ঢাকা ০৮:৪১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

অব্যবস্থাপনা আর জনবল সংকটে ধুঁকছে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:০৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট দেশের অন্যতম বিশেষায়িত চোখের চিকিৎসার হাসপাতাল। হাসপাতালটিতে প্রতিদিন সকালে দুই হাজারেরও বেশি রোগী চোখের চিকিৎসার জন্য হাজির হন।

তবে সেবার চাহিদা থাকার পরও দুপুর ২টার আগেই চিকিৎসা কার্যক্রম ধীরে ধীরে থমকে যায়। দুপুরের পর চিকিৎসক ও নার্সদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, ফলে হাসপাতালের অনেক বিভাগ কার্যত ফাঁকা হয়ে যায়। বিনামূল্যে বিতরণের ওষুধের সংকট, অপর্যাপ্ত সেবা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও রয়েছে।

সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) পরিচালিত একটি “ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট” প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের কথা উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনটিতে “জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ” প্রকল্পে ব্যাপক ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা এবং অনিয়মের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে প্রকল্পটির মূল্যায়ন করেছে ইউসুফ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস।

তিন বছরের মেয়াদে অনুমোদিত এই প্রকল্প শেষ হতে সময় লেগেছে ১৬ বছর।

১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটির আধুনিকায়ন ও পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০০৩ সালে, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০০৬ সালে। তবে সাতবার সময়সীমা বাড়ানোর পর প্রকল্পটি শেষ হয় ২০১৯ সালে। ৮৮ কোটি টাকা থেকে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৩ কোটি টাকায়।

এত সময় ও ব্যয় সত্ত্বেও আইএমইডির মূল্যায়নে দেখা গেছে, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এখনও চরম জনবল সংকটে ভুগছে। চিকিৎসক ও নার্সের ১৫৪টি পদ এখনও শূন্য।

স্থাপিত ৭০ ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জামের মধ্যে বেশ কয়েকটি উচ্চমূল্যের যন্ত্র অচল অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে রোগীরা গুরুত্বপূর্ণ ডায়াগনস্টিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জরিপে দেখা গেছে, রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষা ও বারবার হাসপাতাল আসা-যাওয়া করতে হয়। অনেকে চিকিৎসা পেতে চারবার পর্যন্ত আসতে বাধ্য হন। জরিপে অংশ নেওয়া মাত্র ৮% রোগী প্রথমবারেই সেবা পেয়েছেন।

অধিকাংশ রোগী জানান, বিনামূল্যে দেওয়ার কথা থাকলেও প্রেসক্রাইব করা সব ওষুধ হাসপাতালে মেলে না।

হাসপাতালের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অবস্থা আরও নাজুক।

বেজমেন্টের স্যানিটারি পাইপে ছিদ্র, নর্দমা ব্যবস্থা অকার্যকর, বিভিন্ন স্থানে আবর্জনার স্তূপ দেখা গেছে সরেজমিন। হাসপাতালের বিভাগগুলো খুঁজে পেতে রোগীরা বিড়ম্বনায় পড়েন, এমনকি জরুরি বিভাগেও সরাসরি প্রবেশপথ নেই।

সম্প্রতি ভূমিকম্পে ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় সেবা চলতে থাকলেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

আইএমইডি তাদের প্রতিবেদনে হাসপাতালের সব কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশনসহ টিকিটিং ব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মীদের আচরণগত প্রশিক্ষণ এবং রোগীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়াও সেবার সময় বাড়িয়ে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এবং দুই শিফট চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইনস্টিটিউটের পরিচালক মো. জানে আলাম মৃধা বলেন, আইএমইডির মূল্যায়নটি তার যোগদানের আগের সময়ে করা।

তিনি বলেন, “প্রতিবেদনে উল্লেখিত বিষয়গুলো আমরা পর্যালোচনা করবো এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবো। আমি যোগদানের পর থেকেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীরা ভালো চিকিৎসা পাচ্ছেন। নার্সদের আচরণ নিয়ে অভিযোগ মাঝে মধ্যে আসে, রোগীর চাপ বাড়লে এমনটা হতে পারে। তবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উন্নতি সম্ভব।

তিনি আরও জানান, ভূমিকম্পে সৃষ্ট ফাটলের বিষয়টি গণপূর্ত অধিদফতরে জানানো হয়েছে। জনবল সংকট পর্যালোচনা করে নিয়োগের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ফটিকছড়িতে গুলিতে যুবক নিহত: জামায়াত কর্মীর পরিচয় দাবি, থমথমে জনপদ, মেলেনি মামলা

