরের প্রতিফলন ছিল না।

দুই দোকানই মুদি সরঞ্জাম বিক্রি করে, কিন্তু তাদের মাঝে একটা তফাত আছে। সালেহ কাকার দোকানে একটা বড় ক্যাসেট প্লেয়ার আছে। পুরোনো, কিন্তু অনেক আওয়াজ। তাতে থেমে থেমে সামান্য বিরতি দিয়ে সারা দিন ধরে বাজতে থাকে ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ, জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ’ গানটি। নাজমুল নিজে নতুন দোকান খুলেই একই সাইজের একটা ক্যাসেট প্লেয়ার দোকানে সেট করে। এলাকার মানুষ অবাক হয়ে শোনে, নাজমুলের ক্যাসেট প্লেয়ারে বাজছে— ‘জয় বাংলা বাংলার জয়, হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়…’ ইত্যাদি। তারপর কিছুদিনের জন্য দুই গানের প্রতিযোগিতায় মহল্লার মানুষ বিরক্ত হয়, কেউ কেউ এ-ও বলে বসে, হুমু এরশাদই ভালো।

কথা হচ্ছে, নাজমুলের ওপর সালেহ চাচার যে আশীর্বাদের হাত, তা আদতে ওপরে ওপরেই। আর এটা মহল্লাবাসীদের অনেক আগে বুঝতে পারে নাজমুল নিজেই। পানিতে নেমে কুমিরের সাথে লড়াই করা যায় না। সালেহ চাচার সাথে পাল্লা দিয়ে ক্যাসেট প্লেয়ার বাজানোর মতো বেয়াদবি করে তার পক্ষে মহল্লায় টিকে থাকার কথা নয়। কিন্তু মহল্লায় কিছু নতুন চাপানউতোর ঘটছে, যার সূত্রে নাজমুলেরও পায়ের নিচের মাটি পোক্ত হয়েছে অনেকটা। আজ প্রায় এক বছর ধরে নাজমুলের দোকানের সামনে একটা বাইক দাঁড় করানো থাকে। বাইকের গুঁফো মালিক ঘাড়ে-গর্দানে বেশ লম্বা। সানগ্লাস চোখে দিয়ে লোকটি যখন নাজমুলের দোকানের সামনে বাইক পার্ক করিয়ে নেমে দাঁড়ায়, ওকে ঘিরে ভিড় জমে যায় মহল্লার উঠতি রংবাজ ছেলেপেলেদের। নাজমুল ত্রস্তভাবে দোকান থেকে বেরিয়ে এসে বরফঠান্ডা কোলার বোতল এগিয়ে দেয় তার দিকে। সে বোতলের পাইপটা ছুড়ে ফেলে দেয় খড়কুটোর মতো। ছোট এক ঢোঁক কোলা গিলে তারপর সে বোতল এগিয়ে দেয় তার আশপাশের চ্যালাচামুণ্ডাদের দিকে। এই লোকের একটা হাত কাঁধের ওপর না থাকলে নাজমুলের মহল্লা থেকে পাততাড়ি গোটাতে সময় লাগত না। বরং সালেহ কাকা আর নাজমুলের রেষারেষি এখন বেশ কমে এসেছে। সালেহ কাকা ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ ছাড়লে নাজমুল তখন ক্যাসেট প্লেয়ার বন্ধ করে রাখে। পাশের দোকানের প্লেয়ারে গান শেষ হলে পরে নাজমুলের দোকানে আবার সজোরে বেজে ওঠে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়।’ দুটো দোকানে দুটো ভিন্ন গান আলাদা আলাদাভাবে কয়েকবার বাজার পর মাঝারি সাউন্ডে একসাথে বাজতে থাকে প্রায় সারা দিন। এভাবে তাদের মাঝে আর ঠোকাঠুকি লাগে না। গান দুটোর কথা ও সুর হাতে হাত রেখে মিছিল করে এগিয়ে চলে। ছড়িয়ে পড়ে টাইগারপাড়ার পথে-প্রান্তরে।

