ঢাকা ১২:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

সন্তানের অবহেলায় মায়ের গলিত লাশ: সভ্য সমাজের অন্দরমহলের কদর্য চিত্র উন্মোচিত

সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরে এক মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সমাজের এক অন্ধকার দিককে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ৭৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা মায়ের গলিত ও পোকায় ধরা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং তথাকথিত আধুনিক ও সভ্য সমাজের ভেতরের কুৎসিত পচন এবং চরম আত্মকেন্দ্রিকতার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। মৃত নুরজাহান বেগম কোনো নিঃস্ব বা অনাথ ছিলেন না; তিনি রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, প্রবাসী এবং স্কুলশিক্ষিকা—এমন সন্তানদের গর্বিত মা ছিলেন। অথচ তার শেষ আশ্রয় ছিল এক ফ্ল্যাট, যেখানে তার নিজের মেয়ের সঙ্গে বসবাস করতেন। এই বৈপরীত্য একদিকে যেমন বেদনাদায়ক, তেমনই মানুষের বাহ্যিক চাকচিক্য ও ভেতরের পচনকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করে।

শহরের ফ্ল্যাট সংস্কৃতি আমাদের অনেক সুবিধা দিলেও, তা অনেক সময় মানবিক সম্পর্কগুলোকে ফিকে করে দেয়। ইট-পাথরের এই খাঁচাগুলোতে মানুষ এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে যে, পাশের ফ্ল্যাটে বা পাশের ঘরে কী ঘটছে, তা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা থাকে না। এই ঘটনায় প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেয়ে পুলিশকে খবর দিলে বিষয়টি জানাজানি হয়। শহর আমাদের আধুনিকতা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিবেশীর প্রতি বা সমাজবদ্ধ মানুষের প্রতি যে দায়বদ্ধতা ছিল, তা যেন কেড়ে নিয়েছে। চারপাশের দেয়ালগুলো শুধু সিমেন্টের নয়, এগুলো আসলে আমাদের বিবেকের দেয়াল। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, মা তার নিজের মেয়ের সঙ্গেই ওই বাসায় থাকতেন, অথচ বাসাটি ছিল নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও এলোমেলো। এর অর্থ হলো, একই বাসায় থেকেও মা ও মেয়ের মধ্যে কোনো আত্মিক বা শারীরিক যোগাযোগ ছিল না। মেয়ে হয়তো নিজের জীবন, চাকরি বা অন্য কোনো ঘোরের মধ্যে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, পাশের ঘরে তার বৃদ্ধ মা বেঁচে আছেন কি না—এমনকি খেয়েছেন কি না—এই খোঁজ নেওয়ার ন্যূনতম মানবিক বোধটুকুও তার লোপ পেয়েছিল। এটি এক ধরনের সক্রিয় অবহেলা, যা এক নীরব হত্যাকাণ্ড।

এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) পদ থেকে তাকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘বাবা-মায়ের ভরণপোষণ আইন’ অনুযায়ী এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সকলের জন্য একটি বড় ধাক্কা এবং আত্ম-অনুসন্ধানের সুযোগ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বাজেটে বিশেষ সুবিধা: ১৫ শতাংশ কর দিয়ে বৈধ করা যাবে কালো টাকা

সন্তানের অবহেলায় মায়ের গলিত লাশ: সভ্য সমাজের অন্দরমহলের কদর্য চিত্র উন্মোচিত

আপডেট সময় : ১১:৩৬:৪১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরে এক মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সমাজের এক অন্ধকার দিককে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ৭৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা মায়ের গলিত ও পোকায় ধরা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং তথাকথিত আধুনিক ও সভ্য সমাজের ভেতরের কুৎসিত পচন এবং চরম আত্মকেন্দ্রিকতার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। মৃত নুরজাহান বেগম কোনো নিঃস্ব বা অনাথ ছিলেন না; তিনি রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, প্রবাসী এবং স্কুলশিক্ষিকা—এমন সন্তানদের গর্বিত মা ছিলেন। অথচ তার শেষ আশ্রয় ছিল এক ফ্ল্যাট, যেখানে তার নিজের মেয়ের সঙ্গে বসবাস করতেন। এই বৈপরীত্য একদিকে যেমন বেদনাদায়ক, তেমনই মানুষের বাহ্যিক চাকচিক্য ও ভেতরের পচনকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করে।

শহরের ফ্ল্যাট সংস্কৃতি আমাদের অনেক সুবিধা দিলেও, তা অনেক সময় মানবিক সম্পর্কগুলোকে ফিকে করে দেয়। ইট-পাথরের এই খাঁচাগুলোতে মানুষ এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে যে, পাশের ফ্ল্যাটে বা পাশের ঘরে কী ঘটছে, তা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা থাকে না। এই ঘটনায় প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেয়ে পুলিশকে খবর দিলে বিষয়টি জানাজানি হয়। শহর আমাদের আধুনিকতা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিবেশীর প্রতি বা সমাজবদ্ধ মানুষের প্রতি যে দায়বদ্ধতা ছিল, তা যেন কেড়ে নিয়েছে। চারপাশের দেয়ালগুলো শুধু সিমেন্টের নয়, এগুলো আসলে আমাদের বিবেকের দেয়াল। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, মা তার নিজের মেয়ের সঙ্গেই ওই বাসায় থাকতেন, অথচ বাসাটি ছিল নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও এলোমেলো। এর অর্থ হলো, একই বাসায় থেকেও মা ও মেয়ের মধ্যে কোনো আত্মিক বা শারীরিক যোগাযোগ ছিল না। মেয়ে হয়তো নিজের জীবন, চাকরি বা অন্য কোনো ঘোরের মধ্যে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, পাশের ঘরে তার বৃদ্ধ মা বেঁচে আছেন কি না—এমনকি খেয়েছেন কি না—এই খোঁজ নেওয়ার ন্যূনতম মানবিক বোধটুকুও তার লোপ পেয়েছিল। এটি এক ধরনের সক্রিয় অবহেলা, যা এক নীরব হত্যাকাণ্ড।

এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) পদ থেকে তাকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘বাবা-মায়ের ভরণপোষণ আইন’ অনুযায়ী এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সকলের জন্য একটি বড় ধাক্কা এবং আত্ম-অনুসন্ধানের সুযোগ।