আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়নে সরকারকে অত্যন্ত সতর্ক ও রক্ষণশীল অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা। তারা মনে করছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার এই সময়ে বড় আকারের ব্যয়মুখী বাজেট অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই আসন্ন বাজেটে ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারকে সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী হওয়ার পাশাপাশি বাস্তবতার ভিত্তিতে পরিকল্পনা সাজানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (২৮ মার্চ) রাতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় অর্থনীতিবিদরা এসব মতামত তুলে ধরেন। সভায় অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় অংশ নেন সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ফাহমিদা খাতুনসহ বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রতিনিধিরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় রাজস্ব আদায়ের প্রকৃত সক্ষমতা বিবেচনা না করে কেবল সংখ্যার বিচারে বড় বাজেট প্রণয়ন করা হলে তা বাস্তবায়নযোগ্য হবে না। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থনীতিবিদদের আশ্বস্ত করে বলেন, সরকারি প্রকল্পের অতিমূল্যায়ন বন্ধ করা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে সরকার বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে প্রকল্প শুরুর আগেই যে অতিরিক্ত ব্যয় ধরার প্রবণতা থাকে, তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই এনবিআরের শুল্ক-কর আদায়ের ক্ষেত্রে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা অর্থবছর শেষে এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে করের আওতা বাড়ানো এবং এনবিআরের আধুনিকায়ন ছাড়া বিকল্প নেই বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। এছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে নীতি সুদহার কমানোর কোনো সুযোগ নেই বলেও তারা মত দিয়েছেন। সুদের হার কমানো হলে বাজারে মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলবে।
বৈঠকে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে দেশের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ সরকারের ওপর পাহাড় সমান হয়ে দাঁড়াবে। এটি আগামী বাজেট বাস্তবায়নের পথে অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠতে পারে।
যেহেতু এটি বর্তমান সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট, তাই এতে নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিফলন থাকা জরুরি বলে অর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করেন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এই বরাদ্দের ক্ষেত্রে যাতে টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে একটি স্পষ্ট ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার (প্রস্তাবিত ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা) একটি বিশাল বাজেট প্রস্তুত করার প্রাথমিক পরিকল্পনা করছে। এতে দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে ৬ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে এনবিআর থেকে কর আদায়ের লক্ষ্য থাকবে ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে। আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হতে পারে, যেখানে মোট জিডিপির আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এই রূপরেখাটি এখনও চূড়ান্ত নয় এবং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 

