অব্যবস্থাপনা আর জনবল সংকটে ধুঁকছে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট

আপডেট সময় : ১০:০৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট দেশের অন্যতম বিশেষায়িত চোখের চিকিৎসার হাসপাতাল। হাসপাতালটিতে প্রতিদিন সকালে দুই হাজারেরও বেশি রোগী চোখের চিকিৎসার জন্য হাজির হন।

তবে সেবার চাহিদা থাকার পরও দুপুর ২টার আগেই চিকিৎসা কার্যক্রম ধীরে ধীরে থমকে যায়। দুপুরের পর চিকিৎসক ও নার্সদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, ফলে হাসপাতালের অনেক বিভাগ কার্যত ফাঁকা হয়ে যায়। বিনামূল্যে বিতরণের ওষুধের সংকট, অপর্যাপ্ত সেবা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও রয়েছে।

সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) পরিচালিত একটি “ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট” প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের কথা উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনটিতে “জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ” প্রকল্পে ব্যাপক ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা এবং অনিয়মের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে প্রকল্পটির মূল্যায়ন করেছে ইউসুফ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস।

তিন বছরের মেয়াদে অনুমোদিত এই প্রকল্প শেষ হতে সময় লেগেছে ১৬ বছর।

১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটির আধুনিকায়ন ও পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০০৩ সালে, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০০৬ সালে। তবে সাতবার সময়সীমা বাড়ানোর পর প্রকল্পটি শেষ হয় ২০১৯ সালে। ৮৮ কোটি টাকা থেকে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৩ কোটি টাকায়।

এত সময় ও ব্যয় সত্ত্বেও আইএমইডির মূল্যায়নে দেখা গেছে, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এখনও চরম জনবল সংকটে ভুগছে। চিকিৎসক ও নার্সের ১৫৪টি পদ এখনও শূন্য।

স্থাপিত ৭০ ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জামের মধ্যে বেশ কয়েকটি উচ্চমূল্যের যন্ত্র অচল অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে রোগীরা গুরুত্বপূর্ণ ডায়াগনস্টিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জরিপে দেখা গেছে, রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষা ও বারবার হাসপাতাল আসা-যাওয়া করতে হয়। অনেকে চিকিৎসা পেতে চারবার পর্যন্ত আসতে বাধ্য হন। জরিপে অংশ নেওয়া মাত্র ৮% রোগী প্রথমবারেই সেবা পেয়েছেন।

অধিকাংশ রোগী জানান, বিনামূল্যে দেওয়ার কথা থাকলেও প্রেসক্রাইব করা সব ওষুধ হাসপাতালে মেলে না।

হাসপাতালের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অবস্থা আরও নাজুক।

বেজমেন্টের স্যানিটারি পাইপে ছিদ্র, নর্দমা ব্যবস্থা অকার্যকর, বিভিন্ন স্থানে আবর্জনার স্তূপ দেখা গেছে সরেজমিন। হাসপাতালের বিভাগগুলো খুঁজে পেতে রোগীরা বিড়ম্বনায় পড়েন, এমনকি জরুরি বিভাগেও সরাসরি প্রবেশপথ নেই।

সম্প্রতি ভূমিকম্পে ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় সেবা চলতে থাকলেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

আইএমইডি তাদের প্রতিবেদনে হাসপাতালের সব কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশনসহ টিকিটিং ব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মীদের আচরণগত প্রশিক্ষণ এবং রোগীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়াও সেবার সময় বাড়িয়ে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এবং দুই শিফট চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইনস্টিটিউটের পরিচালক মো. জানে আলাম মৃধা বলেন, আইএমইডির মূল্যায়নটি তার যোগদানের আগের সময়ে করা।

তিনি বলেন, “প্রতিবেদনে উল্লেখিত বিষয়গুলো আমরা পর্যালোচনা করবো এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবো। আমি যোগদানের পর থেকেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীরা ভালো চিকিৎসা পাচ্ছেন। নার্সদের আচরণ নিয়ে অভিযোগ মাঝে মধ্যে আসে, রোগীর চাপ বাড়লে এমনটা হতে পারে। তবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উন্নতি সম্ভব।

তিনি আরও জানান, ভূমিকম্পে সৃষ্ট ফাটলের বিষয়টি গণপূর্ত অধিদফতরে জানানো হয়েছে। জনবল সংকট পর্যালোচনা করে নিয়োগের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।