ঢাকা ০৬:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

আয় ও ব্যয়ের টানাপোড়েন: ৭১ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের চাপে সরকার

বছরের শুরু থেকে খরচ কমিয়ে টাকা জমাবেন যেসব উপায়ে

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় করেছে। যদিও আগের বছরের তুলনায় আদায়ের প্রবৃদ্ধি ১২.৩৬ শতাংশ, তবে সংশোধিত বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আয়ের এই ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস, বিশেষ করে ব্যাংক খাত থেকে ব্যাপক হারে ঋণ নিচ্ছে। অর্থবছরের সাড়ে আট মাসেই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে তিন গুণ বেশি। বৈদেশিক উৎস থেকেও আশানুরূপ অর্থছাড় না মেলায় ঋণের এই নির্ভরশীলতা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

অর্থনীতির এই নাজুক পরিস্থিতির মধ্যেও সরকারের জন্য একমাত্র স্বস্তির জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। গত মার্চ মাসে রেকর্ড ৩৭৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, যার বড় কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আতঙ্ক এবং ঈদুল ফিতরকে দেখা হচ্ছে। তবে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে রপ্তানি আয়েও টানা আট মাস নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে; মার্চ মাসে রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ১৮.৭ শতাংশ কমেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই পরিস্থিতিকে ‘উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি’ এবং বৈশ্বিক সংকটের ফল হিসেবে অভিহিত করেছেন।

জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি সরকারের ব্যয়ের বোঝাকে আরও ভারী করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও দেশীয় বাজারে দাম অপরিবর্তিত রাখায় সরকারকে আগামী চার মাসে ডিজেলে ১৫ হাজার ৪০৯ কোটি টাকাসহ মোট ১৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে সরকার যদি টাকা ছাপানো বা রিজার্ভ থেকে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের পথ বেছে নেয়, তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮.৭১ শতাংশে থাকলেও তেলের দুষ্প্রাপ্যতা ও সরবরাহ সংকটের কারণে তা আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের মতো নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারের ঋণের বোঝা আগামীতে আরও পাহাড়সম হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুঝুঁকি ও লিবিয়ার ‘গেম ঘরে’ বন্দি বাংলাদেশিরা

আয় ও ব্যয়ের টানাপোড়েন: ৭১ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের চাপে সরকার

আপডেট সময় : ০২:৫৪:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় করেছে। যদিও আগের বছরের তুলনায় আদায়ের প্রবৃদ্ধি ১২.৩৬ শতাংশ, তবে সংশোধিত বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আয়ের এই ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস, বিশেষ করে ব্যাংক খাত থেকে ব্যাপক হারে ঋণ নিচ্ছে। অর্থবছরের সাড়ে আট মাসেই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে তিন গুণ বেশি। বৈদেশিক উৎস থেকেও আশানুরূপ অর্থছাড় না মেলায় ঋণের এই নির্ভরশীলতা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

অর্থনীতির এই নাজুক পরিস্থিতির মধ্যেও সরকারের জন্য একমাত্র স্বস্তির জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। গত মার্চ মাসে রেকর্ড ৩৭৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, যার বড় কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আতঙ্ক এবং ঈদুল ফিতরকে দেখা হচ্ছে। তবে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে রপ্তানি আয়েও টানা আট মাস নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে; মার্চ মাসে রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ১৮.৭ শতাংশ কমেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই পরিস্থিতিকে ‘উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি’ এবং বৈশ্বিক সংকটের ফল হিসেবে অভিহিত করেছেন।

জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি সরকারের ব্যয়ের বোঝাকে আরও ভারী করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও দেশীয় বাজারে দাম অপরিবর্তিত রাখায় সরকারকে আগামী চার মাসে ডিজেলে ১৫ হাজার ৪০৯ কোটি টাকাসহ মোট ১৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে সরকার যদি টাকা ছাপানো বা রিজার্ভ থেকে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের পথ বেছে নেয়, তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮.৭১ শতাংশে থাকলেও তেলের দুষ্প্রাপ্যতা ও সরবরাহ সংকটের কারণে তা আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের মতো নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারের ঋণের বোঝা আগামীতে আরও পাহাড়সম হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।