ঢাকা ০৫:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

প্রফেসর মুহাম্মদ মোহর আলী: প্রাচ্যতত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ ও দক্ষিণ এশীয় মুসলিম ইতিহাসের পুনর্গঠন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:০০:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

প্রফেসর মুহাম্মদ মোহর আলীর বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনাকে নিছক বিংশ শতাব্দীর এক বাঙালি ইতিহাসবিদের কর্মতৎপরতা হিসেবে দেখলে তার প্রতিভার প্রতি অবিচার করা হবে; মূলত তার কাজ ছিল প্রাচ্যতত্ত্বের (Orientalism) পদ্ধতিগত ব্যবচ্ছেদ এবং দক্ষিণ এশীয় মুসলিম ইতিহাসের পুনর্গঠন প্রচেষ্টা।

১৯২৯ সালে খুলনায় জন্মগ্রহণকারী মোহর আলীর শিক্ষাজীবনের শুরু হয় স্থানীয় স্কুলে। ১৯৪৪-৪৫ সালে হুগলি মাদরাসায় যোগদানের মাধ্যমে তার জ্ঞানতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সত্তার প্রকৃত বিকাশ ঘটে। হুগলি মহসিন কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস লীগের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং ১৯৪৬ সালে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ পরবর্তী জীবনে তার ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম এবং শাহ আজিজুর রহমানের মতো শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সাহচর্যে রাজনৈতিক পরিপক্বতা অর্জন করেন। দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং কাজী নজরুল ইসলাম কলেজ থেকে শিক্ষা সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন।

তার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ এবং রাজশাহী সরকারি কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন এবং সেখানেই তার গবেষক-জীবনের সূচনা হয়। মোহর আলীর বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার ‘এভিডেন্স-ড্রিভেন’ বা তথ্যপ্রমাণনির্ভর পদ্ধতি, যার মাধ্যমে তিনি বাংলার মুসলিম ইতিহাস এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সিরাত ও কোরআনের অলঙ্ঘনীয়তাকে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করেছেন।

মোহর আলীর পাণ্ডিত্যের ব্যাপ্তি ছিল আন্তর্জাতিক। লন্ডনের সোয়াস (SOAS) থেকে পিএইচডি এবং লিংকন’স ইন থেকে ‘ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি অর্জন তার বিশ্লেষণ ক্ষমতাকে অনন্য করে তুলেছিল। একজন ইতিহাসবিদের বিবরণ ও বিশ্লেষণ এবং একজন ব্যারিস্টারের বিচারিক মেধা—এই দুয়ের মিশেলে তিনি ইতিহাসের প্রচলিত অনেক ভুল বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ ও মদিনার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অধ্যাপনা করেন। সেখানে তিনি বাংলার ইতিহাস, সিরাত এবং কোরআন গবেষণা-সংক্রান্ত কালজয়ী গ্রন্থগুলো রচনা করেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‘ইরানকে দমানোর সক্ষমতা নিয়ে ভুল ধারণা পোষণ করছে যুক্তরাষ্ট্র’

প্রফেসর মুহাম্মদ মোহর আলী: প্রাচ্যতত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ ও দক্ষিণ এশীয় মুসলিম ইতিহাসের পুনর্গঠন

আপডেট সময় : ০৩:০০:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬

প্রফেসর মুহাম্মদ মোহর আলীর বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনাকে নিছক বিংশ শতাব্দীর এক বাঙালি ইতিহাসবিদের কর্মতৎপরতা হিসেবে দেখলে তার প্রতিভার প্রতি অবিচার করা হবে; মূলত তার কাজ ছিল প্রাচ্যতত্ত্বের (Orientalism) পদ্ধতিগত ব্যবচ্ছেদ এবং দক্ষিণ এশীয় মুসলিম ইতিহাসের পুনর্গঠন প্রচেষ্টা।

১৯২৯ সালে খুলনায় জন্মগ্রহণকারী মোহর আলীর শিক্ষাজীবনের শুরু হয় স্থানীয় স্কুলে। ১৯৪৪-৪৫ সালে হুগলি মাদরাসায় যোগদানের মাধ্যমে তার জ্ঞানতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সত্তার প্রকৃত বিকাশ ঘটে। হুগলি মহসিন কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস লীগের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং ১৯৪৬ সালে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ পরবর্তী জীবনে তার ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম এবং শাহ আজিজুর রহমানের মতো শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সাহচর্যে রাজনৈতিক পরিপক্বতা অর্জন করেন। দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং কাজী নজরুল ইসলাম কলেজ থেকে শিক্ষা সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন।

তার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ এবং রাজশাহী সরকারি কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন এবং সেখানেই তার গবেষক-জীবনের সূচনা হয়। মোহর আলীর বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার ‘এভিডেন্স-ড্রিভেন’ বা তথ্যপ্রমাণনির্ভর পদ্ধতি, যার মাধ্যমে তিনি বাংলার মুসলিম ইতিহাস এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সিরাত ও কোরআনের অলঙ্ঘনীয়তাকে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করেছেন।

মোহর আলীর পাণ্ডিত্যের ব্যাপ্তি ছিল আন্তর্জাতিক। লন্ডনের সোয়াস (SOAS) থেকে পিএইচডি এবং লিংকন’স ইন থেকে ‘ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি অর্জন তার বিশ্লেষণ ক্ষমতাকে অনন্য করে তুলেছিল। একজন ইতিহাসবিদের বিবরণ ও বিশ্লেষণ এবং একজন ব্যারিস্টারের বিচারিক মেধা—এই দুয়ের মিশেলে তিনি ইতিহাসের প্রচলিত অনেক ভুল বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ ও মদিনার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অধ্যাপনা করেন। সেখানে তিনি বাংলার ইতিহাস, সিরাত এবং কোরআন গবেষণা-সংক্রান্ত কালজয়ী গ্রন্থগুলো রচনা করেন।