বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে সৌদি আরবের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার মালয়েশিয়া। কিন্তু সীমাহীন দুর্নীতির কারণে গত বছর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারটি বন্ধ রয়েছে। জানা গেছে, ২০২৩ সালে সাড়ে ৩ লাখের বেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় গেলেও ২০২৪ সালের জুন থেকে শ্রমবাজারটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওই বছর প্রায় এক লাখ কর্মী দেশটিতে যেতে পেরেছেন। তবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মাত্র তিনশ’র মতো জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে।
শ্রমখাত সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন যে, গত এক বছরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার ক্ষেত্রে সরকার চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। দুই দেশের সরকার প্রধানের কার্যালয় থেকে শুরু করে উপদেষ্টা, মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে দফায় দফায় দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও সফর সত্ত্বেও শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে আশানুরূপ কোনো অগ্রগতি বা সফলতা আসেনি। এর জন্য কূটনৈতিক ব্যর্থতার পাশাপাশি সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা এবং শ্রমিক পাঠানো নিয়ে ঢালাও মামলার প্রভাবকে দায়ী করা হচ্ছে। শ্রমখাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু শ্রমিকদের মতে, সরকার দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে এই বাজার খুলতে এবং মামলাবাজদের শাস্তি দিতে ব্যর্থ হলে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ এই শ্রমবাজারটিতে নেপাল ও ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গেলেও গত বছরের ৩১ মে থেকে বাংলাদেশসহ ১৫টি দেশের জন্য জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। তবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ইন্দোনেশিয়া, নেপালসহ অন্যান্য দেশ থেকে মালয়েশিয়া আবার শ্রমিক নিতে শুরু করেছে। চলতি বছর ইন্দোনেশিয়া ও নেপাল থেকে ৪১ হাজার ৩৭৩ জন শ্রমিক নিয়েছে মালয়েশিয়া, যেখানে নেপাল ২১ হাজার ১৮৩ জন ও ইন্দোনেশিয়া ২৯ হাজার ৯০০ শ্রমিক পাঠিয়েছে। এই দুটি দেশ থেকে আগামী জানুয়ারির মধ্যে আরও ৫০ হাজার শ্রমিক নেওয়া হবে, যার প্রক্রিয়াও শেষ হয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় গত এক বছরে বাংলাদেশে আটকে পড়া ১৮ হাজার শ্রমিকের মধ্যে মালয়েশিয়ায় গেছেন মাত্র ২৯০ জন। বাংলাদেশ বাদে অন্য ১৪টি দেশ ২০২৫ সালে ১ লাখ ১৩ হাজার ২২২ জন শ্রমিক পাঠানোর জন্য নিবন্ধন সম্পন্ন করেছে, সেখানে বাংলাদেশ থেকে চলতি বছর নিবন্ধন করেছেন মাত্র ১ হাজার ৮৫৩ জন।
২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত কলিং ভিসা, নিয়োগানুমতি, বিএমইইটির ছাড়পত্রসহ যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়া যেতে পারেননি। গত বছরের ৪ অক্টোবর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশ সফরের সময় এই শ্রমিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও এরপর বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের দুইবার মালয়েশিয়া সফর এবং কয়েক দফা যৌথ ওয়ার্কিং কমিটির সভা সত্ত্বেও শ্রমবাজার খোলার কোনো সুফল আসেনি। গত বছরের মে মাসে আটকে পড়া শ্রমিকদের মালয়েশিয়া পাঠানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ ওভারসিস এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডকে (বোয়েসেল) দেওয়া হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানটিও এসব শ্রমিক পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত জিটুজি প্লাস চুক্তি অনুযায়ী ৪ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক পাঠানোর ঘটনায় অর্থ পাচারের অভিযোগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বেশ কয়েকটি মামলা করেছে। এসব মামলায় সরাসরি অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগ আনা হয়। মামলার সঠিক তদন্ত না হওয়ায় মালয়েশিয়া সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে যে, এসব ‘অপ্রমাণিত’ অভিযোগ প্রত্যাহার না করা হলে তারা বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেবে না। এদিকে, গত জুলাই থেকে ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৯০ জন শ্রমিক পাঠানো গেছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আটকে পড়া বাকি শ্রমিকদের পাঠানো সম্ভব না হলে তাঁদেরও কপাল পুড়বে। আটকে পড়া শ্রমিকদের বিনা খরচে পাঠানোর কথা থাকলেও তাঁদের কাছ থেকে ১ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে গত ৪ সেপ্টেম্বর জারি করা সার্কুলারে শ্রমিক পাঠানোর এই খরচ নির্ধারণ করা হয়। জানা গেছে, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জন্য সরকার অনুমোদিত খরচ ছিল ৭৮ হাজার ৯০০ টাকা। বোয়েসেল তাদের বোর্ড সভার মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়ার পর এরই মধ্যে মালয়েশিয়ার একটি সংস্থাকে ভিসা কেনার জন্য অবৈধভাবে হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আলতাফ খান ও মালয়েশিয়ান নাগরিক জসওয়ান সিংয়ের মাধ্যমে ৭৫ হাজার টাকা করে পাঠিয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান কীভাবে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে বলছেন, সরকারি সংস্থা বোয়েসেল অবৈধভাবে ভিসা ট্রেডিং ও মানবপাচারে জড়িত হয়ে পড়েছে, অথচ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা বা অন্য কাউকে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
জনশক্তি রপ্তানি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশ সরকার, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা, কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং বোয়েসেল মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সিনিয়র সদস্য মোবারক উল্লাহ শিমুল বলেন, তাঁরা লোক পাঠালে ভিসা ট্রেডের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং ও মানবপাচারের মামলা হয়, অথচ এখন সরকারি সংস্থাও একই কাজ করছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করবে কে? তিনি জানান, বোয়েসেল যে ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা নিচ্ছে, তার মধ্যে এক লাখ টাকা রাখা হয়েছে ভিসা কেনা বাবদ এবং কোনো বৈধ চ্যানেলে এসব অর্থ পাঠানোর তথ্য জানা নেই। তিনি আরও বলেন, দুই দেশের সরকার প্রধান পর্যায়ে সভা করে আটকে পড়া ১৮ হাজার শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেও বোয়েসেল প্রথমে ১৪ হাজার এবং পরে ৭ হাজার ৮০০ জনকে পাঠানোর টার্গেট নির্ধারণ করে। কিন্তু বেঁধে দেওয়া ছয় মাসের মাত্র ১৫ দিন বাকি থাকলেও শ্রমিক গেছে মাত্র ১৯০ জন। বাকি শ্রমিক আদৌ যেতে পারবে কিনা তা নিশ্চিত নয়, অথচ ওইসব শ্রমিকের ডিমান্ড ভিসা সবই এনেছিল বেসরকারি এজেন্সিগুলো।
রিপোর্টারের নাম 

