নাজমুলের দোকানের অদূরে দাঁড়িয়ে এসব কথা মনে পড়ে মোকামের। সে আবারও চোখ সরু করে তাকিয়ে থাকে পাশাপাশি দুটো ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের দিকে। সালেহ কাকার দোকানে বড় চাচা বসে আছে। কাজেই সে দোকানে যাওয়ার উপায় নেই। যেতে হবে নাজমুলের দোকানেই। কিন্তু কোন মুখে গিয়ে দাঁড়াবে সে নাজমুলের সামনে? গিয়ে কীই-বা বলবে? মোকাম মনে মনে চেষ্টা করে কথা গোছাতে। কিন্তু কথারা জমাট বাঁধতে চায় না। নাজমুলের দোকানে তার শ খানেক টাকার ধারদেনা জমে আছে। সে টাকা পরিশোধ হবে কবে কিংবা কীভাবে, মোকামের জানা নেই। নাজমুল যখন সালেহ কাকার দোকানের কর্মচারী, তখন থেকেই নাজমুলের সঙ্গে তার পরিচয়। দুজনে সমবয়সী। মোকামকে স্থানীয় বাসিন্দা এবং বাড়িওয়ালা পরিবারের একজন হিসেবে নাজমুল সব সময় সম্মান দিয়েছে। কিন্তু ধারদেনায় সাত রাজার সম্পত্তিও একদিন ফুরিয়ে আসে। আর নাজমুল তো সামান্য এক মুদিদোকানিমাত্র। এমতাবস্থায় ঘাড়ের ওপর দেনা আর পকেটে সব মিলিয়ে আধা কেজি নাজিরশাইল কেনার মতো পয়সা নিয়ে মোকাম যখন নাজমুলের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়, তার আক্ষরিক অর্থেই বলার মতো কিছু থাকে না।

‘নাজমুল ভাই, আছেন কেমন?’ মোকাম খেজুরে আলাপ শুরুর চেষ্টা করে। ‘অনেক দিন দেখাসাক্ষাৎ নাই আপনার সঙ্গে। আলাপ-সালাপও হয় না তেমন।’ এইটুকু বলে মোকাম আর কথা খুঁজে পায় না। গায়েপড়ে খেজুরে আলাপ করায় তার কোনো পারদর্শিতা নেই। এমনিতেই মোকাম গায়েপড়ে খেজুরে আলাপ চালাতে পারে না। তার ওপর টাকাপয়সা বাকি থাকায় গত দেড় মাস সে নাজমুলের দোকানের ছায়াও মাড়ায়নি। হায় বর্ষাস্নাত রাত! হায় ডিম-খিচুড়ি! লোভ মানুষকে কোথায় কোথায় এনে দাঁড় করিয়ে দেয়!

‘দেখাসাক্ষাৎ হইব কেমনে?’ নাজমুল কথা বলার সময় মোকামের দিকে ফিরেও তাকায় না। ‘আকাশের চানের সাক্ষাৎ কি আমাগো মতো আম আদমি প্রতিদিন পায়?’ মোকামের দিকে না তাকালেও ঠোঁটের কোণে এক বিদ্রূপের হাসি ঝুলিয়ে রাখতে সে ভোলে না, ‘মাঝেমইধ্যে আমাগো মতো গরিবের কথা আপনেগো মনে পড়ে, দয়া কইরা দেখা দিয়া যান, যেন চানের আলো আইয়া পড়ে আমার দোকানে, আর সেই আলো খাইয়াই তো আমরা বউ-বাচ্চা লইয়া বাঁইচা থাকি।’

মোকাম চুপসে যায়। তার গরম খিচুড়ি খাওয়ার হাউসের ওপর ঝপাস করে এক বালতি বরফগলা পানি ঢেলে দিয়েছে নাজমুল।

‘তা আজ কী মনে কইরা পায়ের ধুলা দিলেন?’ ভালো বিপদ! মোকাম মুখে কুলুপ আঁটলেও দেখা যায় নাজমুল তাকে ছাড়তে নারাজ। ‘বাকির টাকাগুলি দিবেন আইজ? দেশের হালহকিকত ভালো না। প্রায় দিনই দোকানে ব্যাচাবিক্রি হয় না। সোমায় সোমায় দোকান বন্ধ কইরা রাখা লাগে। টাকাপয়সার টানাটানিতে আছি। বউ-বাচ্চা লয়া ডাইল-ভাত খায়াও থাকার পারতেছি না।’

মাঝখানে বিরতিতে নিয়ে ক্যালকুলেটর টিপেটুপে কী সব হিসাব করে একটা টালি খাতায় টুকে রাখে সে। ‘পুরা টাকা দিবার না পারলে এক শটা টেকা দিয়া যান,’ নাজমুল বলে। তারপর জবাবে মোকামের তরফ থেকে দীর্ঘ নীরবতা ফিরে এলে সে প্রথমবারের মতো মোকামের দিকে চোখ তুলে তাকায়। বলে, ‘পঞ্চাশটা টেকাই দেন তাইলে?’

