বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার কারিগর যারা, সেই আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধেই এখন উঠেছে বিশাল অঙ্কের ঋণখেলাপির গুরুতর অভিযোগ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবম দিনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সংসদ সদস্য এবং তাঁদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি টাকারও বেশি, যার মধ্যে সরাসরি ৩ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা বর্তমানে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ, যারা অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার আইন প্রণয়ন করেন, তাঁদের একটি বড় অংশই সেই শৃঙ্খলা মানতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।
অর্থমন্ত্রী সংসদে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করতে গিয়ে জানান যে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সংসদ সদস্যদের বড় অংকের ঋণ এবং এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ খেলাপি হওয়ার বিষয়টি ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর সুশাসনকেই বারবার ফুটিয়ে তুলছে। যদিও আইনি মারপ্যাঁচে এবং আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে অনেক খেলাপি ঋণকে কাগজে-কলমে ‘নিয়মিত’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবের চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ৫ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণকে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হলেও বাংলাদেশে তা বর্তমানে ১১-১২ শতাংশে পৌঁছেছে, যার বড় অংশই প্রভাবশালীদের হাতে কেন্দ্রীভূত।
এই সংকটের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার আগে ঋণ পুনঃতফসিল বা রিসেডিউল করার প্রবণতা। গত নির্বাচনে অন্তত ৪৫ জন ঋণখেলাপি প্রার্থী অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে ১১ জন বিজয়ী হয়ে সংসদে বসেছেন। নির্বাচনের ঠিক আগে ঋণের কিস্তি পুনর্নির্ধারণ করে আইনি বৈধতা নিলেও নৈতিকভাবে তাঁরা ঋণের দায় থেকে মুক্তি পাননি। বিশ্লেষকদের মতে, এই আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করার ফলে সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা যাচ্ছে যে, ক্ষমতা থাকলে নিয়ম ভাঙা যায়। একজন প্রান্তিক কৃষক সামান্য ঋণের জন্য যখন আইনি হেনস্তার শিকার হন, তখন শত শত কোটি টাকার খেলাপি এমপিরা সংসদ অলংকৃত করেন—যা সরাসরি সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট তৈরি করছে, যার ফলে নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না এবং বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উচ্চ খেলাপি ঋণ দেশের প্রবৃদ্ধি প্রায় ১-২ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। ব্যবসা ও রাজনীতির এই অশুভ আঁতাত এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাবই এই কাঠামোগত সংকটের মূল কারণ। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শুধু আইন নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত বিচারের দাবি জোরালো হচ্ছে। নতুবা খেলাপি ঋণের এই বিশাল বোঝা শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই একসময় ধসিয়ে দিতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 



