নাজমুলের কাঙ্ক্ষিত টাকার পরিমাণের এই ধারাবাহিক অবনমনকে মোকামের কাছে মানুষ হিসেবে তার অবনমন বলে মনে হয়। তার ভেতরে কিছু একটা বদল ঘটে। সে রূপান্তরিত হতে থাকে চূড়ান্ত রকমের বাসনাহীন এক বোবা প্রাণীতে, অনেক চেষ্টার পরও যার মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোয় না। ডিম-খিচুড়ির চিন্তায় তার নোলায় যেটুকু পানি জমা হয়েছিল, তা তার কাছে বিষের মতো লাগে। মোকাম শব্দ করে থুক ছিটায়। তবে তার থুতু দলা হয়ে বেরোয় না, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায় চারপাশে। নিদারুণ এ মুহূর্তেও মোকাম তার জীবনের এই ভিন্নতর দুঃখ ভুলতে পারে না যে সে জীবনে কখনোই একদলা থুতু একসঙ্গে থুক করে ফেলতে পারেনি। সব সময়ই তার থুতু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বেরোয় মুখ থেকে। অথচ সে পথেঘাটে কুলি-মুটে-দিনমজুর-রিকশাওয়ালা শ্রেণির অনেক মানুষকেই দেখেছে আরামসে দলা দলা থুতু থুক থুক করে ফেলতে। হতাশার অতল গভীরে ডুবে থেকে সে তোতলাতে তোতলাতে যতটুকু যা বলার, নাজমুলকে বলে। পত্রিকা অফিসের চাকরি নিয়ে তার হতাশার গল্প শোনায়। বেতন হয় না নিয়মিত, চাকরির নিশ্চয়তা নেই, সব দিক থেকে বিপদ ঘনিয়ে ধরেছে। বলে, বেতন পাওয়ামাত্রই সে তার সমস্ত পাওনা পুরোপুরি চুকিয়ে দেবে। নাজমুলের দোকানের সামনে থেকে ছায়ার মতো সরতে সরতে একপর্যায়ে সে অন্ধকারে মিশে যায়।

‘ও মা, আপনের দেহি খালি হাত!’

বাড়িতে ঢোকামাত্র টিকটিকিকে দেখে এই অপমানিত ভগ্ন হৃদয় নিয়েও মোকামের চোখ কপালে উঠে যায়। টিকটিকির পরনে লুঙ্গির পাশাপাশি একটা মেরিলিন মনরোর ছবি সাঁটা টি-শার্ট। চোখে কালো সানগ্লাস। পিঙ্ক কালারের টি-শার্টে ঠিক বুকের ওপর মেরিলিন মনরোর সেই বিখ্যাত স্কার্ট উড়তে থাকা ছবি। মনরোর ঠোঁটে সলজ্জ হাসি। ছবির নিচে লেখা, ‘কিস মি বেইবস।’ জোগাড় করল কোথা থেকে এসব?

‘কী করা,’ উপর্যুপরি কয়েকটা মানসিক ধাক্কা সামলে মোকাম স্বাভাবিক স্বরে কথা বলার চেষ্টা করা। ‘এমনিতেই ওই দোকানে আমার বেশ কিছু টাকা বাকি পড়ে আছে আজ অনেক দিন। আজও সে বাকিই চাওয়া লাগত। পাওয়া যেত না কিছুই। মাঝখানে শুধু শুধু অপমান হওয়া।’

‘এই আপনাদের মতো…কী যেন কয়…মধ্যবিত্ত…মিডল ক্লাস…হ্যাঁ হ্যাঁ, মিডল ক্লাস সেন্টিমেন্টের মানুষগুলিরে লয়া পারন যায় না,’ বৃষ্টিভেজা শীতের রাতে গরম গরম খিচুড়ি আর ডিমভাজি খেতে না পারার ক্ষোভে ফেটে পড়ে টিকটিকি। ‘দেখি, সরেন, সরেন…’

মোকামকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে সে বেরিয়ে যাওয়ার সময় মোকামের একবার মনে হয়, মিডল ক্লাস সেন্টিমেন্টের মতো এত খাপে খাপে মিলে যাওয়া একটা গালি টিকটিকি শিখল কোথায়, সেটা টিকটিকিকে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু উত্তেজিত টিকটিকিকে থামানোর সাহস হয় না তার। সে অনুভব করে যে টিকটিকি বুঝেশুনেই তাকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে কথাটি বলেছে। তবে মোকামের হাঁড়ির খবর আসলে জন্তুটা জানে না। মোকাম এখন ঠিক মধ্যবিত্ত নয়, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পর্যায়ে। দেশে স্থিতাবস্থা না এলে আর পত্রিকা অফিসে তার লেখাপত্রের বিল আর এক মাস আটকে রাখলেই সে আরও একধাপ পিছলে এসে নিম্নবিত্তে পরিণত হবে।

তবু কিছু একটা বলা লাগে, তাই মোকাম ঘুরে টিকটিকিকে প্রশ্ন করে, ‘কই যাচ্ছেন?’

‘বাহ্! এই তো…’ টিকটিকি সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়ে উত্তর দেয়। ‘আমারেই যদি আপনে-আজ্ঞে করেন, তাইলে যাগো ঝাড়ি মাইরা কাম আদায় করতে হয়, তাগো লগে পারবেন ক্যামনে?’

একমুহূর্ত কী যেন চিন্তা করে টিকটিকি মোকামকে হাত দিয়ে ইশারা করে বলে, ‘চলেন, আপনেও চলেন আমার লগে। এইডা আমার একার মিশন না।’

‘কিসের মিশন!’ মোকাম তার কণ্ঠের ভয় লুকাতে পারে না।

‘ডাকাতি। ডাকাতির মিশন।’ টিকটিকির কপাল বিরক্তিতে কুঁচকে যায়। ‘ব্যাংক ডাকাতি করতে যাইতেছি।’

ভয়ার্ত মোকামের মুখের হাঁ আর বন্ধ না হলে টিকটিকির কণ্ঠে একরাশ বিরক্তি ঝরে পড়ে—’আরে, ডিম-খিচুড়ির মিশন। আহেন তো অহন আমার লগে। যা লাগে, শালার কলার ধইরা নিয়া আসমু।’

মোকাম অনিচ্ছাসত্ত্বেও এক পা-দুই পা করে বেরিয়ে আসে দরজা দিয়ে। উঠোনে দাঁড়িয়ে মোকামের ঘাড় আপনাতেই বারান্দায় মৌলীর ঝুলে থাকা লাল গামছার ওপর চলে যায়। হাওয়ায় এখনো বৃষ্টির ছাট। ভেজা হাওয়ার ধাক্কায় সামনে-পিছে ক্রমাগত দুলতে থাকা সে গামছাকে স্পর্শ করা বাতাস মোকামের চোখেমুখে এসে লাগে। মৌলীর শরীরের সুবাস, অত দূর থেকেই যেন ছড়িয়ে পড়ে মোকামের মস্তিষ্কের অলিগলিতে।

থির দাঁড়িয়ে থাকা মোকাম আবিষ্কার করে, টিকটিকিও তার সামনে মূর্তিবৎ স্থির হয়ে দাঁড়ানো। বুকে মেরিলিন মনরোর স্কার্ট উড়ছে, চোখে কালো চশমা, হাতে লুঙ্গির একটা মাথা ধরা।

‘আপনার সমস্যাটা কী, জানেন?’

মোকাম টিকটিকির প্রশ্ন বুঝলেও প্রসঙ্গ বোঝে না। তার নানামুখী সমস্যা আছে, সেটা ঠিক। কিন্তু টিকটিকি কোন সমস্যাটার কথা বলছে এই মুহূর্তে?

‘আপনের সমস্যা হইল, পোলাও-কোরমা খাইতে আপনেরও মন চায়। তবে সেইটা স্বপ্নে। বাস্তবে কিছু করার ইচ্ছা-আগ্রহ কোনোটাই আপনার নাই।’ একটু বিরতি দিয়ে টিকটিকি ফের বলে, ‘আপনে এইখানেই খাড়ায়া খাড়ায়া ওই বারান্দার দিকে চায়া থাকেন। আমি লয়া আনতেছি, চাউল-ডাউল আর আন্ডা।’

‘বাসায় তেলও বোধয় শেষ…’ মোকাম আমতা-আমতা করে বলে।

টিকটিকির চোখে সানগ্লাস, তাই ওর চোখের ভাষা মোকাম পড়তে পারে না। ত্রিশ সেকেন্ড সময়টা খুব বেশি নয়, কিন্তু কেউ টানা ত্রিশ সেকেন্ড চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকলে অস্বস্তি লাগা স্বাভাবিক। প্রাণীটা ঠায় ত্রিশ সেকেন্ড তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে, তারপর উল্টো দিকে ঘুরে হাঁটা শুরু করে। টিপটিপ বৃষ্টিতে পিচঢালা ভেজা রাস্তার ওপর তার লেজ একবার বামে দোলে, একবার ডানে। তারপর আবার বামে এবং ডানে। বাগানজুড়ে এক অপরিচিত সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে। কোন ফুলের? তাদের বাগানে তো আর কোনো ফুলগাছের চারা লাগানো হয় না। মৌলীর বারান্দায় নিঃসঙ্গ ভেজা গামছাটা দুলছে একা একা। মোকামের চোখ ভেঙে ঘুম আসে। চলবে